এ কথা অনস্বীকার্য যে, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় মফস্বল সাংবাদিকতার অবদান কম নয়। প্রতিনিয়ত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রত্যেক জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি তার কর্ম এলাকার অবহেলিত, উন্নয়নবঞ্চিত জনপদের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন। খুন, ধর্ষণ, বাল্যবিয়ে, ইভটিজিং, অশিক্ষা, অপচিকিৎসা, যৌতুক, গ্রামের সরলমনা মানুষদের নানাভাবে প্রতারিত হওয়া, জবরদখল, সন্¿াস, দুর্নীতি, দলাদলি, অগ্নিকাণ্ড, লোডশেডিং দুর্ঘটনা, উন্নয়ন, অনিয়ম, খেলাধুলা, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ধরনের সংবাদ পরিবেশন করেন।
তবে পত্রিকার প্রধান কার্যালয়গুলোয় বিভাগভিত্তিক আলাদা আলাদা রিপোর্টার থাকলেও মফস্বল সাংবাদিকদের মধ্যে কোনো বিভাগ ভাগ করা নেই। তাই তাদের প্রতিটি বিষয়েই সংবাদ ও প্রতিবেদন তৈরি করতে হয়। এতে করে তাদের দক্ষতাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। মফস্বল সাংবাদিকরা চতুর্মুখী যে শ্রম দেন তার বিনিময়ে তারা তেমন কিছুই পান না।
যারা সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে বেতন-ভাতা পান, তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি ও যাদের বেতনভুক্ত করা হয়নি তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেয়ার পাশাপাশি সাংবাদিক নিয়োগের ক্ষেত্রে একজন সাংবাদিকের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচিত হওয়া উচিত। এতে অপসাংবাদিকতা রোধ অনেকটাই সম্ভব হবে।
তবে এটাও ঠিক যে সঠিক প্রশিক্ষণ, পেশাদারিত্বের অভাব, অধিক টাকার লোভ ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সাংবাদিকদের মাঝে বিভক্তি বাড়ছে। অপরদিকে অনেক সময় সাংবাদিকদের কাউকে কাউকে সাংঘাতিক, হলুদ সাংবাদিক, চাঁদাবাজ সাংবাদিক, সিন্ডিকেট সাংবাদিক, বিজ্ঞাপন সাংবাদিক, রাজনৈতিক সাংবাদিক, গলাবাজ সাংবাদিক, ক্রেডিট পরিবর্তন সাংবাদিক, দালাল সাংবাদিক ইত্যাদি নেতিবাচক ভাষায় অভিহিত করা হয়। এর অবসান হওয়া জরুরি।
গ্রামবাংলার কল্যাণে মফস্বল সাংবাদিকদের ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশ গ্রামপ্রধান দেশ। তাই মফস্বল সাংবাদিকদের উপেক্ষা করে কোনো সংবাদপত্রই সফল অবস্থানে পৌঁছতে পারবে না। কিন্তু যেসব মফস্বল সাংবাদিক দেশের ৮৫ শতাংশ মানুষের লাঞ্ছনা, বঞ্চনা ও অভাব-অভিযোগের খবর প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে পত্রিকায় পাঠান, তাদের খোঁজখবর পত্রিকার মালিক/সম্পাদক একটু কমই রাখেন। আবার এমন কিছু সংবাদ আছে যা সংগ্রহ করতে গেলে স্থানীয় প্রশাসনের হুমকি, প্রভাবশালীদের চোখ রাঙানি, এমনকি প্রাণনাশের মতো আশঙ্কাও থাকে। তারপরও থেমে নেই মফস্বল সাংবাদিকদের পথচলা।
আমাদের দেশে মফস্বল সাংবাদিকতার সমস্যা নানামুখী ও বহুমাত্রিক। মফস্বল সাংবাদিকতা বহুমাত্রিক সমস্যা। এর মধ্যে তিনটি উল্লেখযোগ্য।
ক. সরকার সংশ্লিষ্ট সমস্যা: সাংবাদিকরা সরকারি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের প্রশাসনিক ও সহযোগিতা সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশে বাধা নিষেধ আরোপ সত্য প্রকাশের কারণে ক্ষিপ্ত; অন্যদিকে অসৎ শক্তিমানের আক্রোশ ও আক্রমণ থেকে সুরক্ষা প্রদানে সরকার ও প্রশাসনের অনীহাসহ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য সমস্যা।
খ. মালিকপক্ষ সংশ্লিষ্ট সমস্যা: জাতীয় স্থানীয় যা-ই বলি সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেলের মালিক পক্ষ থেকে উৎপন্ন কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় মফস্বল সাংবাদিককে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মালিকের মতো বাংলাদেশেও রয়েছে কিছু কিছু সংবাদপত্রের মালিক বিত্তবান ও পুঁজিবাদ। ইদানীং কিছু স্থানীয় পত্রিকার মালিকানাও চলে যাচ্ছে শিল্পপতিদের হাতে। এতে করে প্রকৃত সংবাদকর্মীরা সাংবাদিকতার নীতিচ্যুত হওয়ার কষ্টে ভোগেন। যে কোনো সময় নিয়োগ বাতিল হওয়ার চিন্তাও মফস্বল সাংবাদিকতার জন্য একটা হুমকি।
গ. সাংবাদিকদের আপন সংশ্লিষ্ট সমস্যা: মফস্বল সাংবাদিকদের মধ্যে নিজস্ব কিছু সমস্যা আছে, যা রাজধানী কিংবা বিভাগীয় সাংবাদিকদের মধ্যে ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। তবে জাতীয় ও স্থানীয় যা-ই বলি সব সাংবাদিকের মধ্যে রাজনৈতিক মেরুকরণের সমস্যাটি একই ধরনের। তারা একে অপরে হিংসা, অহংকারবোধ থাকায় প্রতিটি জেলা-উপজেলায় একাধিক প্রেস ক্লাব, রিপোর্টার্স ক্লাব, রিপোর্টার্স ইউনিটিসহ নানা সংগঠন বিদ্যমান।
মফস্বলে সাংবাদিকতাকে পুঁজি করে কেউ কেউ অপসাংবাদিকতাও করছে। রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক কর্তাদের ম্যানেজ করে বিভিন্ন অফিসে মাসিক মাসোহারা নেন। এদের কারণে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা প্রশ্নবিদ্ধ। কিছু ক্ষেত্রে তারা সংবাদ বিকৃত করে মিথ্যা সংবাদও তৈরিও করছেন।
আমি নিজেও বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে মফস্বল বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছি। এ কারণে তাদের পাওয়া-না পাওয়া এবং দুঃখ-দুর্দশার কথা অনেক কথাই আমার জানা। সেই স্মৃতি হাতড়ে কিছু কথা পাঠকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। যেমন—রংপুরের সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুস সরকার, বেলায়েত হোসেন সরকার, ঠাকুরগাঁওয়ের গোলাম সারোয়ার সম্রাট, সামসুল আলম, কুড়িগ্রামের ইউসুফ আলমগীর, আমানুর রহমান খোকন, লালমনিরহাটের ফারুক আলম, গাইবান্ধার সাদুল্লাহপুরের শাহীদুল ইসলাম শাহীন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আশরাফুল ইসলাম, জহুরুল ইসলাম জহির, রাজশাহীর আসাদুজ্জামান রাসেল, নাটোরের মামুনুর রশিদ। তারা বলেন, ভাই কী আর বলব দুঃখের কথা। পত্রিকা অফিস থেকে কোনো বেতন-ভাতা পাই না। সামান্য যা বিজ্ঞাপনের কমিশন পাই সেটাও কর্তৃপক্ষ ঠিক মতো দেয় না। এ কারণে বাধ্য হয়ে আরও একটা পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে কাজ করি। তবে দু-তিন জায়গায় কাজ করায় সংবাদ পরিবেশনের মানেও অনেক সময় ঘাটতি থেকে যায়। এখন আবার কিছু ধান্দাবাজ, নামধারী সাংবাদিকদের কারণে পেশায় টেকাটাই দায়। কিন্তু কী করব সাংবাদিকতা ছাড়া তো অন্য কিছু পারি না।
বগুড়ার নারী সাংবাদিক পারভীন লুনা অনেকটা আক্ষেপ করে বলেন, একজন নারী হিসেবে সাংবাদিকতা করা খুই দুষ্কর। স্কুটি চালিয়ে শহরের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে ছুটতে গিয়ে অনেকের কটু কথা শুনতে হয়। এখন নতুন উপদ্রব রাজনৈতিক নেতারা। তাদের কারণে বিজ্ঞাপনও পাওয়া যাচ্ছে না। তারা বিভিন্ন অফিসে গিয়ে কাকে বিজ্ঞাপন দেয়া যাবে সেই তালিকা ধরিয়ে দিচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে পেশায় টিকে থাকা দায় হবে।
অন্যদিকে, গাজীপুরের মাজারুল ইসলাম কাঞ্চন, দেলোয়ার হোসেন, মুন্সীগঞ্জের শেখ মোহাম্মদ রতন, খুলনার সাংবাদিক দানিয়েল সুজিত বোস, সাতক্ষীরার ফারুক আলম, যশোরের মীর কামরুজ্জামান মনি, মাগুরার স্বপন বিশ্বাস, ঝিনাইদহের প্রবীণ সাংবাদিক দেলোয়ার কবির, নয়ন খন্দকার, নোয়াখালীর শাকিল আহমেদ, চট্টগ্রামের রূপন কুমার দাস, নরসিংদীর প্রীতি রঞ্জন, কুষ্টিয়ার কুদরতে খোদা সবুজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এইচ মি সিরাজ, বেনাপোলের ফারদিন আলম, কক্সবাজারের এস এম রুবেল, মনোহরদীর হারুন-অর রশীদ, গোপালগঞ্জের দুলাল বিশ্বাস, টাঙ্গাইলের সোহেল রানা, নান্দাইলের সারোয়ার জাহান রাজিব বলেন, সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা হলেও আজ আর দাম পাওয়া যায় না। এখন অনেক ভুঁইফোঁড় সাংবাদিক গজিয়েছে। এরা পেশাকে কলুষিত করছে। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, আমরা সারাদিন খাটাখাটনি করে হেড অফিসে নিউজ পাঠাই, কিন্তু অনেক সময় ঠিকমতো ট্রিটমেন্ট পাই না। আমরা মফস্বলে কাজ করি বলে কি সম্মানের যোগ্য নই। আমাদেরকে বিজ্ঞাপনের কমিশনের টাকায় চলতে হয়। সেই কমিশনের টাকাটাও সময় মতো পাই না। অনেক কষ্টে সংসার চালাতে হয়। এভাবে চলতে থাকলে একদিন হয়তো পেশাটাই ছেড়ে দিতে হবে।
মোনাজাতউদ্দিন: খবরকে সব পর্যায়ের পাঠকের জন্য বোধগম্য করে তোলার নিপুণ কৌশল জানতেন মোনাজাতউদ্দিন। যিনি চোখ দিয়ে কেবল দেখতেন না, অনুধাবন করতেন মন দিয়ে। ফলে সংবাদ হয়ে উঠত একান্তই নিজস্ব। যে উত্তরের জনপদের খবর আমাদের শহুরে মানুষের কানে খুব একটা পৌঁছাতো না, সেই উত্তরবঙ্গের খরা, মঙ্গাপীড়িত মানুষের হাহাকার মোনাজাতউদ্দিন শহুরে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন তার মর্মভেদী আহ্বানে।
আজকের দিনে এসে মোনাজাতউদ্দিনের উত্তরবঙ্গকে হয়তো চেনা যাবে না। সময়ের ব্যবধানে উত্তরবঙ্গ আধুনিক, প্রশস্ত সড়ক, দুধারে ফসলের খেত, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, আধুনিকতার জয়ধ্বনি। জমি হয়েছে তিন ফসলি, বাড়ির আঙিনায় সবজি বাগান, পুকুরে মাছ, গোয়ালে গাভি। কিন্তু মোনাজাতউদ্দিনের উত্তরবঙ্গ আজকের মতো ছিল না। সেই উত্তরবঙ্গ ছিল রুক্ষ, সেই জনপদে চতুর্দিকে কেবলই হাহাকার। আশ্বিন-কার্তিক মাস এলেই উত্তরাঞ্চলে মঙ্গা দেখা দিত। সেই উত্তরবঙ্গকে পত্রিকার পাতায় গভীর মমতায় তুলে ধরতেন মোনাজাতউদ্দিন, গ্রামই ছিল যার কর্মক্ষেত্র। গ্রামের মানুষরাই ছিল তার সংবাদের মানুষ। মোনাজাতউদ্দিনের প্রতিবেদন মানেই পত্রিকার চুম্বকের আকর্ষণ। সাংবাদিকতার অনুসন্ধানী চোখ আজ প্রায় বিলুপ্ত। তখন মোনাজাতউদ্দিনের তৈরি করা সংবাদগুলো আমাদের চোখ খুলে দেয়। তিনি যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন সংবাদ কতটা জীবনঘনিষ্ঠ হতে পারে। একজন সাংবাদিক তার পেশার মধ্য দিয়ে কত অবদান রাখতে পারেন সমাজে। মোনাজাতউদ্দিনের ভোর, সকাল, দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা, মধ্যরাত বলে কিছুই ছিল না। তিনি যেন নিজেই এক আদ্যোপান্ত সংবাদ। সংবাদকর্মী হিসেবে সাংবাদিকতা ছিল তার পেশা ও নেশা।


