মঙ্গলবার | ৫ মার্চ, ২০২৪ | ২১ ফাল্গুন, ১৪৩০

ডাক চালুর ২৬৫ বছরেও ভূমিহীন লালপুর পোস্ট অফিস

ইমাম হাসান মুক্তি, প্রতিনিধি, নাটোর (লালপুর)
উপমহাদেশের ডাক প্রবর্তনের পর প্রায় ২৬৫ বছর আগে নাটোরের লালপুর-বাগাতিপাড়ায় ডাক লেনদেন চালু হয়। এক সময় নিজস্ব জমিতে ডাক বিভাগ চালু থাকলেও বর্তমান ভূমিহীন লালপুর পোস্ট অফিস। নিজস্ব জমি না থাকায় ভবন নির্মাণ সম্ভব হচ্ছে না।
খালিদ বিন-জালালের নাটোরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য (২য় খন্ড) থেকে জানা যায়, শের শাহের আমলে (১৫৪১-১৫৪৫) ঘোড়ার ডাক প্রবর্তনের বহু পরে অর্থাৎ ১৭৫৬-১৭৫৭ খৃস্টাব্দের দিকে লালপুর-বাগাতিপাড়ার তমালতলা নদীর ঘাটে ডাক লেনদেনে ঘোড়া বদল করা হতো। সেই বদলি ঘোড়ায় করে আড়ানী হয়ে পদ্মা পাড়ি দিয়ে কয়েক ধাপে সে ডাক মুর্শিদাবাদ গিয়ে পৌঁছাতো। সিরাজ-উদ-দৌলা ও রাণী ভবানীর মধ্যে সেকালে এভাবেই সপ্তাহে একদিন করে নাটোর-মুর্শিদাবাদ ডাক সার্ভিস চালু ছিল।
নাটোর মহকুমা সম্মিলনী (১৯৮১) প্রকাশিত ‘নাটোরের কথা ও কাহিনী’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর প্রথম আমলে সামরিক, বাণিজ্যিক ও শাসনের প্রয়োজনে ডাক ব্যবস্থার উন্নতি ও প্রসার ঘটে। ১৭৮৪ খৃষ্টাব্দে ওয়ারেন হেসটিংসের এক প্রতিবেদনে দেশে একটি সফল ডাক ব্যবস্থার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয় এবং এর পরিচালন ব্যয় পুষিয়ে নিতে একে জনসাধারণের মধ্যে চালু করবার কথা ভাবা হয়, কেননা এটি আগে শুধু সরকারের জন্য সংরক্ষিত ছিল। এর ফলে প্রেসিডেন্সি শহরগুলিতে স্থাপিত হল ‘জেনারেল পোষ্ট অফিস’ এবং ডাক ব্যবস্থাকে জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হল। ‘রিলে’ প্রথার মাধ্যমে বনজঙ্গল, নদ নদী পার হয়ে ‘ট্রাংক রোড’ গুলো ধরে রানার ছুটতো ডাক নিয়ে।
একটি স্থায়ী ব্যবস্থা সানে কলকাতার সঙ্গে মোরাদাবাদ ও ময়দাপুরের ভেতর দিয়ে নাটোরের সঙ্গে নিয়মিতভাবে রাজধানী কলকাতার সর্বপ্রথম সরকারী ডাক যোগাযোগ ঘটলো লবন চৌকির মাধ্যমে ১৭৯০৭ খৃষ্টাব্দের ১লা এপ্রিল থেকে। ১৭৯১ থেকে রামপুর বোয়ালিয়াকেও এর সঙ্গে যুক্ত করা হল। এর আগে নাটোরের সঙ্গে বেশী যোগাযোগ ছিল মুর্শিদাবাদের জমিদার বা কালেকটারের নিজস্ব হরকরার দ্বারা।
সরকারী ডাক ব্যবস্থার প্রবর্তনের পর পদাধিকার বলে কালেক্টর ডেপুটি পোষ্টমাস্টার হিসাবে নাটোর পোষ্ট অফিসের ভারপ্রাপ্ত হন। এ ছাড়া কাজ চালাবার জন্য ছিল মাসিক ৯ টাকা বেতনে একজন কেরানী, মাসিক ৯ টাকা বেতনে একজন জমাদার এবং মাসিক ৪ টাকা বেতনে আটজন হরকরা।
নাটোর থেকে জেলার সদর দপ্তর স্থানান্তরিত হবার জন্য ১৮২৭ খৃষ্টাব্দে নাটোর থেকে জেলার প্রধান ডাকঘর তুলে নিয়ে গিয়ে সরদাতে স্থাপিত করা হয়। ১৮৫৪ খৃষ্টাব্দে ডালহৌসী ডাক ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং তার ফলে প্রতি জেলার অধীনে প্রতিটি মহকুমাতে একটি করে ‘সাব পোষ্ট অফিস’ স্থাপন করা হয়। এবং এর ফলে নাটোরেও। আইনের সাহায্যে নবাব, জমিদার ও মহাজনদের ডাক ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়ে সমগ্র ডাক ব্যবস্থার উপর একচেটিয়া সরকারী কর্তৃত্ব আরােপ করা হয়। ডাক টিকিট, মণি-অর্ডার ও পোষ্টাল সেভিংস ব্যাংকের সূত্রপাত ঘটে। ১৮৭২ খৃষ্টাব্দে নাটোরের ৮৩২ বর্গমাইল ডাক ব্যবস্থার অধীনে ছিল।
১৮৮৬ খৃষ্টাব্দে নাটোরে টেলিগ্রাম ব্যবস্থা প্রচলিত হয়। ঐ বৎসর সাঁড়া ও সান্তাহার টেলিগ্রাফ লাইনের সঙ্গে নাটোরকে যুক্ত করা হয়।’
রামকৃষ্ণপুর গ্রামের হাজি মো. রিয়াজ উদ্দিন (৯৬) জানান, লালপুরে প্রথম পোস্ট অফিস চালু ছিল মাধবপুর পালপাড়ার পোড়া সাঁকো সংলগ্ন স্থানে। জমিদার কড়ি বাবু ও যুগল বাবুর জমিতে। বিলুপ্ত ওই জায়গাকে স্থানীয় লোকজন মুখে এখনো পোস্ট অফিসের মাঠ হিসেবে পরিচিতি আছে। পোস্ট অফিসের মাঠ খ্যাত নয় বিঘা জমি ইজারা দেওয়া রয়েছে। এদিকে নিজস্ব জমি না থাকায় লালপুরে স্থায়ীভাবে পোস্ট অফিস ভবন নির্মাণ সম্ভব হচ্ছে না।
পরবর্তীতে লালপুর পোস্ট অফিস পুরাতন বাজারের একটি ঘরে কার্যক্রম চলতো। বর্তমান লালপুর ইউনিয়ন পরিষদের একটি কক্ষে পোস্ট অফিসের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
লালপুর পোস্ট অফিসের পোস্টম্যান মো. আবুল বাশার জানান, এখন চিঠির প্রচলন অনেক কমে গেছে। মাসে আড়াই থেকে ৩০০ টি রেজিস্ট্রি আর সাড়ে ৩শ থেকে ৪শ সাধারণ চিঠি বিলি করা হয়ে থাকে।
লালপুর পোস্ট অফিসের সাব পোস্ট মাস্টার মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, অনেক পুরাতন জরাজীর্ণ আসবাবপত্র নিয়ে অফিস চলছে। আধুনিকতার ছোঁয়া সবখানে লাগলেও আমাদের পোস্ট অফিসে লাগেনি। যার ফলে এর কদর কমে যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, পোস্ট অফিসের নিজস্ব ভবন নির্মাণের জন্য বহুবার চিঠি চালাচালি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত নিজস্ব জমির ব্যবস্থা না হওয়ায় ভবন নির্মাণ হয়নি। এখন জমি পাওয়া গেলে ভবন নির্মাণের আবেদন করা যাবে।
লালপুর উপজেলা পোস্ট অফিস ভবন গোপালপুর বাজারে নিজস্ব জমিতে স্থাপিত হয়েছে।

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৩)
Developed by- .::SHUMANBD::.