রবিবার | ১৬ জুন, ২০২৪ | ২ আষাঢ়, ১৪৩১

প্রচারণায় বিষোদগার হচ্ছে বুমেরাং!

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম :
ভোটের আর মাত্র কয়দিন বাকী। ঢাকা শহরের নির্বাচনী এলাকার আকাশ ভোটের পক্ষের পোষ্টারে ঢাকা পড়ে গেছে। এই পোষ্টার থেকে রেহাই পায়নি দেয়াল ও গাছপালা। গ্রামগঞ্জে এত পোষ্টার নেই। সেখানে বাতাসে মাইকের শব্দ শোনা যাচ্ছে। তবে শহর-গ্রাম সব জায়গায় একদলীয় প্রার্থীদের ভিন্নভিন্ন প্রতীক ও উপদলের পরিচয়ে এবারের নির্বাচনী প্রচারণা এক নবতর সংযোজন ঘটেছে। এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় একই দলের প্রার্থীদের মাঝে পাল্টাপাল্টি বিষোদগার ও আত্মশ্লাঘা শুরু হয়েছে যা খুবই ভয়ংকর।
এবারের নির্বাচনী কৌশলের বাঁক বার বার ঘুরাতে গিয়ে প্রচারণার ক্ষেত্রে আত্মনিধনের এত নাজুক অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে সেটা নীতি নির্ধারকগণ আগে বুঝতে পারেননি। পরস্পরের বিরুদ্ধে কুৎসা ও বিষোদগার একটি অরুচিকর অবস্থা তৈরী করেছে বলে ইতোমধ্যে অনেক প্রার্থী মতামত দিয়েছেন। কেউ কেউ ভয় পাচ্ছেন এসব প্রচারণা শাসক দলের আদর্শ ও নীতির পরিপন্থি এবং নিজেরা নিজেদেরকে নিধনের ক্ষেত্রে বুমেরাং হয়ে যাচ্ছে।
কোন কোন এলাকায় নির্বাচনী হাওয়ার সাথে পারস্পরিক বিষোদগার ও আত্মশ্লাঘার উত্তাপ এত বেশী যে সেটা স্বাভাবিক নির্বাচনী সমীকরণকে পরিবর্তন করার মতো পরিস্থিতি তৈরী করে ফেলেছে। কিছু এলাকায় প্রার্থীরা ফুরফুরে মেজাজে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। কোথাও ছাদখোলা গাড়িতে চড়ে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন ভোটারদেরকে। আবার কোথাও কোথাও ছাদখোলা গাড়িতে দাঁড়িয়ে অথবা সেখান থেকে শরীর হেলে গলা এগিয়ে দিয়ে মৌসুমী গাঁদা ফুলের মালা গ্রহণ করছেন। সেসব ফুলে মালা এত বেশী যে গাড়ির বনেট মালায় মালায় ঢাকা পড়ে গেছে। ভোটের অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ আগে গলা এগিয়ে ফুলের মালা গ্রহণ করা এসকল প্রার্থীর মধ্যে নির্বাচন নিয়ে মাতামাতি থাকলেও কোন টেনশন নেই বলে অভিমত ও কৌতুহল ব্যক্ত করেছেন এলাকার বিজ্ঞজনেরা।
আবার কোন কোন নির্বাচনী এলাকায় প্রতিদ্ব›দ্বীতা তেমনভাবে জমে উঠেনি। সেখানে কোন কোন প্রার্থী আক্ষেপ করে বলেছেন, শক্ত প্রতিপক্ষ না থাকলে প্রচারণা জমে কীভাবে? সেসব আক্ষেপের কথা ভোটারদের কানে পৌঁছার পর শোনা গেছে, শাসক দল অক্সিজেনের অভাবে একই মতাদর্শের বা একই পরিবারের অনেক বেশী মেকি বা ডামি প্রার্থীর আশ্রয় নেয়ায় তাদের বেশ অসুবিধা হয়েছে। ভোটাররা তাদের এলাকার কা’কে সমর্থন করে কার মিছেলে অংশগ্রহণ করবেন সেটা বুঝে উঠতে পারছেন না। ঢাকায় একটি নির্বাচনী এলাকায় প্রতিদ্ব›দ্বীতাকারী পাঁচজন প্রার্থী সবাই একই রাজনৈতিক দলের সমর্থক। শুধু নির্বাচন আয়োজনের তাগিদে এক অপরের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে আত্মনিধনের প্রচারণা চালাচ্ছেন।
সাতক্ষীরা এলাকার এক মন্ত্রী, তিনি নিজেও প্রার্থী। তিনি তার সেখানকার প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ইবলিস, ইডিয়ট ও মোনাফেক বলেছেন। সেটা বলার পেছনে তিনি নানা যুক্তি দিয়েছেন। কিন্তু ভোটের মাঠে প্রতিপক্ষ কেউ কি কোন যুক্তি শুনতে চায়? প্রতিপক্ষ এটাকে অশ্রাব্য ভাষা হিসেবে গণ্য করেছেন। তাছাড়া এখন যে কোন একটি নির্বাচনী এলাকার একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে মোনাফেক বললে সেটা দেশের সকল নির্বাচনী এলাকার স্বতন্ত্র প্রার্থীদের গায়ে লেগে যেতে পারে সেটা তিনি বুঝতেই পারিননি অথবা প্রচারণার ¯স্নায়ুচাপে তা ভুলেই গেছেন!
নাটোর-১ এ প্রতিপক্ষ ঈগল প্রতীকধারী স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রতীককে ‘শকুন’বলায় সেখানে মামলা হয়েছে। ঈগল প্রতীকধারী স্বতন্ত্র প্রার্থী এত মনো:ক্ষুন্ন হয়ে এটাকে অরুচিকর মন্তব্য উল্লেখ করে অভিযোগ দায়ের করেছেন। কারণ, চিল, শকুন খুব উপকারী পাখি হলেও নির্বাচনী মাঠে আমাদের সমাজে ‘ঈগল’ও ‘শকুন’ ভিন্ন অর্থ পরিগ্রহ করে।
অন্যদিকে পুঠিয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী এক যুবলীগ নেতা বলেছেন, ‘নৌকার প্রার্থী এমপি হয়ে গেছে। শুধু শপথ বাকী। নৌকার বাইরে কেউ কেন্দ্রে গেলে টিনের চশমা পরানো হবে।’ কিশোরগঞ্জের একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী বলেছেন, ‘আমি ঘরে ঘুমিয়ে থাকলেও পাশ করব।’ এসব কিম্ভুতকিমাকার উক্তি নিয়ে কৌতুহল ও গুঞ্জন বাড়ছে।
এবারের নির্বাচনে শাসক দলের ভোট ব্যাংক কার্যত: তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। জয়ের নেশায় কেউ কাউকে ভাগে ছাড় দিয়ে কথা বলছেন না। এক দলের ত্রিমুখী ভোটের লড়াই নিয়ে ঢাকার ডেমরা এলাকার একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী টিভিতে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছেন, ‘এবারের নির্বাচনে এক দলের ভোট তিনভাগ হয়ে যাবে। গত নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি মাত্র ১০-১৫ ভাগ ভোটার কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন। এবার সেই ভোট তিনভাগ হবে।’
সারা দেশের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে একই মনোভাব বিরাজ করছে বলে জানা গেছে। মনোনয়ন বঞ্চিত করে আনাড়ি, অনভিজ্ঞ ও হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসা ভিন্ন পেশার প্রার্থীদেরকে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করতে দেয়ায় তারা তাদের বিরুদ্ধে বেপরোয়া হয়ে প্রচারে মাঠে নেমে গছেন।
কারণ, তারা মনে করেন সেসব প্রার্থীরা অনেকেই ভিন্নজগতের জ্ঞানী, হয়তো জটিল রাজনীতি বুঝেন না। মানুষের কল্যাণ কাকে বলে সেটা ভাবতে জানেন না। তারা নিজেরাই অন্যের করুণায়, তোষণ-তোয়াজের মুখাপেক্ষি হয়ে নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন। গতবার তাদেরকে ‘যার কাজ তারই সাজে অন্য লোকের লাঠি বাজে’ভেবে প্রবাদটি বহুলাংশে ছড়িয়ে পড়েছিল। এবারও মনোনয়নের ক্ষেত্রে সেটাকে গুরুত্ব না দেয়ায় দলের জন্য আরো বেশী বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এবারের প্রচারণায় কতিপয় হেভিওয়েট ও সেলিব্রেটি প্রার্থীর সাড়ম্বর প্রচারণার জৌলুষ গণমাধ্যমের কল্যাণে জনগণ জানতে পারলেও জনগণের ভেতরের কথা কেউ প্রচারে এগিয়ে আসেননি।
সাধারণত: সারা বিশ্বে ভোটের আগে জনমত জরিপ করা হয়। যেখানে সব শ্রেণি-পেশার ভোটারদের মনের ইচ্ছে ও ভাবধারার প্রতিফলন ঘটে এবং সেটা গণমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষ জানতে পারে। আমাদের দেশে সেসবের বালাই নেই। এখানে শুধু বাহ্যিক দিকের প্রদর্শণ প্রচারে ব্যস্ত থাকেন সবাই। ফলে গণকল্যাণমূখী টেকসই কোনকিছুর ভিত্তি তৈরী হয় না।
তবে এবারের ভোটে শক্তি প্রদর্শনের মহড়া ভিন্ন রকমের। ভোট আয়োজনের কৌশলে নিজেদের মূল দল যেহেতু দ্বিধাবিভক্ত সেহেতু এই দ্বিধাবিভক্তির সুযোগ নিয়ে উপদলগুলো নিজেদের কার পেছনে কতো শক্তি সেটা প্রদর্শণের জন্য প্রাণপণ লড়াই শুরু করে দিয়েছেন। রাজনৈতিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করে একপেশে মনোনয়ন লাভ প্রক্রিয়া সূচিত হওয়ায় এখন এই শক্তি মূলত: অর্থ ও পেশির দিকে ধাবিত হয়েছে।
শুধু অর্থ ও পেশির শক্তি প্রদর্শণ শুরু হবার পর থেকে সবাই বৃহত্তর নৈতিকতার দিকটি উহ্য রেখে কার্যত: নিজেরাই নিজেকে নিধনের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছেন। যেমন, নিজদলে প্রার্থীগণকে বিভিন্ন উপদলে স্বতন্ত্র, ডামি, বিদ্রোহী ইত্যাদি অভিধায় পদ সাজিয়ে মাঠে নামিয়ে দেবার পর তারা নিজেরা ক্ষমতা লাভের আশায় কার্যত: নিজেদের আদর্শ ও দলের প্রতি পাল্টপাল্টি কুৎসা রটনা ও বিষোদগার করছেন।
এতে নিজেদের দুর্বল দিকগুলো জনসমক্ষে উন্মোচিত হয়ে পড়ছে। কে কতো অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন, কার গাভী ও মাছের খামারে বছর না ঘুরতেই আলাদিনের চেরাগ জ্বলে উঠেছে, বিদেশে কে কত টাকা পাচার করেছেন, কার স্ত্রীর কত অবৈধ সোনা, ফ্লাট, গাড়ি আছে, কোন প্রার্থী তার হলফনামায় কত সম্পদের হিসাব গোপন রেখেছেন সেগুলো দেশ-বিদেশের সবাই জানার সুযোগ পেয়ে গেছে।
শুধু পাল্টপাল্টি বিষোদগারই নয়- চাচা- ভাতিজার, একবন্ধু আরেক বন্ধুর নির্বাচনী ক্যাম্প ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করছেন। ইসির কোন হুংকারে তাদের সংঘাত বন্ধ হচ্ছে না। পালা করে সবাই নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘণ করার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। এসব প্রচারণা বুমেরাং হয়ে আরো বেশি প্রতিহিংসার জন্ম দিচ্ছে।
এই কুৎসা রটনা থেকে দ্ব›দ্ব-সংঘাত, হানাহানি, ইতোমধ্যে হত্যা, খুন-খারাবি পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বাবা স্বতন্ত্রের অনুসারী হওয়ায় হিংসাবশত: ঝলসে দেয়া হয়েছে সন্তানকে। চাঁপাই-১ আসনের শিবগঞ্জে ১২ বছরের শিশু লালনের বাবা ট্রাক প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় তার শিশুপুত্রকে ঝলসে দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে নির্বাচনী সহিংসতায় পিরোজপুর ও মাদারীপুরে দুইজন নিহত হয়েছে। এভাবে মৃত্যু ও স্বার্থের সংঘাত শুরু হওয়ায় কেউই পরবর্তীতে এসব ছেড়ে কথা বলবেন না বলে মনে হয়।
এসবকিছু ছাপিয়ে ভোট বর্জন ও ভোট কেন্দ্রে না-যাওয়া নিয়ে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর ভোটবিরোধী প্রচারণা ইতোমধ্যে বেশ চাঙ্গাভাব লাভ করে জনপ্রিয়তা পেয়ে চলছে। তারা বলছেন, এসব শাসকদলের প্রার্থীদের মধ্যে এতসব বিষোদগারের তথ্য জনসন্মুখে প্রকাশিত হওয়ায় শুধু আমরা কেন, যে কোন সরকার আসুক না কেন পরবর্তীতে তাদের কোন তদন্ত সংস্থা বা কেউই ছেড়ে কথা বলবে না।
কোন কোন স্বতন্ত্র প্রার্থী মনে করছেন তাদের জনসমর্থন অনেক বেশী হলেও সেখানে বাটোয়ারাকৃত পূর্বনির্ধারিত ফলাফল ঘোষিত হতে পারে। কিন্তু মনোনয়নবঞ্চিত স্বতন্ত্ররা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে অতি সোচ্চার। এজন্য এবার স্বতন্ত্র প্রার্থীদের তৎপরতা বেড়ে গেছে এবং তাদের উপর মানুষের কৌতুহল অনেকটা বেড়ে গেছে। তা হলো- দ্রুত পরিবর্তনশীল নির্বাচনী সমীকরণ থেকে আত্মনিধনের বিষোদগার সামলিয়ে আলো আনতে পারবে কি এই নির্বাচন?
কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা দিন দিনে নমনীয় না হয়ে আরো বেপরোয়া ও শক্ত অবস্থানে চলে যাওয়ায় তাদের নির্বাচনী কর্মীরা ভোটে বিজয়ের আশায় অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছেন এবং এতদিনের সুপরিচিত প্রতিপক্ষের কর্মীদের উপর মারমুখী আচরণ করছেন। এতে শাসক দলের কৌশলগত দুর্বলতা প্রকাশিত হওয়ায় এসব পাল্টাপাল্টি বিষোদগার অনেকটা বুমেরাং হয়ে আত্মহণনের শামিল হয়েছে বলে অনেকে ধারণা করছেন।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৩)
Developed by- .::SHUMANBD::.