বৃহস্পতিবার | ২৩ মে, ২০২৪ | ৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১

মদ্যপী ও ‘ইয়াবাই’এবং আজ রাতের প্রার্থনা

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম :

ইয়াবা একটি ‘ক্রেজি ড্রাগ’। এ মাদকদ্রব্যটি সেবন করলে মানুষের মতিভ্রম ঘটে ও চরম মাতলামী শুরু হয়। যতদূর জানা যায়, এর উৎপত্তি হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। তাই এর প্রথম নাম ‘নাৎজী স্পিড’ বা হিটলারের নাৎজী বাহিনীর মত গতি। হিটলার তাঁর সৈন্যদেরকে দীর্ঘ সময় যুদ্ধক্ষেত্রে সবল রাখার উপায় হিসেবে সে সময়কার নজরবন্দী বিজ্ঞানী ও রসায়নবিদদেরকে এই ওষুধ আবিষ্কার করতে বাধ্য করেন। কালক্রমে এটা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

মেটা এমপেথামিন (২৫%-৩৫%) ও ক্যাফেইন (৪৫%-৬৫%)-এর সংমিশ্রনে তৈরী এই শক্তিশালী উদ্দীপক ওষুধটি বর্তমানে এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তৈরী হয়। এশিয়ায় এর বহুল ব্যবহার হলেও ইউরোপ-আমেরিকার র‌্যাভেজ ও টিকালো পার্টিতে এর জনপ্রিয়তা রয়েছে। পশ্চিমের নাইট ক্লাবগুলোতে রাতভর পাগলপারা নৃত্য উন্মাদনা সৃষ্টিতে এটা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এমনকি থিয়েটারের নর্তকীরা নখের ওপর দাড়িয়ে মাতালের মত ঘুরে-ফিরে নৃত্যভঙ্গিমা করতে এই উদ্দীপক ওষুধ ব্যবহার করে।

দেশে দেশে ইয়াবার নামডাক নানাভাবে করা হচ্ছে। থাইল্যান্ডে ইয়াবাকে ‘ম্যাডনেস ড্রাগ’ বা পাগলামী ওষুধ বলে। মিয়ানমারে এটাকে ‘ইয়ামা’ বা ‘হর্স ড্রাগ’ বলে। ভারতে এর নাম ‘ভুলভুলিয়া’, ফিলিপিনস্ ও ইন্দোনেশিয়ায় এর না ‘সাবু’। জাপানে ইয়াবাকে বলে ‘কাকুসেইজাই’ সংক্ষেপে ডাকে ‘কাকু’। চীনে ইয়াবাকে বলে ‘মাগো মাগে’। বাংলাদেশে ইয়াবাকে ‘বাবা’ বলা হয়। তাছাড়া বাংলাদেশে এলাকাভেদে এর নানা ছদ্মনাম রয়েছে। পাগলপারা এ ওষুধটির আসল-নকল রয়েছে। একশতভাগ আসলটি সেবন করলে মানুষের মধ্যে চরম মাতলামী শুরু হয়।

ইয়াবাসেবীদের বৈশিষ্ট্য বা চিহ্ন: ইয়াবাসেবীরা কখনও বেপরোয়া, কখনও চুপসে মনমরা হয়ে থাকে। এরা টাকা ও ধনসম্পদ খুব পছন্দ করে। নিজের অনেক সম্পদ থাকলেও বে-হিসেবী হয়ে যাওয়ায় তা দ্রæত শেষ করে ফেলে। অন্যের কাছে যখন তখন হাত পাতে, ধার করে, চুরি করে। এরা ঘুমায় না কিন্তু ঘোরের মধ্যে থাকে। কোন কিছু জিজ্ঞাসা করলে ফ্যাকাশে চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। চুল বড় রাখে, হাতের শিরা ভেসে থাকে। এরা সব সময় সন্দেহবাতিকতায় উদ্বিগ্ন থাকে।

ইয়াবা ব্যবসায়ীদের নিকট লাল, গোলাপী, সবুজ, ক্রিষ্টাল নানা রঙের ইয়াবা বড়ি কিনতে পাওয়া যায়। এগুলোর দেশ ভেদে ভিন্ন নাম থাকলেও আমাদের দেশে মানুষের চোখ ফাঁকি দিয়ে ব্যবসা করার সুবিধার্থে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়। এদের নানা ব্য্রান্ড আছে।  তার মধ্যে- জনপ্রিয় চারটি ব্র্যান্ড ০০৭, ডব্লিউ, ওয়াউ, চম্পা, নীলা। এই চারটি ব্র্যান্ডউ ভারতের চব্বিশ পরগণায় উৎপন্ন হয়ে (দি ইনডিপেনডেন্ট ২৫.০৯.২০১৬) যশোর ও সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান হয়ে আমাদের দেশে আসে। ভারতের মাদক ব্যবসায়ী যারা পূর্বে ফেনসিডিলের চোরাচালান করতো তারা এখন ইয়াবার ফ্যক্টরী দিয়েছেন। দীপক চ্যাটার্জী তাঁর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলেন, সীমান্তের কিছু ওপারেই পাঁচটি কারখানায় ইয়াবা তৈরী হচ্ছে ! পূর্বে মিয়ানমার, পশ্চিমে ভারত বাংলাদেশকে ইয়াবা দিয়ে আপ্যায়ন করে চলেছে।  আমরা বাংলাদেশীরা বোকার মত সেগুলো কিনে খেয়ে বুঁদ হয়ে ইহকাল-পরকাল হারিয়ে চলেছি!

শুধু তাই নয়, ইয়াবা সেবনের প্রভাবে যেসব ভয়াবহ সমস্যা হয় তা হলো-প্যারানইয়া, সাইকোসিস ও ভায়োলেন্ট আচরণ করা। ইয়াবার ধোঁয়া মানুষের শ্বসনযন্ত্রকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। স্ট্রোক, হার্টফেইলিওর, ডিপ্রেশন ইত্যাদি হতে পারে। পারিবারিক ও সামাজিক ভাঙ্গন (তালাক, একঘরে করা, উক্ত পরিবারে বিয়ে না দেয়া ) সূচিত হয় এবং আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

ইয়াবা ব্যবসায়ী ও পাচারকারীচক্র ভাই ভাই। এরা সিংহভাগ ধনীক গোষ্ঠী ও রাজনীতিক শ্রেণির মানুষ। এরা সব সময় আইন শৃংখলাবাহিনীর সদস্যদেরকে মোটা টাকা ঘুষ দিয়ে নিজেদের ব্যবসা জিইয়ে রাখে ও স্বাভাবিক চলার পথ পরিষ্কার করে রাখে। এদের অর্থ ও ক্ষমতার দাপট খুব ভয়ংকর।

এদের অর্থ ও বিত্ত কি না করতে পারে? খবরে প্রকাশ (প্রথম আলো ০৭.০৫.২০১৭) ইয়াবা স¤্রাট আমিন হুদা জেল খেটেছেন হাসপাতালের বিছানায়! ‘ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগে তাঁর ৭৯ বছর জেল হয়েছিল। তিনি ১৮ মাস ধরে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে ছিলেন দু’টি রুম নিয়ে। এসি কক্ষে ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন সবই আছে..বডিগার্ড, সহকারী সবই ছিল। যার জেলে থাকার কথা, তিনি মাঝে মাঝে গাড়ি নিয়ে বাইরে ঘুরতে যান। আইন তো সবার জন্য সমান নয়। শাস্তি হলেও তিনি আরাম আয়েশে থাকেন!’ আসলে এরাই আমাদের সমাজের ইয়াবাই বা আশ্চর্যজনকভাবে ভয়ঙ্কর শ্রেণি! এদের রুখবে কে? কারা পুলিশের কোন সদস্যরা কার নির্দেশে, কোন আইনে, কিভাবে, তাকে গাড়িতে নিয়ে বাইরে ঘুরতে গিয়েছিল জনগণ সে জবাব কার কাছে পাবেন? আসলে রক্ষক যখন ভক্ষক হয়ে যায় তক্ষুনি এ ধরনের ঘটনা ঘটা স্বাভাবিক বৈ কি?

এদেশে কোন কোন সাংসদ, নেতা, মাদক ব্যবসা করে অভিযুক্ত হয়েও মন্ত্রীর পিছনে সদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আমরা জানি, আইন শৃংখলাবাহিনীর সদস্যরা রাঘব বোয়াল অপরাধীদের পাহারা দেন! অথচ, তারা রমনা পার্কের ইয়াবার পুড়িয়া বিক্রিওয়ালীকে সকালে-বিকেলে ধরে নিয়ে সহজে ছেড়ে দেন না!

আমরা এটাও জানি যে, বর্তমানে দেশে আইন শৃংখলাবাহিনীর মধ্যে অনেক মেধাবী গবেষক, অভিজ্ঞ নীতি-নির্ধারক রয়েছেন। তাঁরা সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে গবেষণালব্ধ অনেক আধুনিক কথা বলেন। শুধু তাঁরা জানলে ও বললেই চলবে না- বাহিনীগুলোর নিম্নপদে মাঠপর্যায়ে কর্মরত সদস্যদেও জন্য বেশী বেশী প্রশিক্ষণ ও মটিভেশনাল ওয়ার্কশপ করা প্রয়োজন। কারণ, মাদকদ্রব্য অনুপ্রবেশ, পাচার, বিক্রি, ব্যবহার বন্ধ করতে হলে সর্বাগ্রে আইন শৃংখলাবাহিনীর সকল পর্যায়ে কর্মরত সদস্যদের কঠিন প্রতিজ্ঞা (কমিটমেন্ট) করা দরকার। তাঁরা সবাই একটু মনযোগী হলেই এদেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন কাজ নয়। আর যারা এ কঠিন প্রতিজ্ঞা করতে চান না তারা  বাংলাদেশের ক্ষতি করার জন্য ‘ইয়াবাই’। অনেকবার ‘ইয়াবাই’ শব্দটি বলা হলো। এবার আসুন দেখি কেন তা বলছি-

‘ইয়াবাই’ জাপানী গালি শব্দ। জাপানে মাদকদ্রব্যকে বলে ‘মায়াকু’ যেখানে ‘মা’ অর্থ ‘প্যারালাইসিস’ ও ইয়াকু অর্থ ওষুধ। এ ছাড়া জাপানে ইয়াবাকে বলে ‘কাকুসেইজাই’ সংক্ষেপে ডাকে ‘কাকু’। আর ‘ইয়াবাই’ অর্থ বাজেকিছু বা ‘বিপদ ভয়ঙ্কর’। এই শব্দটি হাল্কা মন্দ থেকে চরম নেতিবাচক সব পরিস্থিতিতে ব্যবহৃত হয়। যেমন, বাংলায়- চুপ কর! বেয়াদব কোথাকার। বাক্যটিকে এককথায় ‘ইয়াবাই’ শব্দ দিয়ে বোঝানো যায়। আবার- অন্যায়, অবিচার, কঠিনকাজ, ভয়ঙ্কর, সামনে মহাবিপদ, ইত্যাদিও ক্ষেত্রেও ‘ইয়াবাই’ শব্দ দিয়ে বুঝানো হয়।

দেশ স্বাধীন হবার পূর্বেকার সময়ের আর্থিক-পুঁজিতন্ত্রের ক্ষমতাধারীরা ২২ পরিবার থেকে দেশে ২২ হাজার পেরিয়ে ২০২৪ সালে ২২ লক্ষ পরিবার পেরিয়ে গেছে। গণ-অর্থতন্ত্রের ক্ষমতা পারিবারিক পুঁিজতন্ত্রের মধ্যে কুক্ষিগত করার এ প্রক্রিয়াকে ‘ইয়াবাই’ শব্দ দিয়ে বুঝানো যায়। সংবাদে প্রকাশ, একই পরিবারের চারজন একটি ব্যাংকের পরিচালক হতে পারবেন! এটা এখন আর কোন পারিবারিক পুঁিজতন্ত্রের নমুনা নয় বরং চরম স্বেচ্ছাচারী হবার ব্যবহরিক দিক। দেশ লুটে খেয়ে টাকা পাচার করে পালানোর এটা সহজ পথ তৈরী কি না? এমন পরিস্থিতি বা ক্ষেত্রকেও ‘ইয়াবাই’ শব্দ দিয়ে বুঝানো যেতে পারে।

কানাডা বা জাপানে ব্যাংক আমানতের সুদের হার কত? কিছুকাল পূর্বে তাঁদের এই সুদের হার ১.৯% অথবা ২%এর বেশী ছিল না। আমাদের দেশে সুদের হার কত? বর্তমানে ১০%-১৫%? সেটা সবাই জানেন। আমরা ব্যাংকে কেন টাকা রাখি কেন সুদ খাই তা সুদ হারের উচ্চতা দেখে সহজেই অনুমেয়। পঁচাশি ভাগ মুসলিম-এর দেশে সুদের বিকল্প কি ভাবা যায় না? সুদ নেয়া-দেয়া তো মুসলিমদের জন্য নিষিদ্ধ বা হারাম। অথচ, আমরা কুম্ভকর্ণের মত সুদের চর্চা করছি। এটাকেও ‘ইয়াবাই’ বলা যায়।

সেদিন টিভিতে একটি কৌতুক-নাটক দেখলাম। এক সুস্থ-সবল কর্মক্ষম ছেলে প্রতারণা করে বোরখা পরে ভিক্ষা করছে। সেই প্রতরণা করে অবৈধ উপার্জনের অনেক অর্থ থেকে অপর ভিক্ষুককে মাত্র দু’টাকা দান করেছে। আমাদের দেশের উচ্চবিত্ত, ধনীলোকদের চরিত্র এমন। কোটি কোটি টাকা যাকাত দেয়া ফরজ হলে লোক দেখানো সামান্য কিছু যাকাত দেন, যেটা আবার ঘটা করে মাইক বাজিয়ে, জনসমক্ষে! সেখানে পদপিষ্ট হয়ে জাকাতপ্রার্থীদের করুণ মৃত্যুর খবর প্রতিবছর শোনা যায়! এরা কি আসলে মুসলিম? তাহলে জালিমের সংজ্ঞা কী?

আমরা যারা এই সংজ্ঞায় পড়ি, তাহলে তারা কেন কষ্ট করে রোজা রাখি কেন হজ্জ করি? এ্টা কি মহাপ্রভু আল্লাহ পাকের সংঙ্গে প্রতারণার সামিল নয়? এবারের রমজানের শেষ দশকে পবিত্র শবে ক্কদরের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। পবিত্র এ রাতে তাদের দোয়া কবুল হয় না-

যারা মুশরিক (আল্লাহ পাকের বিদ্রোহী তথা- প্রদর্শিত পথ ছেড়ে উল্টো পথে চলে; যারা ঘুষ খায়, মিথ্যা বলে, চুরি, ডাকাতি, জালিায়াতি করে, মানুষ খুন করে-গুম করে, মদ্যপ, জেনা-ধর্ষণ করে); হিংসুক; পিতামাতার অবাধ্য হয়ে তাঁদেরকে কষ্ট দেয়, ওজনে কম দেয়, ইত্যাদি। এরা মন্দ মানুষ, এরা প্রতারক, সৃষ্টিকর্তা তথা মহাপ্রভু আল্লাহ পাকের সংগে প্রতারণা করে, সম্পদ জমিয়ে রাখে, সুদ খায়। এই দৃষ্টিতে এরা সবাই ‘ইয়াবাই’।

উচ্চবিত্ত ও উচ্চমার্গের অপরাধীরা আমাদের দেশে বুক ফুলিয়ে চলার দৌরাত্ম্য দেখায়। এরা দিনে লোক দেখানো রোজা রাখে, ফাইভ স্টার হোটেলে ইফতার করে সাহরী কিনে, মাদকও গিলে। এরা শাসন মানে না, আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়, খারাপ কাজে ঘৃণা ও লজ্জা পায়না, ইহকাল-পরকাল কোন কিছুকেই ভয় পায় না। এদের পাপ বোধ নেই, এদের অন্তরে বোধহয় কালিমার সিল মারা হয়ে গেছে। মহান আল্লাহ এদেরকে হেদায়েত দান করুন।

আসুন, সবাই মিলে আজ পবিত্র শবে ক্কদরের রাতে এদের হেদায়েতের জন্য দোয়া করি, আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের কল্যাণের জন্য হাত তুলি সকল অন্যায়-অবিচার ও ‘ইয়াবাই’ প্রতিহত করি ও এদের দৈন্য নীতির আশু ক্ষতি থেকে প্রতিকার লাভের জন্য ঐশী সাহায্য কামনা করি। আজকের পবিত্র ক্কদরের রাতে এই প্রত্যাশা সবার কাছে।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন E-mail: [email protected]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৩)
Developed by- .::SHUMANBD::.