নাটোর প্রতিনিধি :
ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নাটোর শহরে ৪ নারী অতিথিকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ।
রোববার (২৩ মার্চ ২০২৫) নাটোর শহরে বিশেষ কৌশলে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
বরণীয় অতিথিরা হলেন, ব্রাহ্মনবাড়িয়ার নাসির নগরের ধরম মন্ডল গ্রামের সেলিনা আক্তার @ জোসনা (বেদের মেয়ে), সুবর্না আক্তার চাঁদনী, এলেনা, পিতা-নুর মিয়া, মাতা-রঙমালা, সর্ব সাং-, থানা-, জেলা- (নামগুলো যেন বেদে বেদে) এবং বগুড়ার চ্যালোপাড়া গ্রামের জাকিয়া টুনটুনি।
নাটোরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-ডিবি) মো. হাসিবুল্লাহ হাসিব ঘটনা বর্ণনা করেন। যা হুবহু তুলে ধরা হলো। ঘটনা পরিক্রমা: মিশন ফাঁদ। রমজান মাসের ১০ থেকে ১৫ রোজা যেতেই ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নাটোর শহরে অতিথিদের আনাগোনা বেড়েছে। অতিথিগন আবার মহিলা হওয়ায় ও তাদের কার্যকলাপে ভুক্তভোগী নাটোরবাসী অতিষ্ঠ। পুলিশও বিব্রত। এটা হতে পারে না। হতে দেওয়া যায় না। পুলিশ সুপার নাটোর স্যারের মিটিংয়ে অতিথিদের ডিবি কার্যালয়ে বরণ করার জন্য আমাকে নির্দেশনা দিলেন। মিটিং শেষে আমি আমার টিম ডিবির সকল সদস্যদের নিয়ে একটা প্ল্যানিং মিটিং করলাম। সবাইকে প্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য আদা-জল খেয়ে মাঠে নামতে বললাম। মাঠে নেমে অতিথিদের দেখা আর মেলে না। ফাঁদ পেতেই রইলাম। ফাঁদের কার্যকলাপের অংশ হিসেবে রোববার (২৩ মার্চ ২০২৫) সকাল ১১টা থেকে ইন্সপেক্টর নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে টিম ডিবি নাটোরের সাব টিম নাটোর শহরে। উদ্দেশ্য একটাই ঈদের অতিথিদের বরণ করে নেওয়া। নজরুলের টিমে যারা আছেন তাঁরা কেউ ডিবি পোশাকে আবার কেউ ছদ্মবেশে মিশে আছেন সাধারণ লোকের ভিড়ে। সময় দুপর ১২টা আমার অফিসে নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মাহমুদা শারমীন নেলী স্যার। অন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা নিয়ে আলোচনা চলছিল। টিম ডিবি নাটোরের অপর টিম মার্ডার মামলার আসামি ধরার জন্য রাজবাড়ী জেলায় অভিযান চালাচ্ছেন। সেই নিয়ে আলোচনা। এমন সময় ইন্সপেক্টর নজরুল মোবাইলে জানাইলেন অতিথিদের পাওয়া গেছে। নির্দেশনা দিলাম, বরণ করে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসতে। বাড়িতে অতিথি আসা মানে আল্লাহর তরফ থেকে নিয়ামত। তবে এই অতিথিগন নয়। এরা বিভিন্ন জেলায় গিয়ে টার্গেট ঠিক করে। সময় সুযোগ কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম ভিড় সৃষ্টি করে মহিলাদের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে টাকা পয়সা কৌশলে চুরি করে সর্বশান্ত করে। আজকে যখন অতিথিরা চুরির কাজে নিয়োজিত ও আজকে সবেমাত্র একজন নাটোরবাসির সর্বনাশ করেছে, তাই আশা করলাম পুরো চক্রটি ধরতে। একজন ভুক্তভোগি টিম ডিবি নাটোরকে জানান। ইন্সপেক্টর নজরুল বিয়টি শুনে ছদ্মবেশ ধারনকারী ডিবি সদস্যদের শনাক্ত করতে নির্দেশ দেন। আমাকে জানানোর পর ইন্সপেক্টর নজরুলকে জানালাম, অতিথিরা যেহেতু এখন নাটোর শহরে আছে, তাই যেকোন মুল্যে বরণ করার নির্দেশ দিলাম। ঘন্টা খানেক ভেল্কিবাজী খেলার পর ইন্সপেক্টর নজরুল জানালেন, ফটিকসহ নারী সদস্য মিলে একজন অতিথিকে হাতে নাতে ধরেছেন। ফটিক হলো আমার ডিবি সদস্য। আমি ভালোবেসে তাঁকে ফটিক বলে ডাকি। নারি সদস্য ছিল তারাশী (ছদ্মনাম) পরে ওই চক্রের আরো তিন সদস্যসহ মোট চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সাথে একজন বোনাস। বোনাস মানে ওই চক্রের এক সদস্যর ৮/১০ মাসের একটা বাচ্চা আছে। কেউ যেন তাদের সন্দেহ করতে না পারে। যদি ধরা পড়ে সেক্ষেত্রে শিশুর দোহায় দিয়ে ছাড়া পায়। সে জন্য শিশুদের ব্যবহার করে এই সব অতিথিরা। ডিবি অফিসে বরন করা হলো। শিশুটিকে দেখে মায়া লাগছিলো। কেন জানি মনে হলো, শিশুটি তার মাকে চরম ঘৃণার চোখে দেখছে। যাহোক অতিথিদের সাথে কুশলাদি জিজ্ঞেস করে নাম ঠিকানা নিলাম। প্রথমে অতিথিরা আমার কাছে সতি-সাধ্যি সাজার চেষ্টা করলো। পরে আস্তে আস্তে সব স্বীকার করলো। অতিথিদের আজকের আয় উপার্জনের টাকাগুলো জব্দ করা হয়েছিলো আগেই। আশ্চর্য হলাম অতিথিদের মধ্যে এক জন ছিল বাইদেনী। না, না, বেদের মেয়ে জোসনা নয়। উনি হলেন বেদের মেয়ে চুন্নি। কারন বেদের মেয়ে জোসনা তো কাউকে সাপে কাটলে বা দংশন করলে বিষ নিবারণ করেন। আর এই বেদে কন্যা চুন্নি মানুষের ব্যাগ কাটে বা দংশন করে। ভুক্তভোগীকে ডাকা হলো। প্রশংসা করলেন আমার ফটিকের, অন্য এক ডিবি সদস্য সহ নারী সদস্য তারাশিদের।
বরণীয় অতিথিরা হলেন, ১। সেলিনা আক্তার @ জোসনা (বেদের মেয়ে), স্বামী-ওস্তার @ কালচান, মাতা-রঙমালা ২। সুবর্না আক্তার চাঁদনী, পিতা-কালাচান, ৩। এলেনা, পিতা-নুর মিয়া, মাতা-রঙমালা, সর্ব সাং- ধরম মন্ডল, থানা- নাসির নগর, জেলা-ব্রাহ্মনবাড়িয়া (নামগুলো যেন বেদে বেদে) এবং ৪। জাকিয়া টুনটুনি, গ্রাম-চ্যালোপাড়া, বগুড়া।
ইন্সপেক্টর নজরুলকে অতিথিদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়ে নাটোর সার্কেল স্যারকে নিয়ে গেলাম অপহরণ মামলার ভিকটিম উদ্ধার করতে। লালপুর থেকে ভিকটিম উদ্ধার করে অফিসে সবার সাথে ইফতার করলাম। বাসায় ফিরতেই ডিবি নাটরের অপর অভিযানিক টিম লিডার এসআই অসিত রাজবাড়ী জেলা থেকে মুঠোফোনে জানালেন অভিযান সফল। মানে বড়াইগ্রাম থানার মার্ডার মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিনন্দন জানালাম। আমারও শান্তি লাগলো। আসুন আমরা সচেতন হই। বদমাইস অতিথিদের শিকার না হই। হানাহানি থেকে দূরে থাকি।
আমাদের কষ্ট হলেও আছি আপনাদের সাথে এবং পাশে। ভালো থাকুক প্রিয় নাটোরবাসি। জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ নাটোরবাসি।