রবিবার | ৪ জানুয়ারি, ২০২৬ | ২০ পৌষ, ১৪৩২

ড্রামাটিক ডেকাপিটেশন স্ট্রাইক ও মাদুরোকে তুলে আনা মাস্তানি কেন?

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে দেশ থেকে আটক এবং তুলে আনা হয়েছে। গত ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ ঘড়ির কাটায় যখন স্থানীয় সময় রাত ২টা, পুরো রাজধানী কারাকাস তখন গভীর ঘুমে ঠিক তখন ৯টি সামরিক হেলিকপ্টার জনগণের ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিয়ে সামরিক আক্রমণ পরিচালনা করেছে। সেইসঙ্গে এ সামরিক অভিযান চালিয়ে মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের কথাও জানা গেছে। বিষয়টি ক্ষুদ্র সামরিক শক্তির দেশগুলোর জন্য্ ভয়ংকর রকমের অস্বস্থিকর সংকেত !
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কিছু শব্দ আছে, যেগুলো শুনতে যতটা রোমাঞ্চকর, বাস্তবে ততটাই ভয়ংকর। ‘ডেকাপিটেশন স্ট্রাইক’ তেমনই এক শব্দ। শত্রু রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে পরিচালিত আকস্মিক সামরিক আঘাত। এই কৌশলকে অনেক সময় দ্রুত সমাধানের ম্যাজিক ফর্মুলা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু ইতিহাস বলে, এমন ড্রামাটিক আঘাত রাষ্ট্রব্যবস্থার সমস্যার সমাধান তো করেই না বরং নতুন অস্থিরতা, দীর্ঘমেয়াদি সহিংসতা ও আন্তর্জাতিক আইনের চরম অবমূল্যায়ন ঘটায়। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরাতে প্রকাশ্য ও গোপন নানা ষড়যন্ত্র, এমনকি তাকে তুলে আনার মাস্তানিপূর্ণ পরিকল্পনা এই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
ডেকাপিটেশন স্ট্রাইক ধারণার মূল যুক্তি হলো, রাষ্ট্র বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর মাথা কেটে ফেলতে পারলে পুরো কাঠামো ভেঙে পড়বে। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র কেবল একজন ব্যক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও তাই। মাদুরো সরকার বিতর্কিত, তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এসব অভিযোগের জবাব কি হবে বিদেশি হস্তক্ষেপ, অপহরণ বা সরাসরি সামরিক আঘাত? কোনো দেশের নির্বাচিত বা ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে ‘তুলে আনার’ হুমকি কূটনৈতিক ভাষায় নয়, বরং গ্যাংস্টার স্টাইলে কথা বলার শামিল।
ভেনেজুয়েলা বহুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িত। তেলসমৃদ্ধ এই দেশটির অর্থনীতি নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অচলাবস্থায় বিপর্যস্ত। এই দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে রেজিম চেঞ্জ-এর নামে একাধিকবার প্রকাশ্য ও গোপন উদ্যোগ দেখা গেছে। কখনো বিরোধী নেতাকে ‘অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট’ ঘোষণা, কখনো সামরিক অভ্যুত্থান উসকে দেওয়ার চেষ্টা, আবার কখনো সরাসরি মাদুরোকে অপহরণ বা হত্যা পরিকল্পনার অভিযোগ। এসবের কেন্দ্রে রয়েছে শক্তির রাজনীতি, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও জনগণের মতামত গৌণ।
ডেকাপিটেশন স্ট্রাইক বাস্তবায়নের ইতিহাস খুব একটা সফল নয়। ইরাক, লিবিয়া কিংবা আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা বলছে, শীর্ষ নেতৃত্বকে সরালেই স্থিতিশীলতা আসে না। বরং ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, যার সুযোগ নেয় সশস্ত্র গোষ্ঠী, চোরাকারবারি ও বিদেশি স্বার্থান্বেষীরা। লিবিয়ায় গাদ্দাফি অপসারণের পর দেশটি আজও কার্যত বিভক্ত। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও জঙ্গিবাদের বিস্তার গোটা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করেছে। ভেনেজুয়েলাতেও যদি একই পথ অনুসরণ করা হয়, তাহলে তা শুধু দেশটির জন্য নয়, গোটা লাতিন আমেরিকার জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।
আরও উদ্বেগজনক হলো এই ধরনের মাস্তানি কৌশল আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে ক্রমেই জঙ্গল আইনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শক্তিশালী দেশ যদি দুর্বল বা বিরোধী রাষ্ট্রের নেতাকে অপহরণ বা হত্যা করার হুমকি দেয়, তাহলে আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজনই বা কী? জাতিসংঘ সনদের মূল ভিত্তি হলো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই নীতিগুলো কেবল দুর্বল দেশগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক, শক্তিশালীদের জন্য নয়। মাদুরোর সমালোচনা করা এক জিনিস, আর তাকে তুলে আনার হুমকি দেওয়া আরেক জিনিস। প্রথমটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিসরে পড়ে, দ্বিতীয়টি সরাসরি অপরাধমূলক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ বা হত্যার পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক আইনে সন্ত্রাসবাদ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত। কিন্তু যখন এই পরিকল্পনার পেছনে থাকে পরাশক্তির ছায়া, তখন সংজ্ঞা বদলে যায়, নৈতিকতা ঝাপসা হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে ভেনেজুয়েলার জনগণের ভবিষ্যৎ কে ঠিক করবে? ওয়াশিংটনের থিঙ্কট্যাঙ্ক, গোপন সামরিক চুক্তি, নাকি ভেনেজুয়েলার ভোটাররা? গণতন্ত্রের কথা বলে যারা রেজিম চেঞ্জের তত্ত্ব দাঁড় করায়, তারা কি সত্যিই জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল? নাকি গণতন্ত্র কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন ফলাফল পছন্দসই হয়? কিন্তু ড্রামাটিক ডেকাপিটেশন স্ট্রাইক ও মাদুরো পরিবারকে এভাবে রাষ্ট্রীয় ছিনতাই করা কেন?
শত্রু রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরাসরি লক্ষ্য করে আঘাত হানা, অপহরণ বা হত্যার পরিকল্পনাকে এই শব্দে বৈধতার আবরণ দেওয়া হয়। নেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে কেন্দ্র করে এমন আলোচনা ও হুমকি তাই নিছক নিরাপত্তা কৌশল নয়। এটি কার্যত একটি রাষ্ট্রকে জিম্মি করে রাখার প্রচেষ্টা বা রাষ্ট্রীয় ছিনতাই।
যখন কোনো রাষ্ট্র বা শক্তি অন্য একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণে নিতে চায় এবং আইন, কূটনীতি ও জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে তখন সেটিই রাষ্ট্রীয় ছিনতাই। মাদুরোকে তুলে আনার কথা বলা, তাকে অপসারণের জন্য সামরিক বা গোপন অভিযান পরিকল্পনা করা ঠিক এই সংজ্ঞার মধ্যেই পড়ে। এটি কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নয়, পুরো রাষ্ট্রের ওপর বলপ্রয়োগ।
ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে বিপর্যস্ত। মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করার অভিযোগ আছে এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব সমস্যার সমাধান কি বিদেশি শক্তির ড্রামাটিক হস্তক্ষেপে সম্ভব? নাকি এতে সংকট আরও গভীর হয়? ইতিহাসের দিকে তাকালেই উত্তর স্পষ্ট হয়ে যায়।
ইতোপূর্বে ইরাক, লিবিয়া কিংবা আফগানিস্তানের উদাহরণ দেখিয়েছে, দেশের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার নামে ডেকাপিটেশন স্ট্রাইক শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে ভেঙে দিয়েছে। সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ইরাক দীর্ঘদিন সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও জঙ্গিবাদের আগুনে পুড়েছে। লিবিয়ায় গাদ্দাফিকে সরানোর পর দেশটি আজও কার্যত একাধিক শক্তির নিয়ন্ত্রণে বিভক্ত। এই দেশগুলোর জনগণ স্থিতিশীলতা তো পায়ইনি, বরং অনিশ্চয়তা ও সহিংসতাই তাদের নিত্যসঙ্গী হয়েছে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও একই পরিণতি হওয়ার ঝুঁকি প্রবল।
মাদুরোকে লক্ষ্য করে যে ধরনের ভাষা ও পরিকল্পনার কথা শোনা যায়, তা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা ছাড়িয়ে যায়। কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে আনা শব্দবন্ধ নিজেই প্রকাশ করে একটি দখলদারি মানসিকতা। এটি এমন এক আচরণ, যা যদি কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী করত, তাহলে একে সন্ত্রাসবাদ বলা হতো। কিন্তু পরাশক্তি করলে সেটি হয়ে যায় কৌশল বা নিরাপত্তা উদ্যোগ। এখানেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দ্বিচারিতা নগ্ন হয়ে ওঠে।
জাতিসংঘ সনদের মূলনীতি হলো, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ না করা। কিন্তু বাস্তবে এই নীতির প্রয়োগ নির্বাচনী। শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে এই নীতি ভাঙলে তার কোনো কার্যকর শাস্তি নেই। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে তেল, ভূরাজনীতি ও আদর্শিক বিরোধ, সব মিলিয়ে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই চাপের মুখে। মাদুরোকে সরানো তাই একটি রাষ্ট্রকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার বৃহত্তর কৌশলের অংশ মনে হচ্ছে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে, গণতন্ত্রের কথা বলে যারা রেজিম চেঞ্জের কথা বলেন, তারা কি সত্যিই জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেন? নাকি গণতন্ত্র কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন নির্বাচনের ফলাফল কাঙ্ক্ষিত হয়? কোনো দেশের ভবিষ্যৎ যদি বিদেশি পরিকল্পনায় নির্ধারিত হয়, তাহলে সেই দেশের নাগরিকরা কেবল দর্শক হয়েই থেকে যায়। এটাই রাষ্ট্রীয় ছিনতাইয়ের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক যা হচ্ছে কার্যত: জনগণের সার্বভৌমত্ব কেড়ে নেওয়া। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই প্রবণতা গভীর উদ্বেগের। আজ ভেনেজুয়েলা, কাল অন্য কোনো দেশ।
যদি ডেকাপিটেশন স্ট্রাইক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কৌশল হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। রাষ্ট্রপ্রধানের নিরাপত্তা নয়, রাষ্ট্রের অস্তিত্বই তখন অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি পরিণত হবে শক্তিশালীদের খেলার মাঠে, যেখানে আইন থাকবে কেবল দুর্বলদের জন্য।
ভাবনার বিষয় হচ্ছে, এসব রাষ্ট্রীয় মাস্তানির সমাধান কোথায়? রাজনৈতিক সংকটের সমাধান রাজনৈতিক পথেই আসতে হবে। ভেনেজুয়েলায় প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা, অপহরণ বা সামরিক হুমকি নয়। মাদুরো সরকার সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়, কিন্তু তাকে সরানোর অধিকার ভেনেজুয়েলার জনগণের, কোনো বিদেশি শক্তির নয়। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই ঘটনাপ্রবাহ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আজ ভেনেজুয়েলা, কাল অন্য কোনো দেশ। ডেকাপিটেশন স্ট্রাইক যদি বৈধ কৌশল হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তাহলে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা কোথায়? রাষ্ট্রপ্রধানদের নিরাপত্তা ভন্ডুল হয়ে রাষ্ট্রের অস্তিত্বই তখন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে আর আন্তর্জাতিক রাজনীতি পরিণত হবে প্রকাশ্য শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চে।
বিশ্লেষকগণ মনে করেন, এর কার্যকর সমাধান একটাই। আর তা হলো, এই ধরনের রাজনৈতিক সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করা। ভেনেজুয়েলার সংকটেরও সমাধান আসতে হবে সংলাপ, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে। মাদুরো সরকার যতই সমালোচনার ঊর্ধ্বে না হোক, তাকে সরানোর দায়িত্ব ভেনেজুয়েলার জনগণের, কোনো বিদেশি শক্তির নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি যদি সত্যিই নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে, তাহলে দাদাগিরি বা শক্তির দাপট বন্ধ করে সহনশীলতার নীতিতে ছোট-বড় সবার দিনে সমান নজরে তাকাতে হবে।

× প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন।
E-mail: [email protected]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৩)
Developed by- .::SHUMANBD::.