
-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
সংবাদে শুনেছিলাম প্লাস্টিকের ভয়ংকর ক্ষতিকর প্রবণতা রোধে কক্সবাজারের সুগন্ধা পয়েন্টের সীগ্যাল বালুকায় একটি বৃহৎ প্লাস্টিক দানবের ভাস্কর্যের সাহায্যে জনসচেতনতা কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। হঠাৎ সেটাকে নিজ চোখে দেখতে পেলাম। সেদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শেষে বিকেলে কক্সবাজারে দিকে টেনে নিয়ে গেল সেখানকার দীর্ঘতম সৈকতের বালুকায় আছড়ে পড়া মোহনীয় ঢেউ। আমার সংগে ছিল গোটা পরিবার। দু’দিন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর পর রাতে ওদের আগ্রহে নিউ বিচ রোডে একটি রেস্টুরেন্টের খোলা জানালার নিকট বসতে হলো। সেখান থেকে সমুদ্রের দিকে কৃত্রিম বৃহৎ দানবের মাথাটা দেখা যাচ্ছিল। সে চোখের লাল আলোকচ্ছটা ছুঁড়ে দিচ্ছিল রাস্তার দিকে। এরপর ওর সম্পর্কে আরো কিছু জানতে গিয়ে এই ভ্রমণের অনেকগুলো বিষয় মনে ভেসে আসতে থাকলো।
বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার আমাদের গর্ব, বাংলাদেশের পর্যটনের প্রাণভোমরা, আর প্রকৃতির এক অপার বিস্ময়। ঢেউয়ের গর্জন, সূর্যাস্তের রঙ, বালুকাবেলার নরম স্পর্শ সব মিলিয়ে এটি একটি ভ্রমণকেন্দ্র এবং এটি আমাদের পরিবেশগত পরিচয়েরও অংশ। কিন্তু
আজ এই সৌন্দর্যের পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক নীরব অথচ ভয়ংকর শত্রু যার নাম প্লাস্টিক। বালুর ওপর, ঢেউয়ের সঙ্গে, জোয়ার-ভাটার খেলায় মিশে যাচ্ছে প্লাস্টিক বর্জ্য। সেই প্লাস্টিক এখন আবর্জনা ছাড়িয়ে যেন এক সাগর দানব। যে ধীরে ধীরে গিলে খাচ্ছে কক্সবাজারের প্রাণ।
কক্সবাজারে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটকের আগমন ঘটে। পর্যটন অর্থনীতির চাকা ঘোরে, কর্মসংস্থান তৈরি হয়। এ সত্য অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু এই ভিড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার। পানির বোতল, খাবারের প্যাকেট, পলিথিন, স্ট্র, কাপ,
প্লেট। সৈকতের বালুতে ছড়িয়ে থাকা এসব প্লাস্টিক কেবল চোখের সৌন্দর্য নষ্ট করছে না; এটি পরিবেশের ভারসাম্য ভেঙে দিচ্ছে। ঢেউ এসে এসব বর্জ্য টেনে নিচ্ছে সমুদ্রে, আবার জোয়ারে ফিরিয়ে আনছে এক অবিরাম চক্রে।
প্লাস্টিকের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর দীর্ঘস্থায়িত্ব। শত শত বছরেও এটি পুরোপুরি ক্ষয় হয় না। বড় প্লাস্টিক ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়, যা চোখে দেখা যায় না কিন্তু সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে পড়ে। মাছ, কচ্ছপ, ডলফিনসহ অনেক সামুদ্রিক প্রাণী প্লাস্টিককে খাবার ভেবে
গিলে ফেলে। কচ্ছপের পেটে প্লাস্টিক ব্যাগ পাওয়া এখন আর বিরল খবর নয়। এই মাইক্রোপ্লাস্টিক শেষ পর্যন্ত মানুষের খাবারেও ঢুকে পড়ছে যা এক ভয়াবহ মরণঘাতী বৃত্ত তৈরী করে চলেছে।
সেদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একডেমিক কাজ শেষে কক্সবাজারে গিয়ে আবারো বোতলের দানবের কথা মনে পড়ল। আমাদের কক্সবাজার আগমনের কথা জানতে পেরে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিল সেখানে কর্মরত একজন আত্মীয় এবং একজন সাবেক ছাত্র। রাতের খাওয়া শেষ করে সবাই বীচের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। দানবের ভাস্কর্যের নিকট গিয়ে কেউ কেউ ছবি তুলল।
মূলত: এটা ওসান-প্লাস্টিক দিয়ে বানানো বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ প্লাস্টিক মনস্টার। পর্যটকদের কেউ প্রথম দেখায় ভয় পেলেও কাছে গেলে বোঝা যায়, এই ভাস্কর্য নয় বরং প্রকৃত দানব হলো মানুষের ব্যবহৃত ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক সামগ্রী । যা প্রতিনিয়ত আঘাত করছে প্রকৃতি, মানুষের
স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যকে। ‘বালিয়াড়ির উপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্লাস্টিক বর্জ্যে গড়া বিশাল ভাস্কর্যটি। মাঝখানে যেন দু’ভাগ হয়ে যাওয়া পৃথিবী, যার বুক চিরে বেরিয়ে আসছে নারা রঙের প্লাস্টিক বোতল ও দ্রব্যাদি। পর্যটকদের অনেকে সৈকতের বালিয়াড়ি ও সাগরের পানিতে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলেন। এতে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে দূষণ এবং হুমকির মুখে পড়ছে সামুদ্রিক জীব ও মানবজীবন।’ দূষণ রোধে ও সচেতনতা তৈরিতে ভিন্নধর্মী এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ‘কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সুগন্ধা সীগাল পয়েন্টে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে নির্মিত এই ভাস্কর্যটির উদ্বোধন করা হয়েছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্লাস্টিকবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সারাদেশ থেকে তারা ইতোমধ্যে ৫০০ টন পরিত্যক্ত প্লাস্টিক রিসাইকেল করেছেন। কক্সবাজার, ইনানী ও টেকনাফ সৈকতে চলমান অভিযানে গত চার মাসে সংগৃহীত হয়েছে আরও ৮০ টন সামুদ্রিক প্লাস্টিক বর্জ্য। তার একটি অংশ দিয়েই তৈরি হয়েছে এই দানব ভাস্কর্য। বিদ্যানন্দের উদ্যোগে গত ৩ আগস্ট ২০২৫ ‘প্লাস্টিক এক্সচেঞ্জ স্টোর’ ও ‘প্লাস্টিক এক্সচেঞ্জ মার্কেট’ থেকে এতদিনে বহু প্লাস্টিক সংগ্রহ হয়েছে। প্লাস্টিকের বিনিময়ে চাল–ডাল–তেলসহ নিত্যপণ্য এবং পর্যটকদের জন্য উপহারও দেওয়া হয়। এতে মানুষ ইতিবাচকভাবে বর্জ্য জমা দিতে উৎসাহিত হয়েছে।’
এছাড়া এই ভাস্কর্য নির্মাণে সৃষ্টিশীল সহযোগিতা দিয়েছে পপ-ফাইভ অ্যাডভার্টাইজিং লিমিটেড। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের একদল শিল্পী প্রায় ছয় টন প্লাস্টিক দিয়ে ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেছেন। ভাস্কর্য তৈরিতে প্লাস্টিক ছাড়াও ব্যবহার করা হয়েছে কাঠ, পেরেক ও অ্যাডহেসিভসহ অন্যান্য উপকরণ।
অনেকে মনে করেন, কঠোর পরিবেশগত বিধিনিষেধ পর্যটন কমিয়ে দেবে। কিন্তু এটি একটি ভুল দ্বন্দ্ব। প্রকৃতি নষ্ট হলে পর্যটনও টিকবে না। মানুষ কক্সবাজারে আসে সমুদ্রের গর্জন শুনতে, নীল জলরাশি দেখতে প্লাস্টিকের স্তূপ দেখতে নয়। সৈকত যদি নোংরা হয়, দূষিত হয়, তাহলে পর্যটক মুখ ফিরিয়ে নেবে। সুতরাং পরিবেশ রক্ষা মানেই টেকসই পর্যটন নিশ্চিত করা।
সব দোষ পর্যটকের ঘাড়ে চাপালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। হোটেল, রেস্তোরাঁ, বিচ দোকান, ভাসমান ব্যবসা সবখানেই প্লাস্টিকের অবাধ ব্যবহার চলছে। অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও তা করা হচ্ছে না, কারণ প্লাস্টিক সস্তা ও সহজলভ্য। এখানেই নীতিগত হস্তক্ষেপ জরুরি। প্লাস্টিক ব্যাগ ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
বাংলাদেশে আইনগতভাবেপলিথিন নিষিদ্ধ। কিন্তু কক্সবাজারে সেই আইনের প্রয়োগ কতটা কার্যকর? বাস্তবতা বলছে, প্রয়োগ দুর্বল। নিয়মিত নজরদারি, জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল এসব কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া ব্যবসায়ীরা অভ্যাস বদলাবে না। একই সঙ্গে বিকল্প উপকরণ সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে হবে, নইলে নিষেধাজ্ঞা কাগজেই থেকে যাবে।
কক্সবাজার পর্যটকদের জায়গা ছাড়াও স্থানীয় মানুষের বসবাসের স্থান। জেলে, হোটেলকর্মী, দোকানি সবাই এই পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। তাদের সম্পৃক্ত না করে কোনো উদ্যোগ টেকসই হবে না। স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি ভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিক সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার
কার্যক্রম গড়ে তুলতে হবে। এতে একদিকে পরিবেশ রক্ষা হবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানও তৈরি হতে পারে।
শিশুদের শিক্ষা থেকেই পরিবেশ সচেতনতা শুরু করা দরকার। স্কুল পর্যায়ে সমুদ্র ও পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পর্যটকদের জন্যও দৃশ্যমান ও বাস্তবমুখী সচেতনতা কার্যক্রম প্রয়োজন শুধু পোস্টার নয়, বরং প্রণোদনা ও নিরুৎসাহনের সমন্বয়। যেমন, প্লাস্টিক ফেরত দিলে ছাড়, কিংবা সৈকতে প্লাস্টিক ফেলার জন্য জরিমানা।
বিশ্বের অনেক পর্যটনসমৃদ্ধ সমুদ্রসৈকত ইতিমধ্যে প্লাস্টিকমুক্ত নীতিতে গেছে। কোথাও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, কোথাও কঠোর নিয়ন্ত্রণ। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে ইচ্ছাশক্তি থাকলে পরিবর্তন সম্ভব। কক্সবাজারও পারে, যদি আমরা এটিকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখি।
সমুদ্রের গর্জন বনাম প্লাস্টিকের খসখস একসংগে থাকাটা বড়ই বেমানান। তার সাথে আরো একটি দৃষ্টিকটু ঘ্রাণকটু ইস্যু যোগ হয়ে গেল আমাদের এই ভ্রমণের সংগে। আর তা হচ্ছে, বেওয়ারিশ কুকুরের অবাধ বিচরণ। এরা দল বেধে দৌড়াচ্ছে, ঘেরাঘুরি করছে। কোথাও জটলা করে চিৎকার করে মারামারি করছে। যত্রতত্র এদের মলমূত্র ত্যগ এবং সেগুলোর দুর্গন্ধযুক্ত চিহ্ন ভ্রমণকারীদের চোখে পড়ছে। আমরা কক্সবাজার সৈকতের চারটি পয়েন্টে বেওয়ারিশ কুকুরের অবাধ বিচরণ লক্ষ্য করেছি।
এছাড়া কুকুর ও ঘোড়ার বিষ্ঠার মাধ্যমে পায়ে কৃমি সংক্রমণের কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানা গেলেও আগে কখনও সেটাকে ততটা গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু এবার বীচে এসে সরেজমিনে সেটা দেখে মনে হলো কর্তৃপক্ষেল এবিষয়ে জরুরী ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
সমুদ্রের গর্জন আমাদের শোনাতে পারে প্রকৃতির শক্তি ও সৌন্দর্যের কথা। কিন্তু তার পাশে যদি শোনা যায় প্লাস্টিকের খসখস, চোখে পড়ে বেওয়ারিস প্রাণির বিষ্ঠা ও বর্জ্যের স্তূপ, তাহলে সেই গর্জন অর্থহীন হয়ে পড়ে। কক্সবাজারের সৈকতে আমরা দানব চাই না; আমরা চাই ঢেউয়ের ছন্দ, বাতাসের গান, আর পরিচ্ছন্ন বালুকাবেলা।
কক্সবাজার রক্ষা আমাদের সবার জন্য পরিবেশগত দায়বদ্ধতার একটি পরীক্ষা। প্লাস্টিক দানবকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেমন আমাদের ক্ষমা করবে না তেমনি ময়লা, নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত ইস্যুগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠাকেও কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না।
বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার বাংলাদেশের গর্ব, আমাদের জাতীয় পরিচয়ের অংশ। কিন্তু আজ এই সৌন্দর্যের সঙ্গে এমন কিছু দৃশ্য জুড়ে গেছে, যা শুধু বেমানানই নয়, লজ্জাজনকও। প্লাস্টিকের স্তূপ, পথে পথে কুকুরের বিষ্ঠা, পর্যটন বিনোদনের নামে ব্যবহৃত ঘোড়ার মল, এসবের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের গর্জন যেন তার মর্যাদা হারাচ্ছে।
সময় এসেছে সৈকত শহর কক্সবাজারকে সত্যিকার অর্থে রক্ষা করার। এখনই সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা চাই এমন একটি সৈকত, যেখানে ঢেউয়ের শব্দের সঙ্গে মিশবে না দুর্গন্ধ বা অবহেলার চিহ্ন। কক্সবাজারের সৈকতে সমুদ্রের গর্জন থাকুক, অনন্তকাল এবং ঘুরতে আসব বার বার, শুধু মনমাতানো ঢেউ ও নির্মল বাতাসের আনন্দে।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের
সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]