শনিবার | ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ২৪ মাঘ, ১৪৩২

ছুটিতে বাড়ি ফেরা হলো না রাবির মেধাবী শিক্ষার্থী মাহদীর

নিজস্ব প্রতিবেদক :
ছুটি কাটাতে বাড়ি ফেরার পথে যে তরুণটির চোখে ছিল পরিবারকে আবার কাছে পাওয়ার উচ্ছ্বাস, সেই যাত্রাই হয়ে উঠল তার জীবনের শেষ অধ্যায়। মুহূর্তের এক দুর্ঘটনায় থেমে গেল সম্ভাবনাময় এক তরুণের স্বপ্নযাত্রা। ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহদী হাসান মুরাদ (২২)।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল পৌনে ৮টার দিকে নাটোরের লালপুর উপজেলার আব্দুলপুর রেলওয়ে জংশন স্টেশনে রাজশাহী থেকে চিলাহাটিগামী তিতুমীর এক্সপ্রেস ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
নিহত মাহদী হাসান মুরাদ লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম শিবরাম গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মো. আব্দুল মালেক ও মোসাম্মৎ মোকলেজা বেগম দম্পতির বড় ছেলে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন তিনি।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ছুটি কাটাতে বাড়ি ফিরছিলেন মুরাদ। বাড়িতে তার অপেক্ষায় ছিল পুরো পরিবার। একসঙ্গে বসে খাওয়ার প্রস্তুতিও চলছিল। ছেলের বাড়ি ফেরা ঘিরে বাবা-মায়ের মনে ছিল নীরব আনন্দ। কিন্তু সেই আনন্দ আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। বাড়ি ফিরলেন তিনি—নিথর দেহ হয়ে।
ছেলের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন বাবা মো. আব্দুল মালেক। কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন,
“আমি গরিব মানুষ। এই ছেলেটাই ছিল আমার সব আশা। ওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম—একদিন আমাদের কষ্ট দূর করবে। কিন্তু আল্লাহ একদিনেই আমার সব স্বপ্ন শেষ করে দিলেন।”
নিহতের মা মোসাম্মৎ মোকলেজা বেগমের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো বাড়ির পরিবেশ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন,
“আমার ছেলে কোরআনে হাফেজ ছিল। ছোটবেলা থেকেই খুব ভালো ছাত্র ছিল। আমাকে বলত, একদিন আমাদের দারিদ্রতা দূর করবে। আমি ওকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছি। সব শেষ হয়ে গেল। আমার ছেলে আর কোনোদিন বাড়ি ফিরবে না।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ২০২৪–২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন মাহদী হাসান মুরাদ। সহপাঠীরা জানান, তিনি ছিলেন শান্ত, ভদ্র ও ধার্মিক স্বভাবের মানুষ। পড়াশোনার পাশাপাশি ধর্মীয় জ্ঞানেও তিনি ছিলেন অনন্য।
তার সহপাঠী মো. তালেবুর রহমান ও আবু নাঈম বলেন,
“মুরাদ আমাদের খুব কাছের বন্ধু ছিল। সে কোরআনে হাফেজ ছিল এবং সবসময় নম্র আচরণ করত। এমন একজন বন্ধুকে হারিয়ে আমরা ভীষণ শোকাহত।”
ঘটনার বিষয়ে আব্দুলপুর রেলওয়ে জংশনের স্টেশন মাস্টার এস এম আবু সালেহ জানান, রাজশাহী থেকে চিলাহাটিগামী তিতুমীর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ইঞ্জিন ঘোরানোর জন্য জংশনে থামে। এ সময় মাহদী হাসান মুরাদ ট্রেন থেকে নিচে নামার চেষ্টা করলে দুর্ঘটনাটি ঘটে।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও রেলওয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে জানান ঈশ্বরদী রেলওয়ে (জিআরপি) থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউর রহমান।
পরিবারের সদস্যরা জানান, শুক্রবার রাত ৮টায় নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে ধর্মীয় মর্যাদায় মাহদী হাসান মুরাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়।
একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়—শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার সহপাঠী, শিক্ষক, এলাকাবাসী ও পুরো শিক্ষাঙ্গনে। অপূর্ণ থেকে গেল তার স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ আর পরিবারকে সুখী করার অঙ্গীকার। নিঃশব্দে প্রশ্ন রেখে গেল এই মৃত্যু—এভাবে আর কত তরুণের জীবন থেমে যাবে রেলপথে?

সম্পাদনা : রাশিদুল ইসলাম রাশেদ /উপসম্পাদক /প্রাপ্তি প্রসঙ্গ/০২-০৬

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.