সোমবার | ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ২৬ মাঘ, ১৪৩২

সাত বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ, তবু অনিশ্চিত রিমনের স্বপ্নযাত্রা

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ :
চোখভরা স্বপ্ন নিয়ে যে ছেলেটি সাতটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে, বাস্তবতা তাকে দাঁড় করিয়েছে কঠিন এক যুদ্ধের সামনে। নাটোরের লালপুর উপজেলার মেধাবী শিক্ষার্থী মো. রিমন আলীর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া আজ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে শুধু আর্থিক সংকটের কারণে।
দক্ষিণ লালপুর গ্রামের ভূমিহীন কৃষক মো. মাসুদ রানা ও রিমা বেগম দম্পতির বড় ছেলে রিমন। বাবার বর্গাচাষ, মায়ের সেলাই মেশিন আর নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সম্বল করেই এতদূর এসেছে সে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দোরগোড়ায় এসে সেই সংগ্রাম যেন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) সকালে রিমনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (সাস্ট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সাতটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধা তালিকায় ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন রিমন।
রিমন বলেন, “চরম অভাবের মধ্যেও পড়াশোনা ছাড়িনি। মনে করেছি, পড়াশোনাই আমাকে এই অবস্থান থেকে বের করে আনবে।” সেই বিশ্বাস নিয়েই ভর্তি পরীক্ষার কঠিন যুদ্ধে অংশ নিয়ে একে একে সাফল্য এসেছে তার ঝুলিতে।
তবে সাফল্যের আনন্দ খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। রুয়েটে ১৭ ফেব্রুয়ারি, চুয়েটে ২৫ ফেব্রুয়ারি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮ মার্চ থেকে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হবে। কুয়েটে ৮ ফেব্রুয়ারি ও সাস্টে ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ভর্তি কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। অথচ অর্থাভাবে এখনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি হতে পারেননি তিনি।
শুধু ভর্তির টাকা নয়। ভর্তি-পরবর্তী থাকা, খাওয়া ও পড়াশোনার খরচ নিয়েও দুশ্চিন্তায় দুচোখে অন্ধকার দেখছেন তার বাবা-মা।
রিমনের বাবা মাসুদ রানা বলেন,
“আমি লেখাপড়া জানি না। কিন্তু ছেলেকে মানুষ করার স্বপ্ন ছিল। বর্গা চাষ করে, দিনরাত খেটে যা পারতাম করেছি। এখন আর কিছুই নেই।”
মা রিমা বেগমের চোখেও অনিশ্চয়তার ছায়া। তিনি বলেন,
“ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ায় খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু এখন শুধু ভাবি—ওর খরচ কীভাবে চালাবো? অসুস্থ শরীর নিয়ে সেলাই মেশিন চালিয়ে, না খেয়ে টাকা জমিয়েছি। এখন আর পারছি না।”
রিমন জানান, তিনি ২০২৩ সালে লালপুর শ্রী সুন্দরী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০২৫ সালে রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। দুই পরীক্ষাতেই বিজ্ঞান বিভাগে তিনি গোল্ডেন এ প্লাস অর্জন করেন। রাজশাহীতে পড়াশোনার সময় সহযোগিতার জন্য তিনি সিটি কলেজের শিক্ষক গোলাম জাকারিয়া, নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক আতাউর রহমান এবং ম্যাট্রিক ম্যাথ কেয়ারের কর্ণধার কাওসার আহমদ কনক স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
ভবিষ্যতে বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশসেবার স্বপ্ন দেখেন রিমন। সে লক্ষ্যে তিনি রুয়েটে ভর্তির আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু স্বপ্নের সেই পথে এখন সবচেয়ে বড় বাধা আর্থিক অসচ্ছলতা।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জুলহাস হোসেন সৌরভ অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী রিমনের পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবান ও দানশীল ব্যক্তিদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
রিমনের স্বপ্ন আজ একা নয়—এই স্বপ্ন যেন সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের সহানুভূতিতে বেঁচে থাকে, সেটাই এখন তার পরিবারের একমাত্র আশা।

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.