মঙ্গলবার | ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ২৭ মাঘ, ১৪৩২

নাটোর-১ এ ভোটের জটিল সমীকরণ, হবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

প্রাপ্তি প্রসঙ্গ ডেস্ক :
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাটোর জেলার চারটি আসনের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত আসন হিসেবে উঠে এসেছে নাটোর-১ (লালপুর–বাগাতিপাড়া)। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই এই আসনে উত্তেজনার পারদ ছিল চরমে। রাজনীতির অনিশ্চিত খেলায় ক্ষণে ক্ষণে বদলেছে এখানকার ভোটের হিসাব-নিকাশ।
৪৬৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দুটি উপজেলা লালপুর ও বাগাতিপাড়ার ১৫টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬৮ হাজার ২৭৬ জন। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৯৫ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৭৯ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ২ জন। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ৯ জন প্রার্থী।
নাটোর-১ আসনটি বরাবরই বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী না থাকায় বিএনপির জন্য একচেটিয়া বিজয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট তাইফুল ইসলাম টিপু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামায়  পাল্টে গেছে চিত্র। ফলে এই আসনে বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন জনপ্রিয় টকশো ব্যক্তিত্ব ও মরহুম যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ফজলুর রহমান পটলের কন্যা ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল। তিনি বিএনপির মিডিয়া সেলের অন্যতম সদস্য। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন নাটোর জেলা জামায়াতের শুরা ও কর্ম পরিষদ সদস্য এবং লালপুর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী অ্যাডভোকেট তাইফুল ইসলাম টিপু।
মাঠের বর্তমান বাস্তবতায় তিন প্রার্থীরই জয়ের সম্ভাবনা প্রায় সমান বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। পরিকল্পিত ছকে দীর্ঘদিন ধরে মাঠে কাজ করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। অন্যদিকে বিএনপির পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ভোটারদের সমর্থন পেতে শুরু থেকেই ‘সফট কর্নার’ তৈরি করার চেষ্টা করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী তাইফুল ইসলাম টিপু। তিনি সাধারণ আওয়ামী কর্মী-সমর্থকদের জেল-জুলুম ও হয়রানির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নিয়মিত বক্তব্য দিয়ে আসছেন। তার দাবি, কলস প্রতীকের বিজয়ের মাধ্যমে লালপুর ও বাগাতিপাড়ায় বিএনপির পুনর্জাগরণ ঘটবে। নির্বাচনে জয়ী হলে পুনরায় বিএনপিতে যোগ দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। নির্বাচনে বিজয়ী হলে লালপুর ও বাগাতিপাড়াকে শান্তির নগর হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। গত ২৭ নভেম্বর, ২০২৫ তারেক রহমানের ৩১ দফা সহ মোট ২৩ দফা ইশতেহার  ঘোষণা করেছেন তিনি। নির্বাচনী সমাবেশে তিনি লালপুর বাগাতিপাড়াকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন।
স্থানীয় রাজনীতিক ও বিশ্লেষকদের মতে, এবারে নাটোর-১ আসনে এক লাখের কম ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভোটের ফল নির্ধারণে ‘এক্স-ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠতে পারেন আওয়ামী লীগের ভোটাররা। ভোটকেন্দ্রে তাদের উপস্থিতি ও প্রার্থী পছন্দের ওপর নির্ভর করছে চূড়ান্ত ফলাফল। সে কারণে সব প্রার্থীই এই ভোটব্যাংক টানতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধানের শীষ প্রতীকের কারণে পুতুল দলীয় ভোটে এগিয়ে থাকবেন। উপজেলা বিএনপির সর্বশেষ কমিটির অধিকাংশ নেতা তার পক্ষে থাকলেও, অতীতে বহিষ্কৃত ও বঞ্চিত নেতাদের  অধিকাংশ ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী টিপুর পক্ষে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে পুতুলের মনোনয়নের বিরোধিতা করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন তার বড় ভাই ডা. মোহাম্মদ ইয়াসির আরশাদ রাজন। সম্প্রতি তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে ছোট বোন পুতুলকে সমর্থনের ঘোষণা দেন। তবে সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় তার অনুসারী অনেক নেতাকর্মী ইতোমধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে যোগ দিয়েছেন। ফলে ধানের শীষের প্রার্থীর একচেটিয়া বিজয় প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তবে নির্বাচনে জয়ী হতে প্রার্থীদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন ফারজানা শারমিন পুতুল। নির্বাচনী জনসভায় দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। ইতোমধ্যে তিনি লালপুর বাগাতিপাড়ায় দুটি বিশেষায়িত শিল্প কারখানা গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন। মরহুম ফজলুর  রহমান পটলের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করা দেশের মানুষের স্বপ্ন পূরণে ধানের শীষে ভোট দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন তিনি।
অন্যদিকে দেড় বছর ধরে সুপরিকল্পিতভাবে নির্বাচনী মাঠে কাজ করে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দলীয় শৃঙ্খলা ও বিএনপির অভ্যন্তরীণ অনৈক্য তাদের বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এই আসনে জামায়াতের একনিষ্ঠ কর্মী-সমর্থক প্রায় ৩০ হাজার। পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে বিএনপির প্রায় ২০০ ভোট এবং আওয়ামী লীগের এক থেকে দুই শতাংশ ভোট তারা পাবেন বলে মনে করছেন। এতে তাদের নিশ্চিত ভোটের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে প্রায় ৮০ হাজার। বর্তমানে আরও ১৫ থেকে ২০ হাজার ভোট নিশ্চিত করতে প্রতিটি ওয়ার্ডের নির্দিষ্ট পরিবারগুলোকে কাছে টানার কাজ করছেন তারা।
সব মিলিয়ে কে জয়ী হবেন, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ভোটের ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত। তবে এটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়—নাটোর-১ আসনে এবার হাড্ডাহাড্ডি ত্রিমুখী লড়াই হতে যাচ্ছে।

সম্পাদনা : রাশিদুল ইসলাম রাশেদ /উপসম্পাদক /প্রাপ্তি প্রসঙ্গ/০৯-০২

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.