
-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
বাংলাদেশ বহুদিন যাবত এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে প্রতিবছর হাজার হাজার তরুণ উচ্চশিক্ষার সনদ অর্জন করছে, অন্যদিকে একই সময়ে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। রাষ্ট্র বলছে দক্ষ জনবলের অভাব, শিল্পখাত বলছে যোগ্য কর্মী পাওয়া যায় না, আর তরুণরা বলছে, চাকরি নেই। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থার মূলে রয়েছে একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্র যেন দুটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, যাদের মাঝে কোনো কার্যকর সেতু নেই।
দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সনদ উৎপাদন। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, সব স্তরেই শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় কীভাবে পরীক্ষায় ভালো করতে হয়, কীভাবে নির্ধারিত সিলেবাস মুখস্থ রাখতে হয়। কিন্তু এই শিক্ষায় বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, যোগাযোগ কৌশল বা দলগত কাজের প্রশিক্ষণ খুব কমই থাকে।
ফলাফল হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা একজন তরুণ যখন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে, তখন সে আবিষ্কার করে তার শেখা জ্ঞান বাস্তব কাজের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। নিয়োগকর্তারা চান কাজ জানা মানুষ, আর শিক্ষিত তরুণরা আসে বইয়ের জ্ঞান নিয়ে। এই ফাঁকটাই শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের বিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
একটি কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম শর্ত হলো, তা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। কিন্তু আমাদের দেশে পাঠ্যক্রম প্রণয়নের সময় শিল্পখাত, প্রযুক্তি খাত কিংবা সেবা খাতের বাস্তব প্রয়োজন খুব একটা বিবেচনায় নেওয়া হয় না। ফলে যেসব বিষয়ে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছে, সেসব ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত।
অন্যদিকে আইটি, অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, আধুনিক কৃষি বা স্বাস্থ্যসেবার মতো খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা থাকলেও সে অনুযায়ী প্রশিক্ষিত তরুণের সংখ্যা কম। এই অসামঞ্জস্যই প্রমাণ করে শিক্ষা ও কর্মপরিকল্পনা আলাদা পথে চলছে।
বাংলাদেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে এখনো দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা হিসেবে দেখা হয়। সামাজিকভাবে এমন ধারণা প্রচলিত যে, যারা “ভালো ছাত্র” তারা সাধারণ ধারায় পড়বে, আর যারা পিছিয়ে পড়ে তারা কারিগরি শিক্ষায় যাবে। এই মানসিকতা শুধু ভ্রান্তই নয়, ক্ষতিকরও। বাস্তবতা হলো, দেশের শিল্পকারখানা, নির্মাণ খাত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত কিংবা বিদেশি শ্রমবাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা দক্ষ কারিগরি কর্মীর। কিন্তু এই খাতের অবমূল্যায়নের কারণে তরুণদের একটি বড় অংশ সম্ভাবনাময় কর্মক্ষেত্র থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে শিক্ষা দ্বীপে যা শেখানো হচ্ছে, কর্মক্ষেত্রের দ্বীপে তার চাহিদা তৈরি হচ্ছে না।
আমাদের দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাত: সংলাপহীন দুই জগত হিসেবে বিরাজ করে। শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের সংযোগ দুর্বল হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিল্পখাতের কার্যকর যোগাযোগের অভাব। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টার্নশিপ নামমাত্র, অনেক ক্ষেত্রে তা কাগুজে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ। শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মপরিবেশে কাজ করার সুযোগ পায় না, ভুল করার সুযোগ পায় না, শেখার সুযোগ পায় না।
অন্যদিকে শিল্পখাতও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে তেমন হাত বাড়ায় না। যৌথ গবেষণা, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বা অ্যাপ্রেন্টিসশিপের উদ্যোগ সীমিত। ফলে এই দুই জগত নিজেদের মতো করে চলতে থাকে। যার একটি সিলেবাসের মধ্যে বন্দী, অন্যটি উৎপাদন ও মুনাফার চাপে ব্যস্ত। এই বিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী তরুণ সমাজ। দীর্ঘদিন বেকার থাকা তরুণদের মধ্যে হতাশা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও ক্ষোভ জন্ম নেয়। কেউ কেউ মনে করে পড়াশোনা করে কোনো লাভ নেই। কেউ আবার ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশে পাড়ি জমায়। কেউ কেউ সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। রাষ্ট্র যে বিপুল অর্থ শিক্ষা খাতে ব্যয় করছে, তা কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। মানবসম্পদ পরিণত হচ্ছে অপচয়ে।
বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতির অন্যতম প্রাণদায়ী শক্তি হলো তার তরুণ প্রজন্ম। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী যুবক-যুবতীরা দেশীয় জনসংখ্যার বিশাল অংশকে গঠন করছে, এবং তাদের শক্তি যদি সঠিকভাবে অনুধাবন ও কাজে লাগানো যায়, তবে তা দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে। কিন্তু সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, যুবসমাজের হতাশা ও বেকারত্বের হার ক্রমেই বেড়ে চলেছে, যা সামাজিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বেকারত্বের বাস্তবতা: সংখ্যা ও প্রবণতার কিছু তথ্য দেখা যাক কি বলে। বাংলাদেশে তরুণ বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বলে বিভিন্ন সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থা জানিয়েছেন।
ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) জানিয়েছে দেশের যুব বেকারত্বের হার প্রায় ১০.৬%, যা মোট বেকারত্বের তুলনায় অনেক উঁচু।
বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের (বিবিএস)-এর লেবার ফোর্স সার্ভে ২০২৩ অনুযায়ী দেশের ২৬.৭৬ মিলিয়ন তরুণ শ্রমবাজারে (১৫-২৯ বছর) প্রায় ৭.২%, বা ১.৯৪ মিলিয়ন যুবক-যুবতী বেকার অবস্থানে রয়েছে। সেইসাথে মোট বেকার মানুষের প্রায় ৭৮.৯% তরুণই, যা স্পষ্ট করে দেয় বেকারত্ব মূলত যুবশক্তির মধ্যে ঘণীভূত। উল্লেখ্য, বেকারত্ব শুধু সংখ্যা নয়। এটি শিক্ষাগত স্তরেও ছড়িয়ে পড়েছে: পর্যাপ্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কর্মসংস্থান না পাওয়া তরুণদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিতদের অংশও দ্রুত বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ পাশ করা অনেক যুবকই কর্মসংস্থান পাচ্ছে না, এবং যারা চাকরি পাচ্ছে তাদের অনেকেরই মজুরি ও চাকরির মান তুচ্ছ।
বেকারত্বের পাশাপাশি বাংলাদেশের যুব সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হচ্ছে নিট (NEET -Not in Education, Employment or Training) হারের বৃদ্ধি। BBS তথ্য মতে প্রায় ১৮.৯% যুব (১৫-২৯ বছর) শিক্ষা, চাকরি, বা প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছে না। এই নিট তরুণদের মধ্যে নারীদের হার উল্লেখযোগ্য। যেখানে ২২.১% মেয়েরা নিট অবস্থায় রয়েছে, আর পুরুষদের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি। এটি তরুণদের সম্ভাবনা ও সৃজনশীলতার সম্পূর্ণ অপব্যবহার, কারণ তারা কর্মক্ষম কিন্তু কোনও উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত নয়।
বেকারত্ব শুধু আর্থিক সমস্যা তৈরি করে না; এটি তরুণদের মানসিক অবস্থাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। গবেষণা ও সংবাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে তরুণদের মধ্যে মানসিক চাপ, হতাশা, উদ্বেগ ও ডিপ্রেশনের হার ক্রমেই বাড়ছে। যদিও বাংলাদেশে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপক জাতীয় পর্যায়ের পরিসংখ্যান এখনও সীমিত, বিভিন্ন গবেষণা, সার্ভে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যায়ের তথ্যগুলো দেখায় কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে
তরুণদের মানসিক অবসাদ ও ডিপ্রেশনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে দেখা গেছে তরুণরা উচ্চ চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে।
এই হতাশার প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনেই নয়, সমগ্র সমাজে বিশাল আকারে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সমাজে হতাশা ও প্রত্যাশার ফাঁক গলিয়ে যুবক-যুবতীরা কখনও কখনও সামাজিক বিচ্যুতি বা অবাঞ্ছিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। যুবসমাজ জীবনে সফলতা ও উন্নতির জন্য শিক্ষায় বিনিয়োগ করে, কিন্তু কর্মসংস্থানে সুযোগ না পেলে তাদের প্রত্যাশা ও বাস্তবের মধ্যে একটি বড় ফাঁক তৈরি হয়। এই ফাঁক বিশেষত তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলছে—যে হতাশার কারণে ক্ষুদ্র- মহল্লার হিংসা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ছে।
এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন ডেটা-চালিত সমাধান ও সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা। এই নীতির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং ইন্টার্নশিপ-ভিত্তিক কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশেষ করে বহুমাত্রিক টেকনিক্যাল ও ডিজিটাল দক্ষতায় সরকার ও বেসরকারি খাতকে যৌথ উদ্যোগ নিতে হবে। তরুণদের চাকরি না পেলে তারা নিজেদের কাজ বা উদ্যোগ তৈরি করতে উৎসাহিত হতে পারে। সরকার ও ব্যাংকিং খাত তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বাজার প্রবেশাধিকারের সুযোগ দিতে পারে।
বিশ্বের অনেক দেশে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের মাঝে দৃঢ় সেতুবন্ধন তৈরি করা হয়েছে। জার্মানির ডুয়াল এডুকেশন সিস্টেম, দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ, সিঙ্গাপুরের স্কিলসফিউচার কর্মসূচি সবই দেখায়, কীভাবে শিক্ষা ও কর্মকে একসূত্রে গাঁথা যায়। সেখানে শিক্ষার্থী কেবল ছাত্র নয়, একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ কর্মী হিসেবেও গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশও চাইলে এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নীতিগত সমন্বয় এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন।
শিক্ষা যদি একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে থাকে আর কর্মক্ষেত্র আরেকটি, তবে তরুণরা মাঝখানের সমুদ্রে দিশেহারা নাবিক হয়ে পড়বেই। এই অবস্থা থেকে বের হতে হলে শিক্ষা ও কর্মকে একসূত্রে বাঁধতেই হবে। নচেৎ তরুণদের স্বপ্ন ভাঙবে, আর তার খেসারত দেবে পুরো জাতি।
নবগঠিত বিএনপি সরকারের সামনে সময় ঘনিয়ে এসেছে এই দুই দ্বীপের মাঝে একটি শক্ত, কার্যকর ও টেকসই সেতু নির্মাণের। না হলে সম্ভাবনার বাংলাদেশ রূপ নেবে অপচয়ের বাংলাদেশে। শিক্ষা যদি একটি শক্ত স্রোত, এবং কর্মক্ষেত্র যদি একটি সমৃদ্ধ সমুদ্র হয় তবেই জেন-জি তরুণরা তাদের স্বপ্নগুলো হাসিমুখে অনুসরণ করতে পারবে এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন তাদের হাত ধরে এগিয়ে যাবে।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও
সাবেক চেয়ারম্যান। E-mail: [email protected]