রবিবার | ১৫ মার্চ, ২০২৬ | ১ চৈত্র, ১৪৩২

শিরোনাম
পরিকল্পিতভাবে যাকাত বন্টন ও দারিদ্র বিমোচন শিক্ষা যেন একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ আর কর্মক্ষেত্র আরেকটি যান্ত্রিকতায় মায়ের ভাষার মাধুর্য্য দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে লালপুরে জামায়াতের ইফতার মাহফিল ‘ঢাকাস্থ নাটোর জেলা সমিতি’র নতুন কমিটি গঠন বড়াইগ্রাম উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত ‘প্রতিটি উন্নয়ন আমি মাথায় করে আপনাদের জন্য নিয়ে আসবো’-প্রতিমন্ত্রী পুতুল বড়াইগ্রামে মহাসড়কের পাশে অজ্ঞাত ব্যক্তির রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার বাঘায় সিএনজি ও ভটভটি গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেল ৩ রূপপুর এনপিপি দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী

পরিকল্পিতভাবে যাকাত বন্টন ও দারিদ্র বিমোচন

–প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো যাকাত। এটি একদিকে একটি ধর্মীয় ইবাদত অন্যদিকে এর মাধ্যমে একটি কার্যকর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে সমাজে সম্পদের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং দারিদ্র দূর করা সম্ভব। ইসলাম এমন একটি সমাজব্যবস্থার কথা বলে, যেখানে ধনী-গরিবের ব্যবধান কমে আসে এবং প্রত্যেক মানুষ ন্যূনতম জীবনমান নিশ্চিত করতে পারে। তাই পরিকল্পিতভাবে যাকাত বণ্টন করলে তা দারিদ্র বিমোচনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
পবিত্র কোরআনে বহুবার যাকাতের গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে। নামাজের পাশাপাশি যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা’আলা বলেন: “তোমরা সালাত কায়েম করো এবং যাকাত প্রদান করো।” (সূরা আল-বাকারা ২:৪৩)। এই নির্দেশনা প্রমাণ করে যে, যাকাত ইসলামের মৌলিক ইবাদতগুলোর একটি এবং এটি সমাজে ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
যাকাতের মূল লক্ষ্য হলো সামাজিক ন্যায়বিচার ও দারিদ্র বিমোচনে ভূমিকা রাখা। ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদ কেবল ব্যক্তিগত ভোগের জন্য নয়। একজনের সম্পদে অপরের অধিকার রয়েছে বলে নির্দেশনা আছে। ধনী বা বিত্তশালীদের সম্পদের মধ্যে সমাজের অন্যান্য মানুষের অধিকারও এর সঙ্গে যুক্ত। কোরআনে বলা হয়েছে: “আর তাদের সম্পদে ছিল প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতদের নির্দিষ্ট অধিকার।”
(সূরা আয-যারিয়াত ৫১:১৯)। এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সমাজের দরিদ্র মানুষের প্রতি ধনীদের একটি নির্ধারিত দায়িত্ব রয়েছে। যাকাত সেই দায়িত্ব পালনের একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতি। পবিত্র হাদিসেও যাকাতের সামাজিক তাৎপর্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেন, “তাদের ধনীদের কাছ থেকে সম্পদ নেওয়া হবে এবং তা তাদের দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করা হবে।” (সহিহ বুখারি)। এই হাদিস ইসলামী অর্থনৈতিক দর্শনের মূলনীতিকে প্রকাশ করে। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে সম্পদের প্রবাহ নিশ্চিত করার কথা বলে।
যাকাত বণ্টনের কতগুলো নির্দিষ্ট খাত রয়েছে। পবিত্র কোরআনে যাকাত বণ্টনের আটটি খাত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন: “যাকাত তো কেবল ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়কারী কর্মচারী, যাদের অন্তর অনুরক্ত করা দরকার, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে
এবং মুসাফিরদের জন্য।” (সূরা আত-তাওবা ৯:৬০)। এই আয়াতের মাধ্যমে বোঝা যায় যে যাকাত কেবল দরিদ্রদের জন্য দান নয়; বরং এটি একটি বিস্তৃত সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে দরিদ্র, ঋণগ্রস্ত, পথিক, এমনকি সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করার একটি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
আমাদের সমাজে পরিকল্পিত যাকাত বণ্টনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক সময় যাকাত বণ্টন হয় আবেগপ্রবণভাবে বা তাৎক্ষণিকভাবে। ঈদের আগে কিছু টাকা বা কাপড় বিতরণ করাকে অনেকেই যাকাত বণ্টনের প্রধান পদ্ধতি মনে করেন। কিন্তু এতে দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র দূর হয় না। বরং দরিদ্র মানুষ সাময়িক সহায়তা পেলেও তাদের জীবনযাত্রার মৌলিক পরিবর্তন ঘটে না।
পরিকল্পিতভাবে যাকাত বণ্টনের অর্থ হলো, এমনভাবে অর্থ ব্যবহার করা যাতে দরিদ্র মানুষ স্থায়ীভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একজন দরিদ্রকে এককালীন কিছু অর্থ দেওয়ার পরিবর্তে তাকে একটি ছোট ব্যবসা শুরু করতে সহায়তা করা, কৃষি সরঞ্জাম কিনে দেওয়া, বা দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা:) এক দরিদ্র ব্যক্তিকে ভিক্ষা না করে কাজ করার উপায় দেখিয়ে দিয়েছিলেন। একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, তিনি একজন দরিদ্র ব্যক্তিকে তার ঘরের একটি পাত্র বিক্রি করিয়ে সেই অর্থ দিয়ে কুঠার কিনে দেন এবং তাকে কাঠ কেটে জীবিকা অর্জনের নির্দেশ দেন (সুনান আবু দাউদ)। এই ঘটনাটি পরিকল্পিত সহায়তার একটি চমৎকার উদাহরণ।
যাকাতের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও মানবিকতা ও সামাজিক সংহতি আনয়ন করা যায়। যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়। যখন ধনীরা নিয়মিত যাকাত প্রদান করেন, তখন সমাজের দরিদ্র মানুষও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। ফলে
অর্থনীতি গতিশীল হয় এবং দারিদ্রের দুষ্টচক্র ভাঙতে শুরু করে।
ইসলামের ইতিহাসে আমরা এর বাস্তব উদাহরণ দেখতে পাই। খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)- এর শাসনামলে যাকাত ব্যবস্থাকে এত সুন্দরভাবে পরিচালনা করা হয়েছিল যে অনেক অঞ্চলে যাকাত গ্রহণ করার মতো দরিদ্র মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে সুশৃঙ্খল ও পরিকল্পিত যাকাত ব্যবস্থাপনা একটি সমাজকে দারিদ্রমুক্ত করার ক্ষমতা রাখে। যাকাত শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকলে এর সম্ভাবনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয় না। রাষ্ট্র এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একটি কার্যকর যাকাত ব্যবস্থার জন্য দরকার সঠিক তথ্যভিত্তিক দরিদ্র তালিকা, স্বচ্ছ বণ্টন পদ্ধতি এবং জবাবদিহিতা।
মসজিদ, সামাজিক সংগঠন এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সমন্বিতভাবে যাকাত তহবিল পরিচালনা করে, তাহলে তা দারিদ্র বিমোচনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। যাকাত মানুষের হৃদয়ে সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে। যখন একজন ধনী ব্যক্তি তার সম্পদের একটি অংশ দরিদ্র মানুষের জন্য ব্যয় করেন, তখন সমাজে পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি পায়।
রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির উদাহরণ একটি দেহের মতো; দেহের কোনো অঙ্গ অসুস্থ হলে পুরো দেহই কষ্ট অনুভব করে।” (সহিহ মুসলিম)। এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সমাজের একজন মানুষও যদি দারিদ্র ও কষ্টে থাকে, তবে পুরো সমাজের দায়িত্ব তাকে সহায়তা করা।
পরিকল্পিত যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে আমাদের দেশে কয়েকটি বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন, ১. দরিদ্র পরিবারের জন্য ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করার মূলধন প্রদান; ২. শিক্ষাবৃত্তি ও কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা; ৩. কৃষক ও শ্রমজীবীদের উৎপাদনমুখী সহায়তা; ৪. ঋণগ্রস্ত মানুষের ঋণ পরিশোধে সহায়তা এবং ৫. স্বাস্থ্যসেবা ও মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা। এই উদ্যোগগুলো দরিদ্র মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশে হতদরিদ্র মানুষকে বাঁচানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে যাকাত বণ্টন জরুরি হয়ে পড়েছে। গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক অগ্রগতি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দারিদ্র হ্রাসে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হলেও এখনও দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী হতদরিদ্র অবস্থায় জীবনযাপন করছে। বাংলাদেশ একটি মুসলিমপ্রধান দেশ। প্রতি বছর দেশের ধনী ও মধ্যবিত্ত মুসলমানদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ যাকাত আদায় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, সঠিকভাবে যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টন করা গেলে এর পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এই বিপুল সম্পদের বড় অংশই পরিকল্পনার অভাবে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে যাকাত আবেগপ্রবণভাবে বা তাৎক্ষণিকভাবে বিতরণ করা হয়, যা দরিদ্র মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান করতে পারে না।
পরিকল্পিত যাকাত বণ্টনের অর্থ হলো, যাকাতের অর্থ এমনভাবে ব্যবহার করা যাতে দরিদ্র মানুষ স্থায়ীভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পায়। উদাহরণস্বরূপ, একজন দরিদ্র মানুষকে এককালীন কিছু অর্থ দেওয়ার পরিবর্তে তাকে একটি ছোট ব্যবসা শুরু করার মূলধন দেওয়া যেতে পারে। কেউ যদি কৃষক হন, তাকে কৃষি উপকরণ বা গবাদিপশু দেওয়া যেতে পারে। আবার কোনো দরিদ্র শিক্ষার্থীকে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করলে ভবিষ্যতে সে নিজেই সমাজে অবদান রাখতে সক্ষম হবে। এ ধরনের উদ্যোগ দারিদ্র দূর করার টেকসই পথ তৈরি করে।
বাংলাদেশে অনেক সময় দেখা যায়, রমজান বা ঈদের আগে যাকাত বিতরণের সময় হঠাৎ করে ভিড় তৈরি হয়, বিশৃঙ্খলা হয়, এমনকি দুর্ঘটনাও ঘটে। এর মূল কারণ হলো পরিকল্পনার অভাব। যদি স্থানীয়ভাবে দরিদ্র পরিবারের একটি নির্ভরযোগ্য তালিকা তৈরি করা যায় এবং সারা বছর ধরে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া হয়, তাহলে এই বিশৃঙ্খলা কমবে এবং যাকাতের প্রকৃত উপকারভোগীরা সহায়তা পাবে।
এখানে রাষ্ট্র, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় সংগঠনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সরকার চাইলে একটি সমন্বিত যাকাত ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করতে পারে, যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত থাকবে। পাশাপাশি মসজিদভিত্তিক কমিটি, দাতব্য সংস্থা এবং স্থানীয় সমাজের
উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি সমন্বিতভাবে কাজ করে, তাহলে যাকাত তহবিলকে একটি শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রূপান্তর করা সম্ভব।
পরিকল্পিত যাকাত বণ্টনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো। যখন ধনী মানুষের সম্পদের একটি অংশ নিয়মিতভাবে দরিদ্র মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তখন সমাজে ভারসাম্য তৈরি হয় এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। এতে ধনী-গরিবের মধ্যে সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়।
বাংলাদেশে হতদরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নত করতে যাকাত একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা বহন করছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আবেগ বাদ দিয়ে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত ও টেকসই উদ্যোগ। যদি যাকাতকে সুশৃঙ্খলভাবে সংগ্রহ ও বণ্টন করতে হয়, তাহলে জাতীয় যাকাত বোর্ডকে ঢেলে সাজাতে হবে। দারিদ্র বিমোচনের একটি শক্তিশালী সামাজিক ও অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আদায়কৃত যাকাতের অর্থ ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সুশৃংখলভাবে বন্টনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এজন্য একটি বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনার আলোকে সুগভীর মাঠ জরিপ করে প্রয়োজনীয় নীতিমালা তৈরী কর নিতে হবে।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও
সাবেক চেয়ারম্যান। E-mail: [email protected]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.