
-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ। দীর্ঘ নয় মাসের সংগ্রাম, অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগ এবং জনগণের ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীনতা। প্রতিবছর বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস জাতিকে সেই ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং নতুন প্রজন্মকে ভবিষ্যতের দায়িত্বের কথা ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। এরপর ২০২৪ সালের জুলাইতে আমরা স্বাধীনতার অপূরিত বিষয়গুলো পুণ:আদায়ের জন্য আরেকবার গর্জে উঠেছি। ফ্যাসীবাদ, দুর্নীতি, আর্থ-সামাজিক বৈষম্য ও স্বৈরাচারমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে শপথ নিয়েছে আমাদের তরুণ সমাজ। একটি অবাধ, নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যারিষ্ঠতার মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একটি নতুন সরকার গঠন করেছে।
এখন স্বাধীনতার ৫৫ বছরে এসে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনের জন্য নতুন করে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছে। তবে উন্নয়নের এই ধারাকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে নানা চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নতুন প্রদানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসছেন। এখন তাঁর সামনে প্রচুর কাজ করার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। সেসব কাজে যেমন গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জে রয়েছে, তেমনি আছে নতুন সম্ভাবনার দিগন্তও।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তারেক রহমান একটি আলোচিত নাম। তিনি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দলের নেতৃত্বে রয়েছেন। তার রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-এর উত্তরাধিকার। এই রাজনৈতিক ঐতিহ্য একদিকে তাকে নেতৃত্বের শক্ত ভিত দিয়েছে, অন্যদিকে জাতীয় রাজনীতিতে এবং দেশ গড়ার কাজে বড় ধরনের প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে।
স্বাধীনতার এতগুলো বছরে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দেশ অনেক দূর এগিয়েছে। একসময়ের খাদ্যঘাটতির দেশ এখন খাদ্য উৎপাদনে অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ। তৈরি পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের
পরিচিতি তৈরি করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এসব অর্জনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ভবিষ্যতের নতুন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে দেখছেন, তার সামনে প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দলীয় বিভাজন, সংঘাত এবং অবিশ্বাসের সংস্কৃতি বহুবার উন্নয়নের ধারাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তাই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক সংলাপ থাকবে। এটি হবে তার নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা। যদিও বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে, তবুও আয় বৈষম্য, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং বেকারত্ব এখনও বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। নতুন নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে এমন নীতি গ্রহণ করা, যাতে উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়।
তরুণ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের একটি বড় শক্তি। দেশের মোট জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশই তরুণ। এই তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশ ভবিষ্যতের সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। যদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তরুণদের উদ্ভাবনী
শক্তিকে কাজে লাগানোর মতো নীতি গ্রহণ করতে পারেন, তাহলে এটি দেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে শিক্ষা খাতের উন্নয়নও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের ধারাকে বজায় রাখতে পারে না। আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া ভবিষ্যতের নেতৃত্বের জন্য অপরিহার্য হবে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও বাস্তবমুখী ও কর্মমুখী করা গেলে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে।
জলবায়ু পরিবর্তনও বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং লবণাক্ততার কারণে ক্রমাগত ঝুঁকির মুখে রয়েছে। জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা ভবিষ্যতের সরকারের জন্য
গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে।
তবে চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে বেশ কিছু সম্ভাবনাও রয়েছে। প্রথমত, তিনি যদি আধুনিক ও সংস্কারমুখী রাজনৈতিক নেতৃত্বের উদাহরণ তৈরি করতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন ধারার সূচনা হতে পারে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নীতিনিষ্ঠ রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তা দেশের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল প্রযুক্তি বাংলাদেশের উন্নয়নের একটি বড় সুযোগ। তথ্যপ্রযুক্তি খাত ইতোমধ্যে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করা গেলে এই খাত ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
তৃতীয়ত, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। দক্ষ কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হলো প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। রেমিট্যান্সের পাশাপাশি তারা বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও জ্ঞানের ক্ষেত্রেও অবদান রাখতে পারেন। প্রবাসীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানো গেলে দেশের উন্নয়নে নতুন গতি আসতে পারে। বিশেষ করে ইরান-মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাতের মধ্যে প্রবাসীদের যে ক্ষতি হচ্ছে ও আরো হবে সেগুলো মেটানোর জন্য নতুন নীতিমালা গ্রহণ খুবই জরুরী হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করা ভবিষ্যতের যেকোনো নেতৃত্বের জন্য একটি বড় দায়িত্ব। আইনের শাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উন্নয়নের ভিত্তি মজবুত করে। যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব এসব ক্ষেত্রে সংস্কার ও উন্নয়নের উদ্যোগ
নিতে পারে, তাহলে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একই সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায় এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ, এই চারটি ক্ষেত্রেই কার্যকর নেতৃত্ব দিতে হবে।
স্বাধীনতার চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে যদি নেতৃত্ব জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেয় এবং উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে বাংলাদেশ আগামী দশকগুলোতে আরও সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।
স্বাধীনতার শুরুতে বাংলাদেশ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত, দারিদ্র্যপীড়িত এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে। খাদ্য ঘাটতি, বেকারত্ব এবং অবকাঠামোর অভাব দেশের অগ্রযাত্রাকে সীমিত করেছিল। ধীরে ধীরে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশ, প্রবাসী আয় এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে অর্থনীতির ভিত্তি দৃঢ় হয়েছে। আজ বাংলাদেশ খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং বিশ্বের বড় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পেয়েছে, নারী ক্ষমতায়ন এবং শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার, ডিজিটাল সেবা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির শক্তি সামাজিক পরিবর্তন ও সমৃদ্ধির নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
তবে গত ২০২৪ সালের আন্দোলনে ১৯৭১-এর স্বাধীনতার অপূরিত বিষয়গুলো পুণ:আদায়ের জন্য আরেকবার গর্জে উঠেছিল তরুণ-জনতা। তবে গত ২০২৪ সালের বাস্তবতায় নতুন চ্যালেঞ্জও উপস্থাপন করা হয়েছে। আয় বৈষম্য, বেকারত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ দেশের অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং টেকসই অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়ন এখন সময়ের প্রধান দাবি। ১৯৭১ আমাদের মহান স্বাধীনতা দিয়েছে, আর ২০২৪-এর আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই স্বাধীনতার সুফল সাধারণ মানুষের নিকট কতটা অধরা এবং কতটা শুধু একশ্রেণির নাগরিকদের কাছে পৌঁছেছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশের কিছু কিছু অর্জন বেশ গর্বের, কিন্তু এখনও ইস্পিত অনেক কিছুই অর্জিত হয়নি। এজন্য নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ ও চৌকষ নেতৃত্ব, সুশাসন এবং জাতীয় ঐক্যই হোক আমাদের আগামী দিনের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন।
E-mail: [email protected]