রবিবার | ৫ এপ্রিল, ২০২৬ | ২২ চৈত্র, ১৪৩২

জীবনের ঝুঁকি জেনেও সুন্দরবনেই ফিরবেন মুক্তার হোসেন

নিজস্ব প্রতিবেদক :
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়ায়নি। লালচে সূর্য উঠছে সুন্দরবনের বুক চিরে। চুনকুড়ি নদীর হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে জাল টানছিলেন মুক্তার হোসেন গাজী। পাশে ছিলেন কালাম ও নিমাই, আর নৌকায় বৈঠা হাতে প্রস্তুত ছিলেন মাঝি আবদুস সাত্তার।
হঠাৎই সবকিছু বদলে যায়।
জাল টানার ফাঁকে পেছনে তাকিয়ে মুক্তার দেখেন—একটি বাঘ! কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই মুহূর্তের মধ্যে বাঘটি ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁর ঘাড়ে। সামনের থাবা দিয়ে ঘাড় আর পেছনের পা দিয়ে কোমর চেপে ধরে শিকারকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। জীবন বাঁচাতে এক সেকেন্ডও দেরি করেননি মুক্তার। বাঘকে পিঠে নিয়েই তিনি সোজা ঝাঁপ দেন বরফশীতল নদীর পানিতে।
এরপর শুরু হয় পানির নিচে মানুষ আর বাঘের এক অবিশ্বাস্য লড়াই।
মুক্তারের ভাষায়, তখনও তাঁর জ্ঞান ছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন, বাঘ তাকে আঁকড়ে আছে। তাই পানির নিচে সাঁতরে আরও গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিছুক্ষণ পর তিনি অনুভব করেন, বাঘের থাবা ঢিলা হয়ে আসছে। একসময় বাঘ পুরোপুরি ছেড়ে দেয় তাকে। সুযোগ বুঝে আরও কিছুটা দূরে গিয়ে পানির ওপর মাথা তোলেন তিনি।
পানির নিচে চাদর জড়িয়ে গিয়েছিল মুখে। ওপরে উঠে দ্রুত তা সরিয়ে শ্বাস নেন। এরপরই চিন্তা—সহযোগীদের কিছু হলো না তো? চিৎকার করে জানান, তিনি বেঁচে আছেন। এদিকে দুই পাশ থেকে নৌকা নিয়ে লোকজন ছুটে আসছিল।
মাঝি আবদুস সাত্তার জানান, তিনি বৈঠা নিয়ে প্রস্তুত ছিলেন। বাঘ যদি মুক্তারকে নিয়ে ওপরে ওঠে, তাহলে আঘাত করবেন—এই প্রস্তুতিই ছিল। তবে বাঘ শিকার ছেড়ে একাই পানি থেকে উঠে চলে যায়। সাধারণত শিকার হাতছাড়া হলে অন্য কাউকে আক্রমণ করে না বলে জানান তিনি।
গুরুতর আহত অবস্থায় মুক্তারকে বাড়িতে নেওয়া হয়। এলাকায় সোলাইমান নামে এক চিকিৎসক ছিলেন, যিনি বাঘের আক্রমণে আহতদের চিকিৎসা করতেন। দীর্ঘ ছয় মাস চিকিৎসার পর সুস্থ হন মুক্তার। বাঁ পায়ে বাঘের নখের গভীর ক্ষত ছিল, যা সারাতে অপারেশন পর্যন্ত করতে হয়েছে। আজও তাঁর পিঠে বাঘের থাবার দাগ স্পষ্ট।
১৯৯১ সালের সেই ঘটনার তারিখ পুরোপুরি মনে না থাকলেও মাঘ মাসের ২১ তারিখ ছিল—এ তথ্য স্পষ্টভাবে মনে আছে তাঁর। বর্তমানে ৫২ বছর বয়সী মুক্তার হোসেনের বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সিংহড়তলী গ্রামে। ৩১ মার্চ রাতে চুনকুড়ি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে পুরোনো সেই স্মৃতিই শোনাচ্ছিলেন তিনি।
শুধু জেলে নন, মুক্তার একজন অভিজ্ঞ মৌয়ালও। ছোটবেলা থেকে বছরের একটি সময় সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতেন। এখন তাঁর তিন ছেলেও সেই পেশায় যুক্ত থাকলেও বাবার সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর তারা আর বনে যান না। বর্তমানে মৌবাক্সের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মধু সংগ্রহ করেন তারা। তাঁদের খামারের নাম ‘বনের বন্ধু মৌ খামার’।
বাংলাদেশের মধুকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে এবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাচ্ছেন মুক্তার হোসেন। ‘ইন্টারন্যাশনাল বি কিপিং কনফারেন্স ২০২৬’-এ অংশ নিতে তিনি রওনা দিচ্ছেন নেপালে। ৬ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নিচ্ছে, যেখানে রয়েছেন গবেষক, মৌচাষি ও মধু ব্যবসায়ীরা।
তবে আন্তর্জাতিক সফর শেষে আবারও সুন্দরবনের দিকেই ফিরবেন মুক্তার—জীবনের ঝুঁকি জেনেও, সেই চিরচেনা বনের টানে।

সম্পাদনা : রাশিদুল ইসলাম রাশেদ/ উপসম্পাদক/ প্রাপ্তি প্রসঙ্গ/০৪-০১

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.