
পূজার ছুটিতে রাজশাহীতে বড় বোনের বাসায় বেড়াতে যাচ্ছিলেন রুবিনা আক্তার (৩৬)। সঙ্গে ছিলেন স্বামী শহিদুল ইসলাম (৪০) ও দুই সন্তান। স্বজনদের সঙ্গে কয়েকটি দিন আনন্দে কাটানোর কথা ছিল তাঁদের। কিন্তু সেই যাত্রাই কেড়ে নিল রুবিনার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় দুজন মানুষকে। নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন তাঁর স্বামী ও আট বছরের মেয়ে তাছফিয়া খাতুন। আহত রুবিনা ও তাঁর ১০ বছরের ছেলে লাবিব হোসেন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। স্বামী ও মেয়ের মৃত্যুর খবর এখনো জানেন না রুবিনা। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বারবার জানতে চাইছেন, স্বামী ও সন্তানেরা কোথায়?
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোরে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে ঘটে এ দুর্ঘটনা। বালুবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে একটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান ১২ জন। আহত হন আরও অনেকে। নিহতদের তালিকায় রয়েছেন রুবিনার স্বামী শহিদুল ও মেয়ে তাছফিয়া। একসঙ্গে রাজশাহী যাওয়ার পথে মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তাঁদের পরিবারের স্বপ্ন।
রুবিনা পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি পূবালী ব্যাংকের সুবিদখালী শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তাঁর স্বামী শহিদুল ইসলাম ব্র্যাক ব্যাংকের মাগুরা শাখায় ক্রেডিট ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁদের মেয়ে তাছফিয়া তৃতীয় শ্রেণিতে এবং ছেলে লাবিব পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত।
পূজার ছুটিতে সন্তানদের নিয়ে পটুয়াখালী থেকে রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন রুবিনা। পরে একই বাসে ওঠেন শহিদুলও। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর বড় বোনের বাসায় পরিবারের সবাই মিলে সময় কাটানোর কথা ছিল। কিন্তু রাজশাহীতে পৌঁছানোর আগেই থেমে যায় তাঁদের যাত্রা। যে ছুটিকে ঘিরে ছিল আনন্দের পরিকল্পনা, তা-ই পরিবারের জন্য হয়ে উঠল আজীবনের বেদনা।
রাজশাহীর পাঠানপাড়া এলাকায় থাকেন রুবিনার ভগ্নিপতি শহিদুর রহমান। তিনি ইস্টার্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা। তাঁর বাসাতেই বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল রুবিনা ও শহিদুলের পরিবারের। নির্ধারিত সময়ে তাঁদের পৌঁছানোর কথা থাকলেও কোনো খোঁজ না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন শহিদুর। খোঁজ নিতে গিয়ে একপর্যায়ে জানতে পারেন দুর্ঘটনার খবর।
শহিদুর রহমান জানান, কিছুদিন আগেই রুবিনা ও শহিদুল ওমরাহ করে এসেছিলেন। দুজনই ব্যাংকে চাকরি করতেন। পূজার ছুটিতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা সব হিসাব পাল্টে দিয়েছে।
যাঁদের আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁদের মধ্যে দুজন আর কখনো ফিরবেন না—এ নির্মম সত্য এখন স্বজনদের মেনে নিতে হচ্ছে। অথচ হাসপাতালে শুয়ে থাকা রুবিনা এখনো জানেন না, তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে কত বড় শোক।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে বনপাড়া পাটোয়ারী ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন রুবিনাকে দেখা যায় শয্যায় শুয়ে ব্যথায় কাতরাতে। শরীরের যন্ত্রণার মধ্যেও বারবার জানতে চাইছিলেন, তাঁর স্বামী ও সন্তানেরা কোথায়। স্বজনেরা এখনো তাঁকে স্বামী ও মেয়ের মৃত্যুর খবর জানাননি।
রুবিনার পাশে রয়েছেন তাঁর বড়বোন। অন্যদিকে নাটোর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছেলে লাবিবের পাশে আছেন তার দুলাভাই শহিদুর রহমান। দুর্ঘটনায় আহত মা-ছেলের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি স্বজনদের সামলাতে হচ্ছে প্রিয় দুইজন মানুষকে হারানোর শোক।
একই পরিবারের চারজন আহত-নিহত হওয়ার এই ঘটনা স্বজনদের জন্য এক কঠিন বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রুবিনা ও লাবিব, অন্যদিকে তাঁদের জীবনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের চিরবিদায়। যে পরিবারের একসঙ্গে রাজশাহী যাওয়ার কথা ছিল, সেই পরিবারের সদস্যদের এখন থাকতে হচ্ছে দুই জায়গায়—আর দুজনকে আর কোনো দিন ফিরে পাওয়া যাবে না।
পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় নিহতদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার আরব আলীর ছেলে সামাদ ফকির (৭০), ইউনুস আলীর ছেলে সোহাগ হোসেন (৩০), জহুর উদ্দিনের ছেলে জুয়েল রানা (৪০), জাহান উদ্দিন মোল্লার ছেলে শালাল মোল্লা (৪৫) ও রাজ্জাক ব্যাপারীর ছেলে শাহিন হোসেন (২৫)।
এ ছাড়া রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরহাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে ও বাসচালক সোহেল রানা (৪০), বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে আনোয়ার হক (৩০), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী গ্রামের শহিদুল ইসলাম ও তাঁর মেয়ে তাছফিয়া খাতুন (৮), ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মান্দারবাড়িয়া গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে ও ট্রাকচালক আবুল কালাম, নওগাঁর শান্তাহারের সাজ্জাদ আলীর ছেলে রাসেল আলী (৩৩) এবং ফরিদপুর সদরের বাখনদিয়া এলাকার ওমর কুমার জমাদারের ছেলে হিমেজ জমাদার (৩৫) নিহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনার পর প্রথমে নিহতের সংখ্যা ১৪ বলা হলেও পরে তা সংশোধন করা হয়েছে। নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়ের আলম জানান, তথ্যগত ভুলের কারণে প্রথমে নিহতের সংখ্যা ১৪ বলা হয়েছিল। পরে যাচাই করে ১২ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতার কারণে কিছু সময় মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হলেও বর্তমানে তা স্বাভাবিক রয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
পূজার ছুটিতে স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার যে স্বপ্ন নিয়ে রুবিনা ও তাঁর পরিবার রাজশাহীর পথে যাত্রা করেছিলেন, সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। অপেক্ষার ঘরে স্বজনেরা শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন, আর হাসপাতালের বিছানায় রুবিনা এখনো খুঁজছেন তাঁর স্বামী ও মেয়েকে। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেদনাময় সত্যটি জানার আগপর্যন্ত এই অপেক্ষাই হয়তো তাঁর কাছে একমাত্র ভরসা—যে অপেক্ষার পরিণতি তিনি এখনো কল্পনাও করতে পারছেন না। একই শোক ও পরিনতি নিহত অন্য দশ জনের পরিবারেও।
এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা ছুঁয়ে গেছে দেশবাসীর হৃদয়
এমন হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ, জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার, পুলিশ সুপার এবং বড়াইগ্রামের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস। তাঁরা উদ্ধার কার্যক্রমের খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসার বিষয়েও খোঁজ নেন। হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এ ছাড়া দুর্ঘটনা কমাতে বনপাড়া-পাবনা মহাসড়ক প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।