বৃহস্পতিবার | ৩ এপ্রিল, ২০২৫ | ২০ চৈত্র, ১৪৩১

২৬ বছরের চাকরি ও ৯১ হাজার টাকা অবসরভাতা

রমেশ কুমার পার্থ :
১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর। সাড়া জাগানো একটি জাতীয় দৈনিক বাজারে এসেছে। চারিদিকে সাজ সাজ রব। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সিএ ভবনে হচ্ছে দৈনিকটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগদান করি। সেদিন দৈনিকটি একটি বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ করে। সেই বুলেটিনে দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রতিনিধির সাথে আমার নামও ছিল। এভাবেই দৈনিকটির সাথে জড়িয়ে পড়ি। এর আগে ছিলাম ভোরের কাগজে। শ্রদ্ধাভাজন সম্পাদকের ডাকে চলে আসি সুনীল গঙ্গোপধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাসের নামে নামাঙ্কিত প্রথম আলোতে।
প্রথম আলোতে টানা ২৬ বছর উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করি। দৈনিকের মাননীয়রা ওই কাজকে আবার আদর করে ‘চাকরি’ নামে অভিহিত করে থাকেন। সেই হিসেবে বলতে গেলে প্রথম আলোতে আমার চাকরি জীবন ২৬ বছরের। মাঠে ময়দানে ঘুরে মানুষের কথা তুলে এনে পত্রিকায় পাতায় খবর হিসেবে পাঠানোর চেষ্টা করলাম। একসময় বার্তা বিভাগের নির্দেশে পাশের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলারও দায়িত্ব পালন করেছি। আমার করা অনেক নিউজের সম্পাদকীয়ও হয়েছে। এভাবে কাজ করতে করতে ২০১৯ সালে প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ আমাকে সেরা প্রতিনিধি নির্বাচিত করেন। এই দীর্ঘ সময়ে ছোট্ট একটি এলাকায় সাংবাদিকতা করতে গিয়ে অনেকের রোষানলের শিকার হয়েছি। আবার অনেকের কাছে প্রশংসিত হয়েছি। তবে সততার সাথে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করে গেছি।


৪ অক্টোবর ২০২৪ অপরাহ্নে প্রথম আলোর টেলিফোন পাই। ভেবেছিলাম নিউজ বিষয়ে ডেস্ক থেকে কোনো ভাই কথা বলবেন। কিন্তু মানবসম্পদ বিভাগ থেকে আমাকে প্রথম আলোর নীতিমালা অনুযায়ী অবসরের কথা জানায়।
প্রথম আলোর কর্মীদের জন্য নীতিমালার একটি বই রয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকতা থেকে অবসরের নীতিমালা প্রথম আলোর রয়েছে তা আমার জানা ছিল না। যে কারণে মানবসম্পদ বিভাগের ফোন পেয়ে যারপরনাই অবাক হই। সংখ্যা হিসেব করলে আমার বয়স দাঁড়ায় ৬০। তবে আমার জানামতে প্রথম আলোতে ষাটোর্ধ অনেকেই সুরক্ষিত চাকরি করছেন। যাঁর স্বাক্ষরে চিঠি পাঠানো হয়েছে তিনিও একজন ষাটোর্ধ।
কোনোরকম সুযোগ না দিয়ে ১৬ নভেম্বর ২০১৪ তারিখে আমার অবসর কার্যকর করে আমার ব্যক্তিগত ই-মেইলে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিটি স্বাক্ষর করেন প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরীফ। ২৬ বছরের সাংবাদিকতা (চাকরি) জীবনের এখানেই দুর্ভাগ্যজনক ইতি ঘটে।
আমার দুটি মেয়ের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরটি কলেজে পড়ছে। প্রথম আলোর চাকরি ছাড়া আমার আয়ের বিকল্প কোনো ব্যবস্থা ছিল না। থাকলে হয়তো এত সমস্যা হতো না। এ বিষয়টিও কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। কেউ আমার কথা শুনতে চাননি।
অবশেষে কোনো উপায় না পেয়ে প্রথম আলোর প্রিয় সম্পাদক মহোদয় বরাবরে; অন্তুত আমার বড় মেয়েটির অনার্স কমপ্লিট না হওয়া পর্যন্ত (তিনটি বছর) চাকরিতে বহাল রাখার অনুরোধ জানিয়ে তিনবার চিঠি লিখি। বার্তা বিভাগের আরও একজনকে একাধিকবার অনুরোধ করেছি। কিন্তু কেউ আমার ডাকে সাড়া দেননি। ভেবে অবাক হই, জীবনের মূল্যবান ২৬ বছর আমি তাঁদের সাথে কাটিয়েছি। এই দীর্ঘ সময় অন্য পেশায় যুক্ত থাকলে হয়তো আমাকে এতটা দুরবস্থায় পড়তে হতো না।
প্রথম আলো থেকে অবসরের পর হঠাৎ আমার স্ত্রীর অসুস্থতা ধরা পড়ে। তার চিকিৎসা ছিল আমার জন্য ব্যয়বহুল। এক পর্যায়ে চিন্তা করলাম প্রথম আলো যদি আমাকে অবসরভাতা দেয় তাহলে সেটা দিয়ে স্ত্রীর চিকিৎসা খরচ মেটাব।
গত জানুয়ারি মাসে প্রথম আলোর মানবসম্পদ বিভাগ আমাকে ডেকে নিয়ে না-দাবি মুচলেকা নিয়ে অবসরভাতা বাবদ মাত্র ৯১ হাজার টাকার একটি চেক তুলে দেয়।
অনেকটা অবাক হলাম। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একটি গণমাধ্যমে উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে ২৬ বছর কাজ (প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ বলেন চাকরি) করলাম। অথচ প্রতিষ্ঠানটি আমার মতো এক কর্মীকে মাত্র ৯১ হাজার টাকা অবসরভাতা দিয়ে বিদায় করে দিয়েছে। অবসরের পর কর্তৃপক্ষের কেউ ফোন করে একটু সহানুভুতি পর্যন্ত জানানোর প্রয়োজন অনুভব করেননি। একাধিক চিঠি পাঠালেও কোনো জবাব দেওয়া হয়নি।
মফস্বল এলাকায় (উপজেলা) কর্মরত সাংবাদিকদের কী অবস্থা তা ভাবলে শিহরিত হই। তাঁদেরও পরিবার পরিজন থাকতে পারে এটা ভাবলে অনেক মালিক/সম্পাদক খুব কষ্ট পান। পত্রিকার পাতায় পাতায় তাঁদের কতো নসিহতমূলক লেখা প্রকাশিত হয়। পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বেতন কতো হবে সেটাও পত্রিকাগুলো তুলে ধরে। অথচ নিজেদের কর্মীদের বেতন-ভাতা প্রদানের বিষয় সামনে এলে ওনারা আশ্চর্যভাবে নীরব হয়ে থাকেন।
সম্প্রতি গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন তাঁদের প্রতিবেদন পেশ করেছে। এই প্রতিবেদনের আলোকে মফস্বলের সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি নির্ধারিত হোক। পাশপাশি এ পেশার উৎকর্ষ সাধিত হোক-এ কামনা করি।

* রমেশ কুমার পার্থ (সাংবাদিক), নান্দাইল, ময়মনসিংহ। ২৪ মার্চ, ২০২৫

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৩)
Developed by- .::SHUMANBD::.