শনিবার | ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬ | ১০ মাঘ, ১৪৩২

অস্থিরতার বাজারে পচা কাঁঠাল ও মুচি খরিদ্দার

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
গণতন্ত্রকে আমরা প্রায়ই বলি জনগণের ক্ষমতা। কিন্তু বাস্তবে এই ক্ষমতা আজ রূপ নিয়েছে এক অদ্ভুত বাজারে যেখানে ভোটই প্রধান পণ্য, আর প্রার্থী তার মোড়ক। এই বাজারে সবচেয়ে বিস্ময়কর দৃশ্য হলো, পঁচা কাঁঠালও দেদারসে বিক্রির চেষ্টা হচ্ছে; আর আশ্চর্যজনকভাবে তার খরিদ্দারও কম নয়। এই দৃশ্য শুধু বাস্তব হাটবাজারের মধ্যে না থেকে সমাজের চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। ক্রমান্বয়ে এটি আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রের এক ভয়ংকর রূপক হয়ে উঠেছে।
রাজনীতি, প্রশাসন, ব্যবসা কিংবা নীতিনৈতিকতার বাজার সবখানেই আজ পচা কাঁঠাল মুচি খরিদ্দারের অভাব নেই। যে নেতৃত্ব ব্যর্থ, অপরীক্ষিত, যেটা পালিয়ে যাওয়া ও যেটা মূলে পরাজিত, অথবা যারা এখনও দেশের জন্মের বৈধতা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্থ, যে ব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত, যে প্রতিশ্রুতি ফাঁপা,
তাকেই আমরা বারবার কিনছি, ব্যবহার করছি, প্রশ্রয় দিচ্ছি। প্রশ্ন হলো, পচা কাঁঠাল কি শুধু বিক্রেতার দোষে বিক্রি হয়, নাকি খরিদ্দারের রুচি ও দায়ও এখানে সমান?
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচারব্যবস্থা সবখানেই এই চক্র। ভেজাল ওষুধ তৈরি হয়, কারণ ক্রেতা আছে। প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষক টিকে যান, কারণ প্রতিবাদ নেই। দুর্বল নীতি বহাল থাকে, কারণ আ মরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। পচা কাঁঠাল একদিনে পঁচে না; যেমন একটি রাষ্ট্রও একদিনে নষ্ট হয় না। ধীরে ধীরে, নীরব সম্মতিতে, ছোট ছোট আপসের ভেতর দিয়েই পচন ধরে।
এই বাজারের খরিদ্দাররা অর্থাৎ ভোটাররা, অনেক সময় অজ্ঞ নন। তারা বোঝেন, কোন কাঁঠাল পচা, কোনটা টাটকা। তবু নানা অজুহাতে তারা পচাটাই কেনেন। কেউ সাময়িক লাভের আশায়, কেউ ভয়ে, কেউ দলীয় আনুগত্যের অন্ধতায়, কেউ আবার নিছক হতাশা থেকে ‘ভালো কেউ নেই’ এই আত্মসমর্পণমূলক মানসিকতায়। এভাবেই ভোটার নিজেই হয়ে ওঠেন গণতন্ত্রের বাজারে পচা কাঁঠাল মুচি খরিদ্দার।
বর্তমানে জাতীয় ভোটের বাজারে বহু প্রার্থীর অতীত, যোগ্যতা ও নৈতিকতার হিসাব নতুন করে কষার সুযোগ নেই, সবই যেন আগেই জানা। তবু তারা নির্দ্বিধায় মাঠে নামেন। কারণ তারা জানেন, এই বাজারে পচন কোনো বাধা নয়। দলীয় ছাপ, শক্তির প্রদর্শন, অর্থের প্রভাব আর নানা ধরনের প্রলোভন, এই সবকিছু মিলিয়ে পঁচা কাঁঠালকে টাটকা বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। বিক্রেতা জানে, প্রশ্ন কম হবে; দরদাম হবে অন্য জায়গায়।
কিন্তু এই বাজার শুধু বিক্রেতার দোষে চলে না। খরিদ্দার অর্থাৎ ভোটার এখানে সমান অংশীদার।
অনেক ভোটারই জানেন, কাকে ভোট দিচ্ছেন। তবু দেন। কেউ দেন সাময়িক সুবিধার আশায়, কেউ দেন ভয় বা চাপে, কেউ আবার নিছক উদাসীনতায় ’সবাই তো এক‘ এই আত্মতুষ্ট বাক্যে নিজের দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলেন। এভাবেই ভোটার নিজেই হয়ে ওঠেন অনৈতিকতাসম্পন্ন গণতন্ত্রের বাজারে পচা কাঁঠাল ও মুচি খরিদ্দার।
ভোটের বাজারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নৈতিকতা ও যোগ্যতা। সৎ ও দক্ষ প্রার্থী এখানে দামী পণ্য। কারণ তাদের সঙ্গে আসে জবাবদিহি, নিয়ম আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঝামেলা। অন্যদিকে পচা কাঁঠাল সস্তা। একটু লোভ, একটু ভয়, আর কিছু প্রতীকী উন্নয়নের গল্পেই তা বিক্রি
হয়ে যায়। ফলাফল হিসেবে গণতন্ত্র ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক ধরনের আনুষ্ঠানিকতায়, যেখানে ভোট হয়, কিন্তু পছন্দের স্বাধীনতা সংকুচিত থাকে।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, পচনের সঙ্গে আমাদের অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া। যখন বারবার প্রশ্নবিদ্ধ নেতৃত্বই নির্বাচিত হয়, তখন আমরা সেটাকেই স্বাভাবিক ধরে নিতে শুরু করি।
দুর্নীতি আর অদক্ষতা তখন আর ব্যতিক্রম থাকে না; হয়ে ওঠে নিয়ম। গণতন্ত্রের বাজার তখন আর ভালো পণ্যের অপেক্ষায় থাকে না। কারণ খরিদ্দারই ভালোটা চিনতে ভুলে যায়। ভোটের বাজারে এই পচন শুধু একটি নির্বাচনের ক্ষতি করে না; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর বোঝা
চাপায়। ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হয় নীতিনির্ধারণে, উন্নয়নে, এমনকি রাষ্ট্রীয় আস্থায়। একবার আস্থা ভেঙে গেলে তা ফেরানো সবচেয়ে কঠিন কাজ। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, সময় গেলে আমরা পচা কাঁঠালের গন্ধে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। তখন আর দুর্গন্ধ লাগে না বরং টাটকা ফলকেই অচেনা মনে হয়। সৎ মানুষকে সন্দেহ করি, যোগ্যতাকে অস্বস্তিকর মনে করি, আর পচাকেই বাস্তবতা বলে মেনে নিই। নিতান্ত মানবিক প্রয়োজনে হোক বা লোভের বশবর্তী হয়ে হোক, বৈশ্বিক গণতন্ত্রের পাহারাদারের দাবীদারকে কেউই ঘাটাতে সাহস করি না। তাইতো মাদুরোদেরকে ড্রামাটিক ডেকাপিটেশন স্ট্রাইকের মাধ্যমে হঠাৎ তুলে নেয়ার সময় ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখানোর মতো তরুণরাও আজকাল মুখ বুঁজে সহ্য করে যাচ্ছে তারা। এই মানসিক দাসত্বই বর্তমানে একটি সমাজের সবচেয়ে বড় পরাজয়।
তাহলে করণীয় কী? প্রথমত, খরিদ্দার হতে হবে সচেতন। পচা কাঁঠাল ফিরিয়ে দিতে হবে, হোক তা ভোটের বাক্সে, বাজারে কিংবা সামাজিক সিদ্ধান্তে। দ্বিতীয়ত, বিকল্প চাইতে হবে। ‘আর কিছু নেই’ এই অজুহাতই পচা পণ্যের সবচেয়ে বড় পুঁজি। তৃতীয়ত, প্রতিবাদকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে, নীরবতাকে নয়।
এই অচলাবস্থা থেকে বেরোতে হলে বাজারের নিয়ম বদলাতে হবে আর তা শুরু করতে হবে খরিদ্দার থেকেই। ইতোমধ্যে জানা গেছে, সামনে ফেব্রুয়ারী ১২, ২০২৬ জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। তার আগেই ভোটারকে বুঝতে হবে, ভোট কোনো দান নয়, এটি একটি দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত। ভোট টাকা দিয়ে কেনা- বেচার কোন বাজারী পণ্য নয়। এমনকি ভোট ভয়ভীতি, ধর্মীয় দোহাই, অপব্যাখ্যা দিয়ে দেয়া-নেয়ারও কোনকিছু বা বিনিময় করার বিষয় বা পণ্য নয়।
ভোটের বাক্স চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি করা, দিনের ভোট রাতে, ঘুসের মাধ্যমে পক্ষপাতিত্ব করা, ডিজিটাল চুরি, এআই সঞ্জাত চাতুরী কোনটাই করতে দেয়া যাবে না। বডিওর্ণ ক্যামেরাকে সততার সাথে ব্যবহার করতে হবে। এভাবে সকল পচা কাঁঠাল ফিরিয়ে দিতে না শিখলে ভালো কাঁঠাল আর বাজারে আসবে না। প্রশ্ন করা, তুলনা করা এবং নৈতিকতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই গণতন্ত্রকে বাঁচানোর প্রথম শর্ত।
গণতন্ত্রের বাজার সুস্থ রাখতে হলে সচেতন খরিদ্দার দরকার। নইলে পচা কাঁঠাল আর তার মুচি খরিদ্দার এই যুগলবন্দিই বারবার আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের ভাগ্য নির্ধারণ করে যাবে। তাহলে ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তন ও প্রত্যাশিত সংস্কার কথাগুলো কি সুদূর পরাহত হয়েই থাকবে
চিরকাল?এছাড়া ক্রমাগত রাস্তা বন্ধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা এই অস্থির সময়ে সেটা অন্তত: আমাদের নবীণ-তরুণদের কাছে কাম্য হতে পারে না।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন।
E-mail: [email protected]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.