
-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
নির্বাচন এলেই বাংলাদেশ যেন নতুন করে জেগে ওঠে। নির্বাচনের তপশীল ঘোষণা সাথে সাথে আমাদের দেশের রাজপথ, অলিগলি, হাট-বাজার, চায়ের দোকান সবখানেই এক অদ্ভুত উত্তেজনার ঢেউ জাগে। ব্যানার-ফেস্টুনে রঙিন শহর, মাইকের শব্দে প্রকম্পিত গ্রাম, স্লোগানে স্লোগানে মুখর চারদিক। এবারেও তাই হয়েছে। তবে এবারে নির্বাচনী প্রচারণার উত্তেজনা একটু ভিন্ন রকম রূপ পরিগ্রহ করেছে।
এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে বলা হচ্ছে জেন-জির নির্বাচন। বিদেশী সংবাদমাধ্যম এএফপি সূত্রে জানা গেছে, জেনারেশন জি এই নির্বাচনের মূল আকর্ষণ। সকল জেন-জিরা নিজেরা এককভাবে না থেকে বা না দাঁড়িয়ে অনেকগুলো দলের সাথে মিশে নির্বাচন করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই এবারের নির্বাচনে সকল রাজনৈতিক দলেই আলাদা মতাদর্শের জেনজি রয়েছে। তবুও তারা এবারের নির্বাচনে ফলাফল পাল্টাতে প্রধান আকর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই আকর্ষণকে বৈশ্বিক মর্যাদা দিতে হলে প্রচারণা ও ফলাফল মেনে নেয়া পর্যন্ত সবাইকে ‘কুল ডাউন’ নীতি গ্রহণ করা ছাড়া বিকল্প নেই।
গোটা বাংলাদেশ এখন নির্বাচনী মিছিলে মুখর। এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় লিফলেট, ব্যানার, মিছিল, স্লোগান, বক্তৃতা, টকশো ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আমাদের রাজনৈতিক রুচি ও পরিপক্বতা। এই প্রচারণা যদি ভদ্রতা, শালীনতা ও সহনশীলতায় পরিপূর্ণ হয়, তবে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে; আর যদি তা কটু ভাষা, বিদ্বেষ ও অপপ্রচারে ভরে ওঠে, তবে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই বলাই যায় নির্বাচনী প্রচারণায় ভদ্রতাই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি। আমাদের দেশে এই ভদ্র শক্তির প্রবর্তন ও প্রচলন ইতিবাচকভাবে টেকসই হোক।
নির্বাচন মানেই মতের প্রতিযোগিতা। ভিন্ন দল, ভিন্ন আদর্শ, ভিন্ন কর্মসূচি থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মতের পার্থক্য মানেই ব্যক্তিগত আক্রমণ বোঝাবে কেন? দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক সময় দেখা যায়, প্রচারণার ভাষা ক্রমেই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। প্রতিপক্ষকে ছোট করা, কটূক্তি করা, অতীতের ভুল বা বিতর্কিত বিষয়কে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এসব যেন প্রচারণার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এতে সাময়িকভাবে হাততালি পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাজনৈতিক পরিবেশ ও জনআস্থা।
ভদ্র প্রচারণা মানে নিস্তেজ বা দুর্বল প্রচারণা নয়। বরং ভদ্রতা রাজনৈতিক বক্তব্যকে আরও গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। যুক্তিনির্ভর আলোচনা, তথ্যভিত্তিক সমালোচনা ও ভদ্র ভাষায় মত প্রকাশই পারে ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে। একজন প্রার্থী বা দল যখন শালীন ভাষায়
নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরে এবং প্রতিপক্ষের সমালোচনা করে নীতিগত ও কর্মসূচিগত জায়গা থেকে, তখন ভোটার বুঝতে পারেন এখানে দায়িত্ববোধ আছে, পরিণত রাজনীতির চর্চা আছে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি জনগণ। আর জনগণ বৈচিত্র্যময় চরিত্রের হয়ে থাকে। তারা ভিন্ন মত, ভিন্ন বিশ্বাস, ভিন্ন সামাজিক অবস্থান নিয়ে রাষ্ট্রের এককটি অংশকে প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। নির্বাচনী প্রচারণায় যদি কোনো বিশেষ গোষ্ঠী, ধর্ম, অঞ্চল বা মতাদর্শকে আঘাত করা হয়, তবে সেই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নিজেকে রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে। এতে সামাজিক বিভাজন গভীর হয়, যা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ভদ্র ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রচারণা এই বিভাজন কমাতে সাহায্য করে।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্বাচনী প্রচারণার বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এখানে ভদ্রতার চ্যালেঞ্জ আরও জটিল। ফেসবুক পোস্ট, লাইভ ভিডিও, মন্তব্য, সবকিছুই মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই এখানে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করেন, যাচাই না করা তথ্য ছড়ান, এমনকি
ব্যক্তিগত আক্রমণে লিপ্ত হন। অথচ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও ভদ্রতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইনে বলা একটি কথা অফলাইনের মতোই বাস্তব প্রভাব ফেলছে। তাই ডিজিটাল প্রচারণায় নৈতিকতা ও ভদ্রতার চর্চা এখন সময়ের দাবি।
নির্বাচনী প্রচারণায় ভদ্রতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তরুণদের ভূমিকা। তরুণরাই সবচেয়ে বেশি প্রচারণায় সক্রিয় থাকে। মিছিল, পোস্টার লাগানো, অনলাইন ক্যাম্পেইন সবখানেই তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। তারা রাজনীতির ভাষা ও আচরণ কাছ থেকে শেখে। যদি তারা দেখে রাজনীতিতে গালাগালি, হুমকি ও সহিংসতাই স্বাভাবিক, তবে ভবিষ্যতের রাজনীতিও সেই পথেই যাবে। কিন্তু যদি তারা দেখে মতের লড়াই হয় ভদ্রতা ও যুক্তির মাধ্যমে, তবে ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র হবে আরও সুস্থ ও শক্তিশালী।
ভদ্র প্রচারণা নির্বাচন ব্যবস্থাপনার জন্যও সহায়ক। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন আয়োজন করা নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য অনেক সহজ হয়। উত্তেজনাপূর্ণ ও কুরুচিপূর্ণ প্রচারণা প্রায়ই সংঘর্ষ ডেকে আনে, যা শেষ পর্যন্ত ভোটের দিনকেও প্রভাবিত করে। ভদ্রতা তাই শুধু নৈতিক গুণ নয়, এটি একটি কার্যকর প্রশাসনিক সহায়ক শক্তিও।
এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেতারা যে ভাষা ব্যবহার করেন, কর্মীরা সেটাই অনুসরণ করে। শীর্ষ নেতৃত্ব যদি সংযত ও দায়িত্বশীল ভাষায় কথা বলেন, তবে নিচের স্তরেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। বিপরীতভাবে, উসকানিমূলক বক্তব্য দিলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। নেতৃত্বের ভদ্রতা তাই পুরো প্রচারণার সুর নির্ধারণ করে।
এখানে ভোটারদের ভূমিকাও কম নয়। ভোটার হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব আছে, কুরুচিপূর্ণ প্রচারণাকে প্রত্যাখ্যান করা। যে প্রার্থী বা দল বিদ্বেষ ছড়ায়, গুজব ছড়ায়, ব্যক্তিগত আক্রমণে লিপ্ত হয়, তাদের প্রতি প্রশ্ন তোলা দরকার। ভদ্র ও গঠনমূলক প্রচারণাকে সমর্থন করাই পারে রাজনীতির
ভাষা বদলাতে। ভোটারদের এই সচেতন অবস্থানই রাজনীতিবিদদের বাধ্য করবে আরও দায়িত্বশীল হতে।
ইতিহাস বলছে, যেসব দেশে নির্বাচনী প্রচারণা তুলনামূলক ভদ্র ও নীতিনিষ্ঠ, সেসব দেশে গণতন্ত্রও বেশি স্থিতিশীল। সেখানে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও তা শত্রুতায় রূপ নেয় না। ক্ষমতা বদলালেও রাষ্ট্র ও সমাজ অচল হয়ে পড়ে না। আমাদেরও সেই দিকেই এগোতে হবে। যেখানে নির্বাচন হবে তর্কের মঞ্চ, কোলাহলের নয়; যুক্তির লড়াই, বিদ্বেষের নয়।
আরো বলা যায়, নির্বাচনী প্রচারণা হলো গণতন্ত্রের আয়না। এই আয়নায় যদি ভদ্রতা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়, তবে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। আর যদি সেখানে দেখা যায় কটু ভাষা, অপপ্রচার ও হিংস্রতা, তবে তা গণতন্ত্রের দুর্বলতারই লক্ষণ। তাই শক্তিশালী গণতন্ত্র
গড়তে চাইলে আগে শক্তিশালী করতে হবে আমাদের নির্বাচনী প্রচারণার ভাষা ও আচরণ।
নির্বাচনী আচরণে প্রার্থী, কর্মী, ভোটার সবার আচরণে পারস্পরিক সৌজন্যতাবোধ বা ভদ্রতা প্রদর্শণ কারো জন্যে কোনো দুর্বলতা প্রকাশের ব্যাপার নয়। এসময় পরস্পরের প্রতি পরস্পরের ভদ্রতা দেখানোই গণতন্ত্রের আসল শক্তি। আসুন পরস্পর কাদা ছোড়াছুঁড়ি না করে নির্বাচনী প্রচারণায় এবং ভোট প্রদান, ভোট গণনা, ফলাফল প্রকাশ, ফলাফল মেনে নেয়া, নতুন সরকার গঠন ও সেই নতুন সরকারকে মেনে নিয়ে সহযোগিতা করা এবং একটি টেকসই নতুন সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামো বিনির্মাণ পর্যন্ত সবাই সহনশীল হই এবং দল মত নির্বিশেষে সবাই ভদ্র আচরণ করি ও অপরের
ভদ্র মতামতকে শ্রদ্ধা করি।
আপতত: সেটাই হবে প্রথম ও প্রধান সংস্কার। যে সংস্কারের জন্য জেনজি সহ দেশের সিংহভাগ মানুষ চাতকের মতো দূর আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে দিন গুণে আসছে। সেটাকে আর অবহেলা কেন?
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]