| |

শিক্ষক সাইফুলের উদ্যোগে লালপুরের প্রথম ‘স্মার্ট’ বিদ্যালয়

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ :

বিদ্যালয়ে শিক্ষক থাকার কথা ছয়জন। এর মধ্যে চারটি পদই শূন্য। প্রধান শিক্ষকের পদটি শূন্য রয়েছে ২০১৩ সাল থেকে। শিক্ষকসংকটের কারণে যেখানে নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে নেওয়াই কঠিন, সেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দময় ও সৃজনশীল শিক্ষার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছেন একজন শিক্ষক। তিনি নাটোরের লালপুর উপজেলার ৯৮ নম্বর বড়বাদকয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম সুইট।

২০২৩ সাল থেকে বিদ্যালয়টিতে নানা সৃজনশীল উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজ করছেন সাইফুল ইসলাম। তাঁর উদ্যোগ এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোসা. নাসিমা খাতুনের সহযোগিতায় বিদ্যালয়ে গড়ে উঠেছে ফুলের বাগান, বিক্রেতাবিহীন সততা স্টোর, পাঠাগার, রিডিং কর্নার, বিজ্ঞান কর্নার, মানবতার দেয়াল এবং ‘ল্যাংগুয়েজ অ্যান্ড ডিবেটিং ক্লাব’। শ্রেণিকক্ষের পাঠকে সহজ ও আনন্দময় করতে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন মডেল ও শিক্ষাসামগ্রী।

১০৪ শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়টির সামনে প্রায় এক কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা। বর্ষায় সেটি কাদায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। শিক্ষকসংকটের পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থার এই দুর্ভোগও বিদ্যালয়টির দীর্ঘদিনের সমস্যা। তবে এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সাইফুল ইসলামের উদ্যোগে বদলেছে বিদ্যালয়ের শেখার পরিবেশ।

শ্রেণিকক্ষে পাঠ, বাইরে শেখার সুযোগ

বিদ্যালয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ে ফুলের বাগান। বারান্দায় টবে সাজানো ফুল ও সবুজ গাছ। প্রাক্-প্রাথমিকের শ্রেণিকক্ষটিও শিশুদের উপযোগী করে সাজানো হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের সততা ও দায়িত্ববোধ শেখাতে চালু করা হয়েছে ‘বিক্রেতাবিহীন সততা স্টোর’। সেখানে কোনো বিক্রেতা নেই। শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে নিজেরাই নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করে। এর মাধ্যমে ছোটবেলা থেকেই সততা ও আত্মনির্ভরতার চর্চা করার সুযোগ পাচ্ছে তারা।

পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে রয়েছে ‘আলোকিত শিশু পাঠাগার’। বিদ্যালয়ে বই পড়ার পাশাপাশি পছন্দের বই বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সুযোগও পায় শিক্ষার্থীরা।

পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ‘রিডিং কর্নার’। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে সহায়ক পাঠ দেওয়া হয়।

মডেলে সহজ হচ্ছে কঠিন বিষয়

পাঠ্যবইয়ের বিষয়গুলো বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করতে বিদ্যালয়ে তৈরি করা হয়েছে বিজ্ঞান কর্নার। সেখানে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ধারণা মডেল ও ব্যবহারিক অনুশীলনের মাধ্যমে শেখানো হয়।

বিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বোঝাতে তৈরি করা হয়েছে থ্রিডি মডেল। লালপুর উপজেলার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা দিতে রয়েছে ‘ট্রাফিক সিস্টেম ম্যানেজমেন্ট’-এর থ্রিডি মডেল।

দিন-রাত, অমাবস্যা ও পূর্ণিমার ধারণা দিতে ব্যবহার করা হয় ‘অমাবস্যা-পূর্ণিমা মডেল’। নামতা শেখানোর উপকরণ, যোগ শেখার ‘যোগ যন্ত্র’, প্রাক্-প্রাথমিকের শিশুদের জন্য ‘সংখ্যা পুকুর’ এবং বর্ণ শেখানোর ‘বর্ণ বৃক্ষ’ও রয়েছে।

‘ম্যাজিক বক্স’-এর মাধ্যমে যুক্তবর্ণ ও বিপরীত শব্দ শেখানো হয়। ‘ট্রাফিক বাতির মডেল’ ব্যবহার করে শিশুদের ট্রাফিক সংকেত ও সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।

এসব উপকরণের বেশির ভাগই শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণে তৈরি। ফলে পাঠ শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকছে না; শিক্ষার্থীরা দেখে, ছুঁয়ে ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় শেখার সুযোগ পাচ্ছে।

মানবিকতার চর্চা

“বন্ধুর প্রতি বাড়িয়ে দাও তোমার হাত” স্লোগানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহমর্মিতা ও সহযোগিতার মানসিকতা গড়ে তুলতে রয়েছে ‘মানবতার দেয়াল’। শিক্ষার্থীরা নিজেদের অতিরিক্ত বা ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী সেখানে রেখে যায়। প্রয়োজন হলে অন্য শিক্ষার্থীরা সেগুলো ব্যবহার করে।

সম্প্রতি চালু হয়েছে ‘ল্যাংগুয়েজ অ্যান্ড ডিবেটিং ক্লাব’। নির্দিষ্ট দিনে শিক্ষার্থীরা উপস্থিত বক্তৃতা, উপস্থাপনা ও বিতর্কে অংশ নেবে। এতে তাদের ভাষাগত দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও যুক্তিভিত্তিক চিন্তার বিকাশ ঘটবে বলে আশা করছেন শিক্ষকরা।

সাইফুল স্যারের নতুন ভাবনা
শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষায় মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান উন্নয়নের জন্যও কাজ করছেন সাইফুল ইসলাম। এ লক্ষ্যে তিনি একটি সমন্বিত শিক্ষামডেল নিয়ে কাজ করছেন। এর নাম ‘READ Integrated Foundational Literacy Framework (RIFLF)’।

ইতোমধ্যে এই মডেলের ওপর তাঁর গবেষণা প্রস্তাবনা জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমিতে (নেপ) পাঠানো হয়েছে। গবেষণাটি বাস্তবায়িত হলে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের বাংলা ও ইংরেজি ভাষার মৌলিক সাক্ষরতা এবং সংখ্যাজ্ঞান উন্নয়নে এটি কার্যকর ও অনুসরণযোগ্য মডেল হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজেও প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছেন সাইফুল। রেজাল্ট তৈরি, রেজাল্ট কার্ড, প্রত্যয়নপত্র ও ট্রান্সফার সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন কাজ অনলাইন স্কুল ম্যানেজমেন্ট অ্যাপের মাধ্যমে করা হচ্ছে।

সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষক ও সুযোগ-সুবিধার সংকট আছে, এটা সত্য। কিন্তু শিশুদের শেখার আগ্রহ তৈরি করতে সব সময় বড় বাজেট লাগে না। নিজেদের উদ্যোগে যতটুকু সম্ভব, সেটুকু দিয়েই শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দময় পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছি। ভবিষ্যতে আরও কিছু কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা আছে।’

শিক্ষার্থীদেরও আগ্রহ বেড়েছে

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. মুনতাসিন আলী বলে, ‘বিজ্ঞানের অনেক অজানা বিষয় এখন সহজে জানতে পারি। থ্রিডি মডেল ও ম্যাজিক বক্সে পড়তে ভালো লাগে। আমরা মজা করে পড়াশোনা করি।’

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোসা. লামইয়া খাতুনের অভিভাবক মোসা. মারুফা আক্তার বলেন, ‘বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও পড়ানোর পদ্ধতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন মেয়েকে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা বলে দিতে হয় না। সে নিজেই যেতে চায়।’

শিক্ষকসংকট এখনো বড় বাধা

সৃজনশীল উদ্যোগের পাশাপাশি বিদ্যালয়টির সবচেয়ে বড় সমস্যা শিক্ষকসংকট। ছয়টি অনুমোদিত পদের মধ্যে চারটিই শূন্য। প্রধান শিক্ষকের পদটি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলছে প্রশাসনিক কার্যক্রম।
পাঠদান স্বাভাবিক রাখতে সম্প্রতি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে দুইজন শিক্ষককে ছয় মাসের জন্য সাময়িকভাবে বিদ্যালয়টিতে সংযুক্ত করা হয়েছে।

লালপুর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. লুৎফর রহমান বলেন, ‘সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সহকারী শিক্ষক সাইফুল ইসলাম শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবান্ধব বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সহযোগিতায় তিনি বিদ্যালয়টিকে আনন্দময় ও স্মার্ট শিক্ষালয়ে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কয়েকবার বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছি। শিক্ষকসংকট থাকলেও শিক্ষার মানের দিক থেকে বিদ্যালয়টি পিছিয়ে নেই।’
তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তাটি পাকা করার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

লালপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোসা. নার্গিস সুলতানা বলেন, ‘সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রত্যন্ত গ্রামের এই বিদ্যালয়টি এগিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষকসংকটের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এরই মধ্যে পাঠদান স্বাভাবিক রাখতে দুইজন শিক্ষককে ছয় মাসের জন্য সাময়িকভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, সৃজনশীল ও শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগ নেওয়ায় শিক্ষক সাইফুল ইসলামকে উপজেলা শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে উৎসাহ দিতে সংবর্ধনা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, উপজেলায় এমন স্মার্ট বিদ্যালয় এই প্রথম।
প্রত্যন্ত গ্রামের বিদ্যালয়টির সামনে কাঁচা রাস্তা, শিক্ষকসংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সাইফুল ইসলামের উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে। প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিক্ষা উপকরণে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পাওয়া গেলে এসব উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.