নাটোর প্রতিনিধি :
দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় পর ইমো হ্যাকিংয়ের অভিযোগে নাটোরের লালপুরে অভিযান চালিয়ে ৪ ইমো হ্যাকারকে আটক করেছে যৌথবাহিনী। শুক্রবার বিকেলে আদালতের মাধ্যমে তাদেরকে নাটোর জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ মার্চ ২০২৫) উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের নওপাড়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
তারা হলেন, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে ইয়াবা সেবন অবস্থায় গ্রেপ্তারকৃতরা ছইমুদ্দিনের ছেলে হ্যাকার উজ্জ্বল (২৩) ও লালন (২১) এবং মোস্তফার ছেলে মাহফুজকে (২০)। এর আগে গ্রামবাসীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত বুধবার (২৬ মার্চ) দিবাগত রাতে প্রতারক চক্র ও ইমো হ্যাকার গ্রুপের অন্যতম সদস্য বিলমাড়িয়া গ্রামের মো. বিলাত হোসেনের ছেলে মো. সোহেল রানা (২৮) নামে একজনকে ৬ টি স্মার্টফোন, ১০টি বাটন ফোন, ১৪টির বেশি রেজিষ্ট্রেশন বিহীন মোবাইল সিমসহ আটক করে লালপুর থানায় সোপর্দ করে সেনাবাহিনী। বৃহস্পতিবার তাকে আদালতের মাধ্যমে নাটোর জেল হাজতে পাঠানো হয়।
লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাজমুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ।
২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর পত্রিকার অনলাইন ও প্রিন্ট সংস্করণে ‘দেশজুড়ে ইমোর মাধ্যমে প্রতারণা কেন্দ্র লালপুর’ প্রধান শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ প্রেক্ষিতে ১৯ সেপ্টেম্বর নাটোরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবু সাঈদ নাটোরের লালপুরে ইমো হ্যাকারদের বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ দেন। এই মামলায় বাদী হবেন উপপরিদর্শকের নিচে নয় এমন একজন কর্মকর্তা।
ওই আদেশে আদালত বলেন, প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নাটোরের লালপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে একটা সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইমো হ্যাক করে প্রতিদিন প্রবাসীসহ বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, যা আমলযোগ্য অপরাধ। এ ধরনের অপরাধ দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারাসহ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৩ ও ৩৪ ধারার অধীনে আমলযোগ্য। এর সর্বোচ্চ সাজা ১৪ বছরের কারাদণ্ড ও ১ কোটি টাকা জরিমানা।
আদালত আদেশে আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কর্মকাণ্ড মূলত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই সংগঠিত অপরাধ। এ ধরনের অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে, মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বেড়ে যাবে। সে কারণে এ ধরনের অপরাধী চক্রকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা সমীচীন বলে আদালত মনে করেন।
জানা যায়, লালপুরের কোনো এক ব্যক্তি ২০১৮ সালে এক প্রবাসীর ইমো নম্বরের দখল নিয়ে প্রতারণা করে বেশ কিছু টাকা আদায় করেন। এরপর তিনি দল ভারী করে এ কাজে নেমে পড়েন। তাঁর দেখাদেখি শুরু হয় প্রতারণার কাজ। এখন লালপুরের পাশের অনেক তরুণ-যুবকও এ কাজে নেমে পড়েছেন। র্যাব-৫-এর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইমো অ্যাপ হ্যাকিংয়ের অভিযোগে যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের বাড়ি লালপুরের মোহরকয়া, চকবাদকয়া, পাইকপাড়া, বিলমাড়িয়া ভাঙাপাড়া, পুরোনো বাজার, রামকৃষ্ণপুরের মোহরকয়া নতুনপাড়া, মনিহারপুর, বিলমাড়িয়া, নাগশোষা, মোহরকয়া পূর্বপাড়া, রামপাড়া, নওপাড়া গ্রামে। এই গ্রামগুলো পাশাপাশি। ওই সব গ্রামের শিক্ষিত-অশিক্ষিত, এমনকি গৃহিণীরাও ইমো প্রতারণার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। গ্রামে আগে যাঁরা দিনমজুর ছিলেন, প্রতারণার আয়ে তাঁদের জীবন বদলে গেছে। বর্তমানে উপজেলার অনেক উঠতি বয়সী কিশোর, যুবক ও ঝরে পড়া স্কুল শিক্ষার্থীরা ইমো হ্যাকিংয়ে জড়িত।
অভিযোগ আছে, জনপ্রতিনিধিদের ছত্রছায়া আর প্রশাসনের নিরবতায় লালপুরে নির্ভয়ে ইমো হ্যাকিং চলে আসছে। গণমাধ্যমে ইমো হ্যাকিং নিয়ে সংবাদ প্রচার হলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় হ্যাকিং কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে রহস্যময় কারণে অভিযান বন্ধ হয়ে গেলে হ্যাকিং কার্যক্রম দ্রুত পাশ্ববর্তী ইউনিয়ন ও উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ে।
লালপুরের এক ইলেকট্রিশিয়ান বলেন, তাদের গ্রাম ও পাশের গ্রামের ঝরে পড়া অনেক শিক্ষার্থী, ইজিবাইক ও পাওয়ার টিলার চালকরা ইমো হ্যাকিং করে এখন কোটিপতি। সেই টাকায় তারা উচ্চমূল্যে জমি, দামি গাড়ি, বিলাসবহুল বাড়ি করেছে। অথচ ১ বছর আগেও তারা কিংবা তাদের অভিভাবকরা দিন মজুর ও ভ্যান চালানো কাজ করতো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন হ্যাকার বলেন, তারা সাধারণত প্রবাসী ও ধনী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রথমে সামাজিক মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপন করে কৌশলে তাদের ইমো কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হ্যাক করে অর্থ হাতিয়ে নেন। এক্ষেত্রে তারা বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং হিসেব নম্বর ব্যবহার করে থাকেন। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্টরা শতকরা ২০ থেকে ৩০ ভাগ কমিশনে হ্যাকারদের টাকা উত্তোলনে সাহায্য করেন। আরেকজন হ্যাকার বলেন, হ্যাকিংয়ের সাথে স্থানীয় ইউপি সদস্য ও গ্রাম পুলিশরাও জড়িত। প্রতি মাসে তাদের চাঁদা দিতে হয়।