মঙ্গলবার | ২০ জানুয়ারি, ২০২৬ | ৬ মাঘ, ১৪৩২

লালপুরে জলাবদ্ধ বসন্তপুর বিলের ১০ হাজার বিঘা জমি, আশ্বাসে পার এক যুগ

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ :

নাটোরের লালপুরে বসন্তপুর বিলের পানি নিষ্কাশন খালের মুখে অবৈধভাবে পুকুর খনন করায় সৃষ্ট জলবদ্ধতায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অনাবাদিভাবে পড়ে আছে বিলের ১০ হাজার বিঘা জমি। বিগত বছরে কয়েকবার বিলের পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নিলেও হয়নি কার্যকর কোন সমাধান। এতে বিলে জন্মেছে কচুরিপানা ও জলজ আগাছা। ফলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বিলে ফসল উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কৃষক ও শ্রমিকরা। এদিকে চলতি মৌসুমেও বোরো ধানের আবাদ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।  কৃষকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের আশ্বাস পেলেও হয়নি কোন সমাধান। পানি নামার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় জমিতে চাষাবাদ করতে পারছেন না তারা। তিন ফসলি জমি থাকলেও মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,  প্রায় ১০ কি.মি দীর্ঘ ও ৩ কি.মি চওড়া বিশাল এ বিলের পানি নিষ্কাশনের জন্য নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দুড়দুড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান আজিজুল আলম এলাকাবাসীকে উদ্বুদ্ধ করে তাঁদের জমিতে সরকারি ব্যয়ে একটি খাল খনন করেছিলেন। বর্ষাকালে এই খাল হয়ে বিলের পানি পার্শ্ববর্তী রঘুনাথপুর, হাসিমপুর ও আকবর পুর হয়ে আরেকটি খালের মাধ্যমে নাটোরের চন্দনা নদীতে পড়তো। তখন থেকে এই বিলে বছরে ৩টি করে ফসল উৎপাদিত হতো। অনাবাদি থাকতো না এক ইঞ্চি জমি। বিলের চারপাশে বসবাসকারী ২০ টি গ্রামের মানুষের কাছে বিলটি হয়ে উঠেছিল আশীর্বাদ।
কিন্তু ২০১২ – ২০১৩ সাল থেকে বিলে কয়েকজন প্রভাবশালী সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অবৈধভাবে পুকুর খনন শুরু করলে  বন্ধ হয়ে যায় বিলের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। এতে বিপাকে পড়েন বিলে আবাদকারী কৃষকেরা।
২০১৯ সালের ২৪ মার্চ বিলের ফসলি জমিতে অবৈধভাবে পুকুর খনন বন্ধ ও জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে লিখিত অভিযোগ, উপজেলা পরিষদ চত্বরে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করে এলাকাবাসী। ২০১৯ সালের ১২ মে হাইকোর্ট একটি রিট শুনানি করে উপজেলার কৃষি জমিতে পুকুর খনন বন্ধে নির্দেশ দিলেও বন্ধ করা যায়নি অবৈধ পুকুর খনন। ২০২০ সালের ২৪ আগস্ট লালপুরের তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মুল বানীন দ্যূতি ভুক্তভোগী চাষিদের দিয়ে ৪২টি পুকুরের পাড় কেটে সাময়িক পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেন। স্থায়ীভাবে পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ২০২২ সালের ১ মার্চ নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বকুল বসন্তপুর বিলের সঙ্গে চন্দনা নদীর সংযোগ খাল সংস্কারের জন্য প্রায় এক কোটি টাকার একটি প্রকল্প উদ্বোধন করেন। কিন্তু বিলের ১ কি.মি খাল খনন করার পর ব্যক্তি মালিকানাধীন ১.৫ কি.মি জমি সরকারিভাবে অধিগ্রহণ না করায় বাকি অংশে আর খাল খনন করা সম্ভব হয়নি। ফলে বর্ষাকালে পানি বন্দি হয়ে পড়ে বিলের চারপাশের ২০ টি গ্রাম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন পানিবন্দী থাকায় এলাকার মানুষ চর্মরোগ ও পানিবাহিত বিভিন্ন রোগব্যধিতে আক্রান্ত হয়। অনেক সময় ঘটে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা।
ভুক্তভোগী চন্ডিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক  (অব:) নজরুল ইসলাম বলেন, “বিলে আমাদের পরিবারের ৫০ বিঘা জমি রয়েছে। জলাবদ্ধতার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আবাদ করতে পারছি না। বারবার প্রশাসনের কাছে ধরনা দিয়ে শুধু আশ্বাস পাই কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না।”
গন্ডবিল গ্রামের মোঃ বেলাল হোসেন (৪৩) বলেন , “জলাবদ্ধতা নিরসনে আন্দোলন, মানববন্ধন, লিখিত আবেদন করলেও কার্যকর সমাধান হয়নি। গত বছর  বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর রাজশাহী জেলা বিএনপির আহবায়ক আবু সাঈদ চাঁদ ও বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহদপ্তর সম্পাদক এড. তাইফুল ইসলাম টিপুর উদ্যোগে  ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাঘা ও লালপুর উপজেলা প্রশাসন সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় বিলের ২৬টি পুকুরের পাড় কেটে অস্থায়ীভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেছিল। সে সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল,  বিএডিসির (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন)  পানাসি সেচ প্রকল্পের অধীনে প্রকল্প গ্রহণ করে স্থায়ী সমাধান করা হবে। তবে অজানা কারণে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
দুড়দুড়িয়া গ্রামের কৃষক রিপন আলী (৫০) বলেন, জলাবদ্ধতার ভয়াবহতা শুধু কৃষিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে বিলসংলগ্ন স্কুল ও গ্রামগুলো পানিতে ডুবে যায়। বন্ধ হয়ে যায় পাঠদান। পানিবন্দী অবস্থায় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে ডায়রিয়া ও চর্মরোগসহ নানা পানিবাহিত রোগ। কখনো কখনো পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। জলাবদ্ধতার কারণে বাধ্য হয়ে আমিও পুকুর খনন করেছি। তবে খাল খনন করা হলে সকলের জন্যই উপকার হবে।”
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রীতম কুমার হোড় বলেন, ” অবৈধভাবে পানি নিষ্কাশন  খালের মুখে পুকুর খনন করায় বিলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ ব্যাপারে বিএডিসি বড়াইগ্রাম জোনের সহকারী প্রকৌশলী মো. জিয়াউল হক বলেন, এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কোন নির্দেশনা পায়নি। নির্দেশনা পেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)  মো. জুলহাস হোসেন সৌরভ জানান, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তবে এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে ।
এক যুগ ধরে আশ্বাসেই আটকে থাকা বসন্তপুর বিলের জলাবদ্ধতা আজ শুধু কৃষকের দুর্দশা নয়—এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। স্থায়ী সমাধান না হলে এই বিল ও বিলপাড়ের মানুষের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.