
-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
শিক্ষা মানুষের জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী রূপান্তরমূলক শক্তি। কিন্তু এই শিক্ষা যদি আনন্দহীন, একঘেয়ে এবং ভীতিকর হয়ে ওঠে, তাহলে তা কেবল পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তাহলে মানুষ গড়ার কাজটি আর সম্পূর্ণ হয় না। বর্তমান সময়ে তাই ‘আনন্দময় শিক্ষা’ একটি অপরিহার্য ধারণা হিসেবে সামনে এসেছে। এটি এমন এক শিক্ষাপদ্ধতি, যেখানে শেখা মানে কৌতূহল, অনুসন্ধান, অংশগ্রহণ এবং আনন্দ। তবে এই ধারণা কেবল আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এর বাস্তবায়নের জন্য এখনই বিনিয়োগ করা সময়ের দাবি।
নবগঠিত বিএনপি সরকারের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী ও ভবিষ্যতমুখী করে তোলা। বিশ্ব দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে রূপান্তরিত হচ্ছে, যেখানে জ্ঞান, দক্ষতা এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতা উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষাখাতে প্রযুক্তির সংযুক্তি শুধু একটি আধুনিকায়ন উদ্যোগ নয়, বরং জাতীয় অগ্রগতির পূর্বশর্ত। তাই বিএনপি সরকারের ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মসূচিতে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বলতে কেবল ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার বোঝায় না। এটি একটি সামগ্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে শিক্ষার পদ্ধতি, পাঠ্যবস্তু, মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতা সবকিছুই আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় পুনর্গঠিত হয়। অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম, স্মার্ট ক্লাসরুম, ইন্টারাক্টিভ কনটেন্ট এবং ভার্চুয়াল ল্যাবের মতো উপকরণ শিক্ষার্থীদের শেখাকে আরও সহজ, আকর্ষণীয় এবং কার্যকর করে তোলে। ফলে তারা শুধু তথ্য মুখস্থ না করে তা বিশ্লেষণ, প্রয়োগ এবং সৃজনশীলভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়।
সরকারের সামনে ১৮০ দিনের কর্মসূচির মধ্যে এই ধরনের একটি রূপান্তরমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। তবে এর তাৎপর্য এখানেই যে, এটি একটি ভিত্তি স্থাপনের প্রচেষ্টা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যে ডিজিটাল বৈষম্য বিদ্যমান, বিশেষ করে শহর ও গ্রামের মধ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে যে ফাঁরাক তৈরী হয়েছে তা দূর করার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পাবে।
এছাড়া, এই কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু পরিকল্পনা নয়, বরং কার্যকর বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং সুসংগঠিত ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। অন্যথায় এই উদ্যোগ কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি রয়েছে।
আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষাকেন্দ্রিক। এখানে শিক্ষার্থীদের সাফল্য নির্ধারিত হয় নম্বরের ভিত্তিতে, তাদের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা বা মানসিক বিকাশের ভিত্তিতে পুরোপুরি তৈরী হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা শেখার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয় এবং পড়াশোনা তাদের কাছে চাপ হিসেবে পরিগণিত হয়। এই বাস্তবতায় আনন্দময় শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু এই পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত বিনিয়োগ, যা হবে দীর্ঘমেয়াদি এবং টেকসই চরিত্রের। এজন্য যেসব বিষয়গুলোকে গুরুত্ত্ব দিতে হবে তা নিম্নরূপ:
প্রথমত, শিক্ষক উন্নয়নই আনন্দময় শিক্ষার মূল চাবিকাঠি। একজন দক্ষ ও অনুপ্রাণিত শিক্ষক একটি শ্রেণিকক্ষকে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষকরা এখনও প্রচলিত লেকচারভিত্তিক পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাদেরকে নতুন শিক্ষণ কৌশল, যেমন, অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা, সমস্যা-সমাধানভিত্তিক শিক্ষা এবং প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষার ওপর প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে নিয়মিত এবং মানসম্মত করতে যথাযথ অর্থায়ন প্রয়োজন। শিক্ষককে কেবল পাঠদাতা নয়, বরং একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পাঠ্যক্রমে মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি। আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে পাঠ্যক্রমকে বাস্তবজীবনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন বইয়ের জ্ঞানকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারে, সে সুযোগ তৈরি করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, বিজ্ঞান শিক্ষা কেবল তত্ত্বে সীমাবদ্ধ না রেখে পরীক্ষাগারভিত্তিক করা, কিংবা সামাজিক বিজ্ঞানকে প্রকল্প ও গবেষণার মাধ্যমে শেখানো যেতে পারে। এই ধরনের পাঠ্যক্রম
উন্নয়নে গবেষণা ও পরিকল্পনার জন্য বিনিয়োগ অপরিহার্য।
তৃতীয়ত, শিক্ষার পরিবেশকে আকর্ষণীয় ও উপযোগী করে তোলা প্রয়োজন। একটি সুন্দর, আলোকিত এবং সুসজ্জিত শ্রেণিকক্ষ শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনও পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলের স্কুলগুলোতে এই সমস্যা প্রকট। তাই অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহ এবং প্রযুক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
চতুর্থত, প্রযুক্তির ব্যবহার আনন্দময় শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে। ডিজিটাল কনটেন্ট, মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপনা এবং অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করে। তবে প্রযুক্তির সুবিধা যেন কেবল শহরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ, ডিভাইস সরবরাহ এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ জরুরি।
পঞ্চমত, মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। শুধুমাত্র লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা মূল্যায়ন করা যায় না। বরং ধারাবাহিক মূল্যায়ন, উপস্থাপনা, দলগত কাজ এবং সৃজনশীল প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের সামগ্রিক বিকাশ মূল্যায়ন করা উচিত। এই নতুন পদ্ধতি চালু করতে হলে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং প্রশাসনিক সহায়তা প্রয়োজন, যা নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ অপরিহার্য।
ষষ্ঠত, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা এবং চাপ এত বেশি যে অনেক শিক্ষার্থী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আনন্দময় শিক্ষা এই চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। স্কুলে কাউন্সেলিং সেবা চালু করা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি করা এবং শিক্ষার্থীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিনিয়োগ প্রয়োজন।
সপ্তমত, অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। অনেক অভিভাবক এখনও মনে করেন যে বেশি নম্বরই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি। এই ধারণা পরিবর্তন না হলে আনন্দময় শিক্ষা বাস্তবায়ন কঠিন হবে। তাই অভিভাবকদের জন্য সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন করতে হবে, যাতে তারা বুঝতে পারেন যে শেখার আনন্দ এবং দক্ষতা অর্জনই প্রকৃত সাফল্যের ভিত্তি।
অষ্টমত, নীতিনির্ধারকদের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, কার্যকর নীতি প্রণয়ন এবং সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোকেও এই উদ্যোগে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব নয়। আনন্দময় শিক্ষা আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের একটি প্রয়োজনীয়তা। একটি জাতিকে এগিয়ে নিতে হলে তার শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী, সৃজনশীল এবং মানবিক করে তুলতে হবে। আর এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য এখনই বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। আমরা যদি আজ এই খাতে সঠিকভাবে বিনিয়োগ করি, তাহলে ভবিষ্যতে একটি দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী এবং মানবিক প্রজন্ম গড়ে উঠবে।
একটি আনন্দময় শিক্ষাব্যবস্থার জন্য সুগভীর চিন্তা ও মাঠ পর্যায়ের গবেষণাপ্রসূত ফলাফলের ভিত্তিতে তৈরী একটি টেকসই পরিকল্পনা ও জরুরি বিনিয়োগ প্রয়োজন। আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে পাঠ্যক্রমকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে তা বাস্তবজীবনের সঙ্গে সংযুক্ত হয় এবং শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এই ধরনের পাঠ্যক্রম উন্নয়নে গবেষণা, পাইলট প্রকল্প এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ অপরিহার্য।
আমাদের দেশের অনেক অভিভাবক এখনও মনে করেন যে বেশি নম্বরই সফলতার একমাত্র পথ। ফলে তারা সন্তানদের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করেন, যা আনন্দময় শিক্ষার পথে বড় বাধা। অভিভাবকদের বোঝাতে হবে যে শেখার আনন্দ এবং দক্ষতা অর্জনই প্রকৃত সাফল্যের ভিত্তি। এ জন্য সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং কমিউনিটি ভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।
এছাড়া শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের শিশুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে তারা সমানভাবে আনন্দময় শিক্ষার সুযোগ পায়।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য আনন্দময় শিক্ষা যেহেতু একটি বিশেষ প্রয়োজন সেহেতু একটি সৃজনশীল, দক্ষ এবং মানবিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে শিক্ষাকে আনন্দময় এবং অর্থবহ করে তুলতেই হবে। তাই এখনই সময়, আমরা শিক্ষা ব্যবস্থায় টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করি এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করি। এতে করে আমরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব, যা শুধু জ্ঞান অর্জনের সাথে সাথে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং মূল্যবোধও প্রদান করবে।
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা গড়ে তোলার যে অঙ্গীকার নবগঠিত বিএনপি সরকার তাদের ১৮০ দিনের কর্মসূচিতে তুলে ধরেছে, তা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে কতটা দক্ষতার সঙ্গে এটি বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর। ১৮০ দিন একটি স্বল্প সময় হলেও এই সময়ের মধ্যে একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব, যা ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথ সুগম করতে পারে।
অতএব, নবগঠিত বিএনপি সরকারের সামনে সময় ও সুযোগ এসেছে শুধু পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার। আনন্দময় শিক্ষার যে স্বপ্ন আমরা লালন করি, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সাহসী সিদ্ধান্ত, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ আমাদের ভবিষ্যতের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। এখনই যদি আমরা এই উদ্যোগ গ্রহণ করি, তবে একটি আলোকিত, সমৃদ্ধ এবং মানবিক সমাজ গঠন করা সম্ভব হবে।
*প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন।
E-mail: [email protected]