
ঈশ্বরদী প্রতিনিধি:
ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র–এর প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিংয়ের মধ্য দিয়ে দেশের পারমাণবিক শক্তির যুগে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হচ্ছে। এই কেন্দ্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতে গ্রহণ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বহুস্তরীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা।
প্রকল্পের নিরাপত্তা ও কারিগরি দিক নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে সোমবার(৪ মে) নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জয়েদুল হাসান জানান, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা–এর মানদণ্ড অনুসারে রূপপুরে ‘পাঁচ স্তরের’ নিখুঁত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়েছে VVER-1200 প্রযুক্তির অত্যাধুনিক তৃতীয় প্রজন্মের (প্লাস) রিয়্যাক্টর, যা রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটম–এর নকশায় নির্মিত। আইএইএ’র সুপারিশ অনুযায়ী এখানে ‘ডিফেন্স-ইন-ডেপথ’ বা বহুস্তরীয় সুরক্ষা নীতির মাধ্যমে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
ড. জায়েদুল হাসান বলেন, রিয়্যাক্টরে উন্নতমানের অ্যাকটিভ সেফটি সিস্টেম রয়েছে, যা জরুরি পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চুল্লি বন্ধ (শাটডাউন) করে কোরকে শীতল রাখতে সক্ষম। পাশাপাশি প্যাসিভ সেফটি সিস্টেম বিদ্যুৎ সরবরাহ বা মানবীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। এর সঙ্গে রয়েছে ডাবল কনটেইনমেন্ট স্ট্রাকচার, কোর ক্যাচার এবং হাইড্রোজেন রিকম্বাইনার—যা সম্ভাব্য দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে।
তিনি আরও বলেন, ফুকুশিমা পারমাণবিক দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রূপপুর প্রকল্পে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংযোজন করা হয়েছে। এমনকি সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন পরিস্থিতিতেও চুল্লিকে নিরাপদ অবস্থায় রাখার সক্ষমতা এই প্রযুক্তির রয়েছে।
নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের জন্য প্ল্যান্টে যুক্ত করা হয়েছে সাত হাজারেরও বেশি স্বয়ংক্রিয় ইন্টারলক ও সেফটি ফাংশন। কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে এসব ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে চুল্লিকে নিরাপদভাবে বন্ধ করতে সক্ষম। এমনকি চরম জরুরি পরিস্থিতিতে প্ল্যান্টে কোনো অপারেটর উপস্থিত না থাকলেও সিস্টেম নিজে থেকেই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবে।
এ ছাড়া কেন্দ্রটির সার্বিক কার্যক্রম ২৪ ঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। নির্ধারিত সময় অন্তর নিরাপত্তা বিশ্লেষণ প্রতিবেদনও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে।
রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে উল্লেখ করে ড. জায়েদুল হাসান বলেন, এত বড় পরিসরের পারমাণবিক প্রকল্পের অর্থায়ন ছিল অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। তবে রোসাটম–এর সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণচুক্তির মাধ্যমে সে চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করা হয়েছে।
নির্মাণ পর্যায়ে প্রকল্প এলাকার মাটি স্থিতিশীল করাও ছিল বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাটির গভীরে সিমেন্ট ইনজেকশন দেওয়া হয়, ফলে মাটি পাথরের মতো দৃঢ় ভিত্তিতে রূপ নেয়।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ–এর কারণে আর্থিক লেনদেন ও যন্ত্রপাতি পরিবহনে জটিলতা তৈরি হয়। পাশাপাশি COVID-19 মহামারি–ও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা ও কঠোর স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে।
পারমাণবিক বর্জ্য সম্পর্কে জাহেদুল হাসান বলেন, সাধারণত প্রায় এক বছর পরিচালনার পর ব্যবহৃত জ্বালানি (স্পেন্ট ফুয়েল) চুল্লি থেকে বের করা হয়। এটি চুল্লির কাছাকাছি বিশেষভাবে নকশা করা পুলে (স্পেন্ট ফুয়েল পুল) সংরক্ষণ করা হবে। এই পুলে প্রায় ১০ বছর পর্যন্ত নিরাপদে বর্জ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার আওতায় দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহৃত জ্বালানির পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ বা ফেরত পাঠানো নিশ্চিত করা হবে।