মঙ্গলবার | ৫ মে, ২০২৬ | ২২ বৈশাখ, ১৪৩৩

শিরোনাম
বড়াইগ্রামে ছেলের ছুরিকাঘাতে মায়ের মৃত্যু লালপুরে ট্রাকচাপায় নিহত মোটরসাইকেল চালক রক্তে রাঙা শহীদ সাগর বহন করছে গণহত্যার স্মৃতি, আজও পায়নি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি  রসাটমের “আইসব্রেকার অব নলেজ” প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের আর্কটিক অভিযানের সুযোগ বাউয়েটে গবেষণা ও প্রকাশনার মাধ্যমে একাডেমিক উৎকর্ষতা শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত দুর্ঘটনা ঠেকাতে রূপপুর পারমাণবিকে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অটিজম আক্রান্তদের জন্য লন্ডন বিমানবন্দরে এমিরেটসের ট্রাভেল রিহার্সাল লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশ হবে নারীদের জন্য  – ফারজানা শারমীন খাল পুনঃখননের মধ্য দিয়ে লালপুর-বাগাতিপাড়ায় উন্নয়নের নতুন যাত্রা শুরু : প্রতিমন্ত্রী পুতুল ১৭ বছরের ধ্বংসাবশেষ থেকে বাংলাদেশকে তুলে আনতে চাই – লালপুরে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী পুতুল

রক্তে রাঙা শহীদ সাগর বহন করছে গণহত্যার স্মৃতি, আজও পায়নি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি 

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ :

১৯৭১ সালের ৫ মে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নাটোরের লালপুরে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেড (নবেসুমি) এলাকায় সংঘটিত হয় দেশের অন্যতম নৃশংস গণহত্যা। পাক হানাদার বাহিনী সেদিন মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শ্রমিক ও স্থানীয় মানুষসহ অর্ধশতাধিক নিরস্ত্র বাঙালিকে মিলের ভেতরের একটি পুকুরের সিঁড়িতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে। রক্তে লাল হয়ে যাওয়া সেই পুকুরই পরবর্তীতে পরিচিতি পায় ‘শহীদ সাগর’ নামে।
মঙ্গলবার (৫ মে ২০২৬) নবেসুমি শহীদ সাগর গণহত্যা দিবস উপলক্ষে মিল প্রাঙ্গণে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। কর্মসূচির মধ্যে ছিল ফাতেহা পাঠ, পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা, মিলাদ মাহফিল, খতমে কোরআন, শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা ও কাঙালি ভোজ।
শহীদ সাগর চত্বরে আয়োজিত স্মরণসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল।
তিনি বলেন, “নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা গেলে এ অঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। শুধু চিনি উৎপাদন নয়, অতীতে চালু থাকা বিভিন্ন বায়ো-প্রোডাক্ট কার্যক্রমও পুনরায় চালু করা সম্ভব হলে মিলটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বাড়বে।”
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে হবে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের উন্নয়নে কাজ করতে হবে।” তিনি মিল পরিচালনায় দুর্নীতি, অনিয়ম ও চাকরি দেওয়ার নামে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও জানান।
অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবারের সদস্যদের পক্ষে ফরহাদুজ্জামান রুবেল, মামুন ও শাহিন বক্তব্য দেন। তারা অভিযোগ করে বলেন, স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও শহীদ সাগরের শহীদরা এখনো যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। দ্রুত তাদের সরকারি তালিকাভুক্তি ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানান তারা।
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ফরিদ হোসেন ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জুলহাস হোসেন সৌরভ, লালপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হারুনার রশিদ পাপ্পু, যুগ্ম আহ্বায়ক সিদ্দিক আলী মিষ্টু, গোপালপুর পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও সাবেক মেয়র নজরুল ইসলাম মোল্লা, লালপুর থানার অফিসার ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। শেষে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে শহীদ সাগরের নিরাপত্তা কর্মী আব্দুর রশিদ জানান, গণহত্যার সেই বিভীষিকাময় ঘটনার সাক্ষী হয়ে এখনো সিঁড়ির বিভিন্ন স্থানে বুলেটের চিহ্ন রয়ে গেছে। সেসব স্থানে লাল রঙ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে দাঁড়ালেই গা শিউরে ওঠে।
জানা যায়, এই গণহত্যায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন নাটোরের মেজর শেরওয়ানী, ক্যাপ্টেন মোখতার এবং ঈশ্বরদীর মেজর উইলিয়াম। মূলত ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ লালপুর উপজেলার ময়না গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ২৫ নম্বর রেজিমেন্ট বিপর্যস্ত হয় এবং মেজর আসলাম নিহত হন। সেই ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই পাকবাহিনী নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলকে টার্গেট করে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
গণহত্যা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া খন্দকার জালাল আহাম্মেদ ২০২১ সালের এক সাক্ষাৎকারে ভয়াবহ সেই দিনের বর্ণনা দেন। তিনি জানান, ৫ মে সকালে গোপালপুর বাজারে গোলাগুলির পর পাকিস্তানি সেনারা মিলে ঢুকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিএম অফিসের সামনে জড়ো করে। পরে বাঙালি মেসের সামনে উপুড় করে শুইয়ে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়—“মেজর আসলামকো কোন মারা হ্যায়?”
মিলের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক লে. এম এ আজিম সেনাদের বলেন, “মেজর আসলামকে সুগার মিলের কেউ মারেনি।” কিন্তু তাতেও রক্ষা হয়নি।
খন্দকার জালাল আহাম্মেদ বলেন, পরে সবাইকে শহীদ সাগরের সিঁড়িতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয়। তাঁর ছোট ভাই আব্দুল মান্নান ভীত কণ্ঠে জানতে চেয়েছিলেন, “ভাই, তারা কি আমাদের মেরে ফেলবে?” কিছুক্ষণ পরই কমান্ডারের নির্দেশে চারদিক থেকে বৃষ্টির মতো গুলি শুরু হয়। তিনি লাশের নিচে চাপা পড়ে গুরুতর আহত অবস্থায় বেঁচে গেলেও তাঁর ছোট ভাই আর ফিরে আসেননি। বাবা খন্দকার এমাজ উদ্দিনও পরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
এই গণহত্যায় শহীদ হন মিলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, কৃষি কর্মকর্তা, নিরাপত্তা প্রহরী, শ্রমিক, মেশিনম্যান, খালাসিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন লে. (অব.) আনোয়ারুল আজিম, সহিদুল্লাহ, গোলজার হোসেন তালুকদার, সাইফুদ্দিন আহমদ, আবুল হোসেন, আবদুর রউফ, খন্দকার আব্দুল মান্নান ভূইয়া, গোলাম কিবরিয়া, মো. নূরুল হক, আজহার আলী, মকবুল হোসেন, আবুল বাসার খান, মনসুর রহমান, সাজেদুর রহমান, খন্দকার ইসমাইল হোসেন, হাবিবুর রহমান, মোসাদ্দারুল হক, মোকসেদুল আলম, আব্দুর রহমান আমিন, মোহাম্মদ আলী, মোজাম্মেল হক, আব্দুল মান্নান তালুকদার, ফিরোজ মিয়া, আকতার উদ্দিন, সোহরাব আলী, আনোয়ারুল ইসলাম, পরেশ উল্লাহ, কামাল উদ্দিন, আবুল কাসেম, আব্দুর রব, শামসুল হুদা, এস এম নজরুল ইসলাম, তোফায়েল প্রামানিক, মোসলেম উদ্দিন, শহীদুল্লাহসহ আরও অনেকে। অনেক শহীদের নাম আজও অজানা রয়ে গেছে।
সেদিন গুলিবিদ্ধ লাশের স্তুপ থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন খন্দকার জালাল আহাম্মেদ, মেহমান আলী, নওসাদ আলী, খোরশেদ আলম, খন্দকার ইমাদ উদ্দিন আহম্মেদ, ইঞ্জিন সরদার, আব্দুল জলিল সিকদার, তোফাজ্জল হোসেন ও আজের উদ্দিন মাল। বর্তমানে তাঁদের কেউ আর জীবিত নেই।
স্বাধীনতার পর শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি গোপালপুর স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে ‘আজিমনগর’ রাখা হয়। একই বছরের ৫ মে শহীদ লে. এম এ আজিমের স্ত্রী শামসুন্নাহার আজিম ৪২ জন শহীদের নাম খোদাই করা স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে ২০০০ সালের ৫ মে উদ্বোধন করা হয় শহীদ স্মৃতি জাদুঘর এবং প্রকাশ করা হয় স্মারক ডাকটিকিট। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরিদর্শন বইয়ে শামসুন্নাহার আজিম লিখেছিলেন, “স্বাধীনতার জন্য নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের বুকচিরে এক পুকুর রক্তদানের স্বীকৃতি এই জাদুঘরের মাধ্যমে দেওয়া হলো।”
২০০০ সাল থেকে দিনটিকে দেশের সব চিনিকলে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে।

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.