বুধবার | ২২ জুলাই, ২০২৬ | ৭ শ্রাবণ, ১৪৩৩

লালপুরের পরিবেশ, সংস্কৃতি ও বজ্রপাত সুরক্ষায় তালগাছ

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ :
গ্রামীণ বাংলার প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও জনজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তালগাছ। সুর, তাল ও লয়ের মিল না থাকলে যেমন গান শ্রুতি মধুর হয় না, তেমনি তালগাছ ছাড়া গ্রামীণ জীবনও যেন অসম্পূর্ণ। এক সময় নাটোরের লালপুরে প্রায় প্রতিটি গ্রামে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এ বৃক্ষ এখন আগের তুলনায় অনেকটা কমে গেছে। অথচ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, লোকজ সংস্কৃতির ধারক ও বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে তালগাছের গুরুত্ব তুলে ধরছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাত একটি বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ. এন. এম. ফখরুদ্দিন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের ফলে বজ্রপাত বাড়ছে। গ্রামীণ এলাকায় তালগাছের মতো উঁচু দেশীয় বৃক্ষ বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
লালপুর থানা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের মে মাসে উপজেলায় বজ্রপাতে ২ জন নিহত ও ২ জন আহত হয়েছেন।
উপজেলার রক্তিম আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক এ. এইচ. এম. কামরুজ্জামান রাসেল বলেন, আমাদের গ্রামে দুই দিনে দুটি পৃথক তালগাছে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়দের মতে, বজ্রপাত তালগাছে আঘাত হানায় আশপাশের বসতবাড়ি ও মানুষ বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ ও জননিরাপত্তা বিবেচনায় তালগাছ রোপণ ও সংরক্ষণ করা উচিত।
তালগাছ শুধু পরিবেশের জন্যই নয়, গ্রামীণ অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গেও নিবিড়ভাবে জড়িত। এর পাতা দিয়ে তৈরি হয় ঘরের ছাউনি, হাতপাখা, চাটাই, মাদুর, খেলনা ও বিভিন্ন হস্তশিল্প। কাণ্ড দিয়ে তৈরি হয় ঘর, সাঁকো ও নৌকা। তালের রস থেকে উৎপাদিত হয় গুড়, পাটালি, মিছরি ও মিষ্টান্ন। কচি তালশাঁস গরমের দিনে জনপ্রিয় খাদ্য, আর পাকা তাল দিয়ে তৈরি হয় বড়া, পিঠা, পায়েস, ফুলুরি ও নানা ঐতিহ্যবাহী খাবার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আব্দুজ জাহের বলেন, তালে ভিটামিন এ, বি ও সি, ক্যালসিয়াম, আয়রন, জিংক, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. আনোয়ারুল আজিম বাপ্পি বলেন, পরিমিত পরিমাণে তাল ও তালের রস শরীরের শক্তি জোগাতে, হজমশক্তি বাড়াতে ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
বাংলা সাহিত্য, গান ও লোকসংস্কৃতিতে তালগাছের রয়েছে বিশেষ স্থান। ‘তালপাতার সেপাই’ ও ‘তাল পাকলে কাকের কী’ এমন বহু প্রবাদ আজও মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত। বাবুই পাখির নিরাপদ আবাস হিসেবে তালগাছ সুপরিচিত। প্রবাদ আছে – তালে তাল না মিলালে সমাজে দাওয়াত মিলেনা। তাই সমাজে এখন তাল মিলানো মানুষের সংখ্যাই বেশি।
এদিকে পরিবেশ ও ঐতিহ্য রক্ষা এবং বজ্রপাত রোধে তালগাছ রোপনের দাবি জানিয়েছেন উপজেলার পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রীন ভয়েসের সভাপতি সজিবুল হৃদয়। তবে এ বিষয়ে বর্তমানে কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. বরকত উল্লাহ। এছাড়া উপজেলায় মোট কতটি তালগাছ আছে তার কোন তথ্য উপজেলা বন বিভাগের কাছে নেই বলে জানিয়েছেন উপজেলা বন কর্মকর্তা এ.বি.এম. আব্দুল্লাহ।

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.