| |

ভালো ছাত্রদের প্রতি এক নীরব লয়্যালিটি

-আমিনুল ইসলাম শামীম।।

Cost of Loyalty — অষ্টম পর্ব

ভালো ছাত্রদের প্রতি এক নীরব লয়্যালিটি।

ছোটবেলা থেকেই এলাকার ভালো ছাত্রদের প্রতি আমার এক ধরনের নীরব লয়্যালিটি ছিল। নিজের সহপাঠীদের মধ্যে যারা ভালো পড়াশোনা করত, স্কুল জীবনে,কলেজ জীবনে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বিভিন্ন বিভাগের যারা অসাধারণ রেজাল্ট করত—তাদের প্রতি আমার একটা আলাদা আকর্ষণ কাজ করত।

নিজে খুব বেশি পড়াশোনামুখী ছিলাম না। বই নিয়ে সারাক্ষণ বসে থাকা, পড়াশোনাকে জীবনের একমাত্র কাজ বানিয়ে ফেলা—এই অভ্যাসটা আমার কখনোই হয়ে ওঠেনি। কিন্তু যারা সেটা পারত, তাদের প্রতি আমার এক ধরনের শ্রদ্ধা ছিল।

তাদের ডেডিকেশন আমাকে মুগ্ধ করত। মনে হতো, এরা আজ হয়তো শুধু বই নিয়ে পড়ে আছে, কিন্তু একদিন এদের জীবনের গল্পটাই নিশ্চয় অন্যরকম হবে। জীবনে বড় কিছু অর্জন করলে তখন ফিরে তাকালে হয়তো এই কঠিন দিনগুলোর কথাই মনে পড়বে।

সম্ভবত সেই কারণেই আমার জীবনে অনেক ভালো ছাত্রের সঙ্গে এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। তাদের সাফল্যের সঙ্গে আমার নিজের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও, তাদের পথচলার প্রতি আমার একটা নীরব ভালো লাগা ছিল।

এরই ধারাবাহিকতায় একদিন ঢাকায় চলে এলাম।

আমাদের সঙ্গে পড়া সবচেয়ে ভালো ছাত্রদের একজন ছিল রাশেদ। সে তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে ইন্টার্নশিপ করছিল। আমি গিয়ে উঠলাম ওদের ডক্টর মিলন ইন্টার্নশিপ হোস্টেলে। মাঝে মাঝে সংসদ ভবনের কাছে ছোট চাচার বাসায় থাকতাম। ছোট চাচা ছিলেন শেরে বাংলা নগর হাই স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক। তবে ঢাকায় আমার বেশিরভাগ সময় কেটেছে ঢাকা মেডিকেল কিংবা আশপাশের অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে।

ইন্টার্নশিপের সময় ওদের পড়াশোনার চাপ কিছুটা কমে গিয়েছিল। তাই অনেকদিন পর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, গল্প, হাসি-ঠাট্টা—সব মিলিয়ে তখনকার সময়টা ছিল জীবনের এক অসাধারণ আনন্দের অধ্যায়।

রাশেদের রুম ছিল ২০৬ নম্বরে। ২১১ নম্বর রুমে থাকত বাপ্পি—যাকে সবাই শাহু নামে চিনত। আমার মতই আরেকজন ডাক্তার আনোয়ারের বন্ধু।রাশেদের রুমমেট ছিল ডাক্তার ফারুক। ওদের সঙ্গে কত দিন কিংবা রাত নাইট ডিউটি করেছি—ইমার্জেন্সি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ওয়ার্ডে। একজন ডাক্তার না হয়েও সেই অভিজ্ঞতাগুলো আমার জীবনের অন্যতম অদ্ভুত ও মূল্যবান স্মৃতি হয়ে আছে।

ইমার্জেন্সিতে আসা রোগীদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ তখন মারা যেত। ডেথ কনফার্মেশন, ডেথ সার্টিফিকেট—এসব ছিল ওদের দৈনন্দিন কাজেরই অংশ। যতদূর মনে পড়ে, মৃত্যুর নিশ্চিতকরণের জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট লক্ষণ পরীক্ষা করা হতো—হার্টবিট নেই, পালস পাওয়া যাচ্ছে না, চোখের মণির প্রতিক্রিয়া নেই—এরকম কয়েকটি বিষয়।

অনেক সময় আমি পাশে বসে থাকলে ওরা বলত,
“বসে আছিস যখন, এই ফর্মগুলো একটু পূরণ করে দে। আমরা পরে সই করে দেব।”

আমি ডাক্তার না হয়েও তখন হাসপাতালের কাগজপত্র পূরণে বেশ অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছিলাম!

তবে আমার আসল আগ্রহ ছিল অন্য জায়গায়।

অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়া রোগীরা তখন একটি ওয়ার্ডে ভর্তি থাকত। কেউ এক সপ্তাহ, কেউ দুই সপ্তাহ, কেউবা তিন সপ্তাহ ধরে স্যালাইন নিয়ে পড়ে থাকত। সবাই অপেক্ষা করত—কবে তার জ্ঞান ফিরবে, কবে সে চোখ মেলবে, কবে কথা বলবে। আর আশ্চর্যের বিষয়, যেদিন জ্ঞান ফিরত, অনেক ক্ষেত্রেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা বেশ সুস্থ হয়ে উঠত।

কিন্তু আমার আগ্রহ ছিল রোগী কীভাবে অজ্ঞান হলো, সেই গল্প শোনার প্রতি!

তাই খবর পেলেই রোগীর পাশে বসে যেতাম।

বলতাম,
“ভাই, এখন তো সুস্থ হয়ে গেছেন। আর কোনো সমস্যা নেই। কয়েকদিন ভালো খাবার খাবেন, বিশ্রাম নেবেন, তারপর একেবারে ঠিক হয়ে যাবেন।”

রোগী ভাবত আমিও বোধহয় ডাক্তার!

তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করতাম,
“আচ্ছা, কীভাবে ঘটনাটা ঘটেছিল? কতটুকু মনে আছে?”

একজন রোগী বললেন, তিনি পাবলিক বাসে বসে যাচ্ছিলেন। পাশে বসা একজন লোক চিপসের প্যাকেট খুলল। নিজে এক পিস খেল, তারপর তাকে বলল,
“ভাই, খাবেন? খান।”

সে এক পিস খেল, রোগীও এক পিস খেল। এভাবে দুজন মিলে চিপস খেতে লাগল।

একসময় রোগী মুখে একটা চিপসের পিস গেল। তারপর বললেন,
“চিপসটা মুখে দেওয়ার পর মনে হলো চিপসটা একটু নরম।
এই বলে লোকটা চুপ করে রইল। আমি জিজ্ঞেস করতে লাগলাম তারপর কি হলো? রুগী একরাশ বিস্ময়ের স্মৃতি নিয়ে বলল ,তারপর আর কিছু মনে নেই!”

আরেকজনের ঘটনা আরও মজার।

গাড়িতে পাশাপাশি বসে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ পাশের লোকটি বলল,
“ভাইসাব, আমার বমি বমি লাগতেছে।”

সে জানালা দিয়ে মুখ বের করে বমি করার চেষ্টা করতেছে বারবার ।আর চেষ্টা করার সময় তার পকেটের কিছু একটা রোগীর নাকের কাছে লাগল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“তারপর?”

সে বলল,
“তারপর আর কিছু মনে নাই!”

এই “তারপর আর কিছু মনে নাই”—বাক্যটাই ছিল অজ্ঞান পার্টির রোগীদের সবচেয়ে কমন উত্তর!

এদিকে বন্ধুদের অনুষ্ঠান, আড্ডা, সিনিয়র-জুনিয়রদের সঙ্গে পরিচয়—সব মিলিয়ে মেডিকেল হোস্টেলের সঙ্গে আমার এমন হৃদ্যতা তৈরি হয়ে গেল যে এক জুনিয়র ছেলে বিয়ে করার সময় আমাকে দাওয়াত দিল।

বিয়ের কার্ডে আমার নাম লিখে দিল—

“ডক্টর শামীম।”

এই কার্ড যখন আমার মেডিকেলের বন্ধুদের হাতে গেল, তখন যে পরিমাণ হাসাহাসি হয়েছিল, সেটা আজও মনে পড়লে হাসি পায়।

আমি ডাক্তার না হয়েও তখন মেডিকেল কলেজের ডাক্তারদের হোস্টেলে এমনভাবে মিশে গেছি যে শেষ পর্যন্ত বিয়ের কার্ডেও ডাক্তার হয়ে গেলাম!
আরেকটা বিশেষ ঘটনা, আমি আর আমার বন্ধু রাশেদ নিচে টং দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম তখন একজন জুনিয়র ডাক্তার হঠাৎ রাশেদকে জিজ্ঞেস করল আপনি কি শামীম ভাইয়ের রুমমেট।
আমার বন্ধু রাশেদ আমার দিকে তাকিয়ে শুধু বলল দোস্ত এবার মনে হয় তোমার চলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে!
অবশ্যই মজার ছলে বলেছিল।
একদিন শুক্রবার কয়েকজন মিলে জুম্মার নামাজ পড়ে খাবারের জন্য ক্যান্টিন বাছাই করতেছি, কোন হোস্টেলের ক্যান্টিনে খাইতে যাব ,না মেডিকেলের ক্যান্টিনে খাইতে যাব বা বাইরে খাইতে যাব!!!
হঠাৎ একজন একটা বিশেষ ক্যান্টিনের নাম বলে বলল চলো এখানে যাই মুরগির পিসগুলো বড় এবং দামে অনেক সস্তা!
আমরা যখন ক্যান্টিনের কাছাকাছি তখন হঠাৎ দেখি অনেকগুলো মরা মুরগি সহ ক্যান্টিনের ম্যানেজারকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
বুঝা গেল বড় এবং সস্তা মুরগির পিছনের রহস্য।

তবে হাসি-ঠাট্টার আড়ালে ওদের জীবনটা দেখলে আমার ভেতরে অন্য একটা অনুভূতি কাজ করত।

ওরা তখন পোস্টগ্র্যাজুয়েশনের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। ডিউটি, পড়াশোনা, খাওয়া-দাওয়া আর ঘুম—এই ছিল জীবনের মূল রুটিন। এর বাইরে আনন্দ করার সময় ছিল খুবই কম।

তখনই আরও ভালোভাবে বুঝতে শুরু করলাম—আমরা যখন একজন ডাক্তারকে দেখি, রোগী দেখার কয়েক মিনিটের জন্য হয়তো এক হাজার টাকা ভিজিট দিতে হচ্ছে, তখন শুধু ওই কয়েক মিনিটটাই দেখা হয়। কিন্তু সেই কয়েক মিনিটের পেছনে তার জীবনের কত বছর পড়াশোনা, কত রাত জাগা, কত আনন্দ বিসর্জন, কত পরীক্ষা, কত প্রতিযোগিতা—সেটা আমরা খুব কমই দেখি।

এই মানুষগুলো স্কুলজীবন থেকে শুরু করে কলেজ, মেডিকেল কলেজ, ইন্টার্নশিপ, পোস্টগ্র্যাজুয়েশন—জীবনের একটা বিশাল অংশ শুধু জ্ঞান অর্জনের পেছনে ব্যয় করেছে।

আমার চোখে তাদের সেই ত্যাগের মূল্য শুধু টাকার অঙ্ক দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়।

আমাদের ব্যাচের অনেকেই পরবর্তীতে বাংলাদেশে, আমেরিকায়, যুক্তরাজ্যে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অত্যন্ত সফল ডাক্তার হয়েছে।

তাদের জীবন দেখলে মাঝে মাঝে আমার মনে হতো—ডাক্তারদের স্ত্রী হওয়া, স্বামী হওয়া কিংবা সন্তান হওয়াই বোধহয় সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ! কারণ ডাক্তারদের নিজের জন্য আনন্দ করার সময় এত কম যে তাদের কাছের মানুষদেরই হয়তো সেই আনন্দের কিছুটা ভাগ করে নিতে হয়।

রাত বারোটা, একটা, দুইটা—রোগী দেখতে দেখতে কখন রাত শেষ হয়ে যায়, তারা নিজেরাই জানে না। অবসর নেওয়ার বয়স এলেও যতক্ষণ শরীর সুস্থ থাকে, রোগী দেখা যেন থামে না।

তবে একটা জিনিস তাদের ধরে রাখে—একজন মানুষকে সুস্থ করে তোলার আনন্দ।

মানুষের শরীরের কষ্ট কমিয়ে তাকে সুস্থ করে বাড়ি পাঠানোর যে তৃপ্তি, সেটা হয়তো পৃথিবীর সব পেশার মানুষ অনুভব করতে পারে না। আমার মনে হয়, এই আনন্দই অনেক ডাক্তারকে এত কঠিন জীবন চালিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়।

এবার আসি সেই রাতের গল্পে।

ইন্টার্নস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ছিল আনোয়ার। তার আগ্রহ ও নেতৃত্বে তখন মেডিকেলের নতুন একটি বিশাল এয়ার-কন্ডিশন্ড অডিটোরিয়াম এ একটা জম্পেশ প্রোগ্রামের আয়োজন চলছে। সেখানে ওদের ব্যাচের একটা বড় অনুষ্ঠান হবে।

অনুষ্ঠানে কয়েকজন বন্ধু একটা হিন্দি গানের সঙ্গে নাচবে। কোনোভাবে আমাকেও তাদের সঙ্গে ঢুকিয়ে দিল।
ডক্টর আতিক উরফে রোবট আতিক, মধু, রাব্বি, ত্রিদেব, সুমন সহ আরো অনেকেরই অংশগ্রহণ ছিল।

আমি নাচলামও!

সেদিন কী কী ঘটেছিল, সেটা বলতে গেলে আলাদা একটা পর্ব হয়ে যাবে। শুধু এটুকু বলি—মেডিকেলের সেরা ছাত্রদের সঙ্গে একজন অতি সাধারণ ছাত্রের সেই নাচের দৃশ্যটা আজও আমার স্মৃতির অ্যালবামে জীবন্ত।

তবে আমার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিগুলোর একটি সেই রাতের ঘটনা।

রাত প্রায় তিনটা। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা শেষ করে আমি ডক্টর মিলন ইন্টার্ন হোস্টেলে ফিরলাম।

প্রথমে গেলাম আমার নিজের বলতে যে রুম—ডক্টর রাশেদের ২০৬ নম্বর রুমে।

হোস্টেলের নিয়ম ছিল, দরজা জোরে খোলা যাবে না। দরজার নিচ দিয়ে আঙুল ঢুকিয়ে খুব সাবধানে ছিটকিনি তুলতে হবে, তারপর এমনভাবে দরজা খুলতে হবে যাতে ভেতরে কেউ ঘুমিয়ে থাকলেও ঘুম না ভাঙে।

আমি খুব সাবধানে ছিটকিনি তুললাম। দরজা একটু খুলে উঁকি দিয়ে দেখি—ডাক্তার ফারুক ঘুমাচ্ছে না, পড়ছে!

আমি আবার দরজা বন্ধ করে চলে গেলাম ২১১ নম্বর রুমে।

সেখানেও একই কায়দায় ছিটকিনি খুলে ভেতরে ঢুকে দেখি বাপ্পি, অর্থাৎ শাহু, ঘুমাচ্ছে।

আমার ঘুম আসছিল না। কার্পেটের ওপর বালিশ নিয়ে চুপচাপ শুয়ে ছিলাম। হঠাৎ দেখি বাপ্পি খুব আস্তে করে লুঙ্গিটা ভালোভাবে গিট দিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে যাচ্ছে।

আমি ভাবলাম—এত রাতে কোথায় যাচ্ছে?

চুপচাপ আমিও তার পেছনে হাঁটতে শুরু করলাম।

রাত সাড়ে তিনটা। চারদিকে অন্ধকার। হোস্টেলের বারান্দার বাতিগুলো কখন ফিউজ হয়ে গেছে, আল্লাহই জানেন। কোনো কোনো বাতি হয়তো কোনোদিন আলোই দেয়নি!

বাপ্পি বাথরুমে ঢুকল।

বাথরুমও ছিল সেই সময়কার বাংলাদেশের অনেক হোস্টেলের মতো—একেবারে সাদামাটা ব্যবস্থা। বাইরে থেকে পা লম্বা করে উঁচু দুইটা ইটের উপর বসে কোনোরকমে কাজ সারতে হতো।

বাপ্পি বসে কাজ শুরু করেছে।

আর তখনই আমার মাথায় কী যে ঢুকল!

আমি সেই অদ্ভুত, বোবার মতো কিন্তু অত্যন্ত তীক্ষ্ণ একটা আওয়াজ করলাম—

“আআআআআ!”

আওয়াজ শুনে বাপ্পি এমনভাবে ধপাস করে পড়ে গেল যে আমি নিজেই ভয় পেয়ে গেলাম!

দেখলাম বাথরুমের অবস্থা খারাপ। আমি আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালাম না।

অন্ধকারে দৌড়ে একটা জায়গায় লুকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

তারপর চুপচাপ নিচে নেমে গেলাম।

হোস্টেলের নিচে ২৪/৭ একটা ছোট দোকান খোলা থাকত। চা, সিগারেট, বিস্কুট, মিষ্টি বন, দই, চিড়া—আর সেই ঐতিহাসিক ডিম্ বন অথবা ফাটা ফ্রাই।

আমি ভয়ে একটা চা খেলাম।

কিছুক্ষণ পর দেখি বাপ্পি গোসল করে রুমের দিকে যাচ্ছে।

আমি মনে মনে বললাম—

“এখন যদি আমাকে দেখে ফেলে, তাহলে এই ভোররাতে আমার কী হবে, আল্লাহই জানেন!”

কিছুক্ষণ পর আবার ২০৬ নম্বর রুমে আবার গেলাম। একই কায়দায় দরজা খুলে দেখি ফারুক তখনও টেবিলের আলো জ্বালিয়ে শুয়ে শুয়ে ডাক্তারি বই পড়ছে।

আমি আবার সেই তীক্ষ্ণ আওয়াজ করলাম—

“আআআআআ!”

ফারুকের হাত থেকে বই ধপাস করে পড়ে গেল!

তার পড়ার ভঙ্গি মুহূর্তে শোয়ার ভঙ্গি হয়ে গেল।

দৃশ্যটা দেখে আমি আর দাঁড়ালাম না।

সোজা পালিয়ে গেলাম টিভি রুমে।

সেখানে বসে ছিল ডক্টর হাসান—আমাদের সিনিয়র ভাই। তার আরেক নাম ছিল “সঠ মামা”।

আমি আবার সেই আওয়াজ করলাম।

“আআআআআ!”

এবার দেখি মামার হাত থেকে রিমোট পড়ে গেল!

তখন আমার মনে হলো—হোস্টেলের যে কয়টা আশ্রয়স্থল ছিল—টিভি রুম, ২০৬, ২১১, সবগুলোতেই আমি রাতারাতি অধিকার হারিয়ে ফেলেছি।

অতএব আবার ২৪/৭ টং দোকানে ফিরে গেলাম।

কিছুক্ষণ পর ফারুকও ২৪/৭ এ এল। যথারীতি একটা চা নিল। চা শেষ করে আমার দিকে তাকিয়ে শুধু বলল,

“তুই যদি আমাকে মেরে ফেলতে চাস, তাহলে এই ঘটনা আরেক দিন ঘটাস।”

তারপর আর কিছু বলল না!

আজও ভাবি, সেই রাতে আমি আসলে কতজন ডাক্তারকে অকালমৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিলাম!

আরেকদিনের ঘটনা আরও মজার।

গোসল করার জন্য এক বন্ধুর কাছে টাওয়েল চাইলাম। সে খুব আন্তরিকভাবে বলল,

“ ওই যে খয়রি রঙ্গের ঝুলানো টাওয়েটি নিয়ে যা।”

আমি ভাবলাম, বন্ধুর টাওয়েল ব্যবহার করছি—কৃতজ্ঞতা হিসেবে আগে ভালো করে ধুয়ে নিই। সাবান দিয়ে খুব যত্ন করে টাওয়েলটা ধুতে শুরু করলাম।

ধোয়ার পর দেখি টাওয়েলের রং চলে গেছে!

আমি খুব দুঃখিত হয়ে বন্ধুকে বললাম,

“দোস্ত, তোর টাওয়েলটা সাবান দিয়ে ধুতে গেছিলাম। কালার চলে গেছে।”

সে খুব স্বাভাবিকভাবে জিজ্ঞেস করল,

“কোন কালারটা বের হয়েছে?”

আমি বললাম,

“টাওয়েলটা সাদা হয়ে গেছে।”

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“ধন্যবাদ দোস্ত। এটাই তো টাওয়েলের অরিজিনাল কালার ছিল!”

সেদিন বুঝলাম—ডাক্তারদের শুধু চিকিৎসাবিদ্যাতেই অসাধারণ বুদ্ধি নয়, ধৈর্যও অসাধারণ!

সেই মেডিকেল হোস্টেলের দিনগুলো আমার জীবনে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, সেটা আজ অনেক বছর পর আরও ভালোভাবে বুঝি।

ওরা ছিল বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাছাই হয়ে আসা সেরা ছাত্রদের একটি দল। ছোটবেলা থেকে যারা খেলাধুলা, আড্ডা, ঘোরাঘুরি—অনেক কিছু বাদ দিয়ে বইয়ের সঙ্গে লড়াই করেছে, তারাই একদিন মেডিকেলে এসে আবার নতুন করে একই লড়াই শুরু করেছে।

আর আমি?

আমি তাদের মতো পড়াশোনা করতে পারিনি। কিন্তু তাদের সেই অধ্যবসায়, তাদের সেই লয়্যালটি টু দ্য প্রফেশন, তাদের ত্যাগ—এসবের প্রতি আমার নিজের একটা নীরব লয়্যালিটি ছিল।

সেই লয়্যালিটিই আমাকে তাদের জীবনের ভেতরে ঢোকার সুযোগ দিয়েছিল।

আমি ডাক্তার ছিলাম না, কিন্তু ডাক্তারদের হোস্টেলে রাত কাটিয়েছি। তাদের নাইট ডিউটি দেখেছি, রোগীর কষ্ট দেখেছি, মৃত্যুর কাছাকাছি মুহূর্ত দেখেছি, আবার একই সঙ্গে তাদের হাসি, আনন্দ, নাচ, দুষ্টুমি—সবকিছুর অংশ হয়েছি।

জীবনের একটা অদ্ভুত সৌভাগ্য ছিল এটি।

আজ এত বছর পর পেছনে তাকালে মনে হয়—জীবনে আমরা শুধু নিজেদের অর্জনের মাধ্যমেই বড় হই না। কখনো কখনো অন্যের মেধা, পরিশ্রম, সততা ও সাফল্যের প্রতি আমাদের যে শ্রদ্ধা ও লয়্যালিটি থাকে, সেটাও আমাদের জীবনের দরজা খুলে দেয়।

আমার ভালো ছাত্রদের প্রতি সেই নীরব লয়্যালিটি আমাকে এমন কিছু মানুষের কাছে নিয়ে গিয়েছিল, যাদের জীবন থেকে আমি হয়তো বই পড়ে যতটা শিখতে পারতাম, তার চেয়েও বেশি শিখেছি জীবনের গল্প শুনে।

সেই কারণেই আজও মনে হয়—লয়্যালিটি সব সময় বিনিময়ের হিসাব করে না। কখনো কখনো একটি নীরব লয়্যালিটিই আপনাকে এমন কিছু মানুষের জীবনের অংশ করে দেয়, যাদের গল্প আপনার নিজের জীবনকেও সমৃদ্ধ করে।
* আমিনুল ইসলাম শামীম: সাসস্টিয়ান, প্রথম ব্যাচ।

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.