শুক্রবার | ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ২৩ মাঘ, ১৪৩২

সংস্কার বিরোধী অপশক্তি ও আলো-আঁধারি খেলা

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
সম্প্রতি দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হলেও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি মনে করে, ইতোমধ্যে শতাধিক অধ্যাদেশ জারি করা হলেও এর বেশিরভাগের ক্ষেত্রে জুলাই সনদের মূল চেতনা উপেক্ষিত রয়েছে … ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও নিজস্ব বিবেচনার ভিত্তিতে একের পর এক অধ্যাদেশ জারি করলেও অনেক ক্ষেত্রে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মৌলিক দিকগুলো উপেক্ষা করা হয়েছে … সংস্কারের নামে তৈরি এই আইনি কাঠামো কার্যত দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করছে এবং পুরনো আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে।’
এই মতামতগুলোকে আরো গভীরে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কারকে কেন্দ্র করে নতুন যে আইনি ও নীতিগত প্রস্তাব সামনে এসেছে, তা আপাতদৃষ্টিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও ভেতরে ভেতরে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে দুর্নীতির মামলায় জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে সাজা মার্জনার সুযোগ রাখার প্রস্তাবকে টিআইবি ‘দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা দেওয়ার ফাঁদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এই বক্তব্য একটি নাগরিক সংগঠনের প্রতিক্রিয়া এবং এটি রাষ্ট্রীয় সংস্কারের নামে সম্ভাব্য আত্মসমর্পণের এক ভয়াবহ
সতর্কবার্তা।
দুদক প্রতিষ্ঠার মূল দর্শন ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও আইনি দুর্বলতার কারণে দুদক তার কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারছে না। এমন বাস্তবতায় ‘সংস্কার’ শব্দটি জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু সংস্কারের নামে যদি দুর্নীতিকে বৈধতার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে তা হবে সংস্কার বিরোধী অপশক্তির কাছে নীতিগত আত্মসমর্পণ।
টিআইবি যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আপত্তি তুলেছে, তা হলো, দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে অর্থদণ্ড বা ক্ষতিপূরণ দিয়ে সাজা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ। এই ধারণাটি শুনতে অনেকটা ‘প্লি বার্গেইনিং’-এর মতো মনে হলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর তাৎপর্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি দেশে যেখানে দুর্নীতির বড় অংশ সংঘটিত হয় ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী ও বিত্তশালীদের মাধ্যমে, সেখানে অর্থের বিনিময়ে সাজা মওকুফের সুযোগ মানে কার্যত: ধনীদের জন্য আলাদা নিয়ম ও আইন চালু করার শামিল।
টিআইবি যথার্থভাবেই প্রশ্ন তুলেছে যে, যদি কেউ কোটি কোটি টাকা লুট করে, আর পরে তার একটি অংশ ফেরত দিয়ে বা জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যায়, তবে দুর্নীতির প্রকৃত শাস্তি কোথায়? এটি তো অপরাধের নিরুৎসাহন নয়, বরং উৎসাহ দেওয়ার নামান্তর। বার্তা স্পষ্ট: চুরি করো, ধরা পড়লে টাকা দিয়ে মিটিয়ে নাও। এই দর্শন রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।
সংস্কারের ইতিবাচক দিকও অবশ্য পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না। মামলার জট কমানো, তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত করা, কিছু প্রশাসনিক স্বাধীনতা বাড়ানোর প্রস্তাব নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু এত করে এই ইতিবাচক দিকগুলো কি নেতিবাচক দিকের ভারে চাপা পড়ে যাচ্ছে না? টিআইবি মনে করে, দুর্নীতির শাস্তি লঘু করার সুযোগ রাখলে দুদকের সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান কার্যকর হতে পারে না।
আরও উদ্বেগজনক হলো, এই ধরনের প্রস্তাব সংস্কার বিরোধী অপশক্তিকে আরও সাহসী করে তুলবে। যারা বরাবরই চায় দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থাকে দুর্বল রাখতে, তারা এখন আইনের ছাতার নিচে নিরাপদ বোধ করবে। টিআইবি একে স্রেফ নীতিগত ত্রুটি না ভেবে বরং একটি কাঠামোগত ফাঁদ হিসেবে দেখছে। যেখানে আইন নিজেই দুর্নীতিবাজদের ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশের মতো দেশে দুর্নীতি একটি আর্থিক অপরাধ । পাশাপাশি এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত। দুর্নীতির কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, সবখানেই সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়। সেখানে দুর্নীতির শাস্তি লঘু করার অর্থ হচ্ছে সেই বঞ্চনাকেই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া। টিআইবি তাই জোর দিয়ে বলছে, দুদক সংস্কার হতে হবে কঠোরতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে, আপসের ভিত্তিতে নয়।
কারণ, সত্যিকারের সংস্কার মানে হলো, দুদকের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্তের সুযোগ দেওয়া, উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করা। অর্থের বিনিময়ে শাস্তি মওকুফ না করে দৃষ্টান্তমূলক সাজাই হওয়া উচিত দুর্নীতি দমনের মূল হাতিয়ার। তা না হলে সংস্কার শব্দটি কেবল একটি মোড়ক হয়ে থাকবে, যার ভেতরে লুকিয়ে থাকবে পুরোনো সুবিধাভোগী ব্যবস্থারই পুনরুৎপাদন।
বিশ্লেষকগণ মনে করেন, এটা রাষ্ট্রসংস্কারে আলো-আঁধারি খেলার মতো। এদিয়ে রাষ্ট্র সুরক্ষা না কি সাফাইয়ের পথ তা স্পষ্ট করা দরকার।
এছাড়া রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে সাম্প্রতিক সময়ে আটটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের জন্য জারি করা সংস্কার অধ্যাদেশ জনপরিসরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বলা হচ্ছে, এসব অধ্যাদেশের লক্ষ্য হচ্ছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতা বাড়ানো। কিন্তু আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সংস্কারের মধ্যে যেমন কিছু আশাব্যঞ্জক দিক আছে, তেমনি আছে গুরুতর অস্পষ্টতা ও উদ্বেগজনক ধারা। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এসব সংস্কার কি সত্যিই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেবে, নাকি দুর্বলতা ঢাকতে সাফাইয়ের পথ খুলে দিচ্ছে?
প্রথমত, ইতিবাচক দিকটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। নিয়োগ ও প্রশাসনিক কাঠামোয় কিছু নিয়মতান্ত্রিক পরিবর্তন, সময়সীমা নির্ধারণ, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা জোরদার এবং কাগজে-কলমে রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর ঘোষণা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। বহুদিন ধরে যে অভিযোগ ছিল, আমাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। আর সেই প্রেক্ষাপটে সংস্কারের উদ্যোগ ছিল একটি ইতিবাচক সংকেত।
কিন্তু আলোচনার মূল কেন্দ্রে রয়েছে সংস্কারের আঁধার দিক। বেশ কয়েকটি অধ্যাদেশে এমন বিধান যুক্ত হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশেষ করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা শিথিল করা, আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা প্রশাসনিক সমঝোতার মাধ্যমে গুরুতর
অনিয়ম নিষ্পত্তির সুযোগ রাখার এই প্রবণতা সংস্কারের মূল দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এতে জবাবদিহির বদলে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, আটটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ সমস্যা স্পষ্ট। যেকানে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার সীমারেখা অস্পষ্ট। অধ্যাদেশগুলোতে কর্তৃত্বের উৎস, সরকারের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিষ্ঠান প্রধানদের ক্ষমতা এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনে নির্বাহী হস্তক্ষেপের দরজা খোলা থাকে। এতে করে সংস্কারের নামে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত।
তৃতীয়ত, সংস্কার প্রক্রিয়ায় জনঅংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতার ঘাটতি চোখে পড়ে। এত গুরুত্বপূর্ণ আটটি প্রতিষ্ঠানের সংস্কার অধ্যাদেশ জারির আগে পর্যাপ্ত সংসদীয় আলোচনা, বিশেষজ্ঞ মতামত বা নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ দেখা যায়নি। ফলে এসব সংস্কার কতটা বাস্তবসম্মত এবং কতটা
জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
আরও উদ্বেগজনক হলো, এই অধ্যাদেশগুলো ভবিষ্যতে ক্ষমতাসীনদের জন্য একধরনের আইনি ঢাল হয়ে উঠতে পারে। যদি সংস্কারের নামে দায়মুক্তির সংস্কৃতি চালু হয়, তবে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার বা ব্যর্থতার দায় আর ব্যক্তির ওপর থাকবে না। তা গিয়ে পড়বে কাগুজে নিয়মের আড়ালে। তখন সংস্কার হবে দায় এড়ানোর কৌশল, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার নয়।
তবে অধিকতর সতর্কতার জন্য বলা যায়, আটটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সংস্কার অধ্যাদেশ রাষ্ট্রের জন্য এক দ্বিমুখী বার্তা বহন করছে। একদিকে আছে পরিবর্তনের সম্ভাবনা, অন্যদিকে আছে পুরোনো সমস্যাকে নতুন মোড়কে টিকিয়ে রাখার আশঙ্কা। প্রকৃত সংস্কার মানে কেবল কাঠামো
বদল করলেই চলবে না। এর জন্য বিশেষভাবে দরকার হচ্ছে মানসিকতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহির সংস্কার। এই অধ্যাদেশগুলো যদি সেই সাহসী পথে না হাঁটে, তবে ইতিহাসে এগুলো স্মরণীয় হবে আলো- আঁধারির এক ব্যর্থ প্রয়াস হিসেবে। যেখানে সুরক্ষার চেয়ে সাফাইয়ের পথকে আরো বেশী বেশী প্রশ্রয় দিয়ে প্রশস্ত করা হয়েছে বলে মনে হবে এবং একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশের সার্বিক কল্যাণ অর্জন এবং সেটাকে স্থিতভাবে ধরে রাখার পথ কঠিন হতে পারে।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের
সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.