
-আমিনুল ইসলাম শামীম।।
Cost of Loyalty — পঞ্চম পর্ব
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কিছু মানুষকে আমরা শিক্ষক হিসেবে পাই, আবার কিছু মানুষকে পাই—যাঁরা অজান্তেই আমাদের চরিত্রের একটা অংশ হয়ে যান।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়—আমাদের প্রিয় SUST—তখন একেবারেই নবীন। আজকের মতো এত বড়, এত পরিচিত, এত প্রাণবন্ত ক্যাম্পাস তখনও হয়ে ওঠেনি। আমরা ছিলাম সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকের প্রজন্ম।
আর আমাদের কেমিস্ট্রি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা বিভাগীয় প্রধান ছিলেন প্রফেসর ড. খলিলুর রহমান।
স্যারের একটা আলাদা জগৎ ছিল।
দেশে পড়াশোনা শেষ করে বিদেশ থেকে PhD করে, লম্বা সময়ে পশ্চিমা বিশ্বে উন্নত চাকরি উন্নত জীবন দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দেশমাতৃকার টানে তিনি ফিরে এসেছিলেন এই ছোট্ট নবীন বিশ্ববিদ্যালয়ের একেবারে সূচনালগ্নে। চাইলে বিদেশেই থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি ফিরে এসেছিলেন—একটা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, নতুন প্রজন্ম এবং নতুন একটা স্বপ্নকে গড়ে তোলার জন্য।
স্যারের নীতি-নৈতিকতার মানদণ্ড তখনই আমাদের ক্যাম্পাসে প্রায় কিংবদন্তির মতো।
সাদা চুল, ফর্সা মুখ, চোখে পাওয়ারের চশমা, আর একটা অদ্ভুত নির্মোহ সৌন্দর্য—দেখলে মনে হতো মানুষটা যেন একটু অন্য জগতের।
তিনি কঠোর ছিলেন, কিন্তু নিষ্ঠুর ছিলেন না।
বরং এখন পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, তাঁর কঠোরতার ভেতরেই ছিল ছাত্রদের প্রতি অসম্ভব রকমের ভালোবাসা।
স্যার আমাদের বলতেন—
“খেলাধুলা করবে, অবশ্যই করবে। কিন্তু ক্লাস ফাঁকি দিয়ে নয়। ল্যাবরেটরি বাদ দিয়ে তো কখনোই নয়।”
তখন কথাটা শুনে মনে হতো—স্যার বুঝি খেলাধুলার বিরোধী!
আসলে তিনি ছিলেন শৃঙ্খলার পক্ষে।
আমাদের কেমিস্ট্রির ক্লাস চলত সাধারণত দুপুর পর্যন্ত। বিকেলে ল্যাবরেটরি। আর তখন আন্তঃবিভাগীয় খেলাধুলায় কেমিস্ট্রি বিভাগের বেশ ভালো দাপট ছিল।
ল্যাব শেষ করে আমরা দৌড়াতে দৌড়াতে হলে যেতাম। হাঁপাতে হাঁপাতে কোনো রকমে খেয়ে আবার মাঠে দৌড়।
কোনো দিন মাঠে পৌঁছে দেখি খেলা শুরু হতে আর দশ মিনিট।
তবুও ক্লাস কিংবা ল্যাবরেটরি বাদ দেওয়ার অনুমতি স্যারের কাছ থেকে কোনোদিন পাইনি।
আমরা তাঁর কথাই মেনে চলতাম।
কারণ একটা ক্লাসে যেমন নানা রকমের ছাত্র থাকে, তেমনি একজন ভালো শিক্ষকের চরিত্রের ছায়াও অজান্তে তাঁর ছাত্রদের ওপর পড়ে।
আমাদের ওপরও পড়েছিল।
—
একবার ঈদের দিন।
হঠাৎ মনে হলো—স্যার তো ক্যাম্পাসেই থাকেন। ঈদের দিন একটা সালাম করে আসি।
কয়েকজন মিলে স্যারের বাসায় গেলাম।
স্যারের স্ত্রী বললেন,
“উনি তো বাসায় নেই।”
আমরা ভাবলাম, হয়তো কোথাও গেছেন।
কিন্তু তিনি একটু পর বললেন,
“তোমরা ডিপার্টমেন্টে খুঁজে দেখতে পারো।”
আমরা একে অন্যের মুখের দিকে তাকালাম।
ঈদের দিন!
স্যার ডিপার্টমেন্টে কী করেন?
ডিপার্টমেন্টে গিয়ে দেখি—তালা।
নিচে শুধু নিরাপত্তারক্ষী।
হঠাৎ চোখে পড়ল স্যারের সেই পুরোনো জার্মান গাড়ি—আমরা যেটাকে মজা করে বলতাম “কচ্ছপ গাড়ি”—লালচে মেরুন রঙের।
গাড়ি যখন আছে, স্যার কোথায়?
দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করতেই সে বলল,
“স্যার তো ভিতরেই আছেন। ল্যাবরেটরিতে থাকতে পারেন।”
আমরা একটু অবাক হয়ে ল্যাবরেটরির দিকে গেলাম।
দরজাটা খোলা।
আস্তে করে ভিতরে ঢুকলাম।
দেখি—
স্যার একা বসে আছেন।
ঈদের দিন।
পুরো ক্যাম্পাস প্রায় ফাঁকা।
আর তিনি বসে আছেন তাঁর ল্যাবরেটরিতে!
আমাদের দেখে অবাক হয়ে বললেন,
“তোমরা এখানে কী করো?”
আমরা বললাম,
“স্যার, ঈদের সালাম করতে এসেছি।”
আমরা সালাম করলাম।
স্যার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন,
“চা খাবে?”
নিজের হাতে আমাদের লাল চা বানিয়ে খাওয়ালেন।
আমরা তখনও বুঝতে পারিনি—ঈদের আনন্দটা আসলে তাঁর কাছে কী।
একসময় জিজ্ঞেস করলাম,
“স্যার, ঈদের দিনও আপনি এখানে?”
স্যার খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন—
“আমার ঈদের আনন্দ এটাই।”
গবেষণার কাজে ল্যাবরেটরিতে বসে থাকা!
আজ এত বছর পর বুঝি, মানুষ আসলে তার সবচেয়ে প্রিয় কাজের মধ্যেই নিজের আনন্দ খুঁজে পায়।
স্যারের কাছে গবেষণাই ছিল আনন্দ।
আর সেই আনন্দের জন্য ঈদের দিনেও তিনি ল্যাবরেটরিতে একা বসে থাকতে পারতেন।
—
এবার আসি সেই ঘটনার কথায়, যেটা আজও আমার কাছে Cost of Loyalty-এর এক অসাধারণ উদাহরণ।
আমাদের তৃতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা।
চার ঘণ্টার পরীক্ষা।
পরীক্ষার বিষয়টি ছিল স্যারের।
আমরা সবাই যথাসময়ে পরীক্ষার হলে বসে গেলাম।
স্যারের একটা বিশেষ অভ্যাস ছিল।
পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে তিনি হলে এসে প্রথমে ছাত্র গুনতেন।
কতজন উপস্থিত—সেটা নিশ্চিত করতেন।
তারপর খাতা দিতেন।
ঠিক সময়ে প্রশ্নপত্র দেওয়া হলো।
প্রশ্ন হাতে পাওয়ার পর স্যার বললেন,
“কোনো প্রশ্ন বুঝতে অসুবিধা হলে এখন জিজ্ঞেস করো। পরীক্ষা শুরু হয়ে গেলে আর প্রশ্ন বুঝিয়ে দেওয়া হবে না।”
আমরা প্রশ্ন পড়লাম।
সব ঠিকঠাক।
তারপর স্যার বললেন,
“এখন পরীক্ষা শুরু করো।”
আমরা লেখা শুরু করলাম।
আর স্যার—
হল থেকে বের হয়ে গেলেন!
অবশ্য স্যারের এমন বের হয়ে যাওয়া আমাদের কাছে নতুন কিছু ছিল না।
তিনি কখনো একটানা পরীক্ষার হলে বসে থাকতেন না।
কখনো জানালা দিয়ে উঁকি দিতেন, কখনো এদিক-ওদিক হাঁটতেন।
কেউ ডানে-বামে তাকালেই—
খাতা নিয়ে নিতেন।
নকল?
আমাদের কাছে সেটা প্রায় অসম্ভব একটা শব্দ।
স্যারের পরীক্ষায় নকল করার চিন্তাই করা যেত না।
আমাদের মনে একটা অলিখিত ধারণা ছিল—
নকল করতে গিয়ে ধরা পড়লে শুধু খাতা যাবে না, জীবনটাই বুঝি শেষ!
অবশ্য স্যার কখনো কাউকে মারধর করেননি।
কিন্তু তাঁর নৈতিক দৃঢ়তার একটা এমন প্রভাব ছিল যে, তাঁর সামনে অন্যায় করার সাহসটাই জন্মাত না।
সেদিনও আমরা লিখছি।
একেবারে নিস্তব্ধতা।
এমন নীরবতা যে পাশের ছাত্রের নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যায়।
ফ্যানের শব্দ।
কলমের শব্দ।
পাতা ওল্টানোর শব্দ।
ভালো ছাত্ররা খাতা শেষ করে সর্দার ভাইয়ের কাছ থেকে অতিরিক্ত খাতা নিচ্ছে।
কেউ কেউ পাতার পর পাতা লিখছে।
আমরা যারা পরীক্ষার হলে মাঝেমধ্যে দর্শক হয়ে যেতাম, তারা সেদিন চোখে দেখতাম না—কানে শুনতাম।
কারণ চোখ যদি ডানে-বামে যায়, তাহলে—
খাতা চলে যাওয়ার সম্ভাবনা!
একজন পেশাবের জন্য উঠল।
সর্দার ভাই বললেন,
“যাও।”
কিন্তু একজনের বেশি একসঙ্গে বাইরে যাওয়া যাবে না—স্যারের নির্দেশ।
সিরিয়াল করে সবাই গেল।
এক ঘণ্টা গেল।
দুই ঘণ্টা গেল।
তিন ঘণ্টা গেল।
আমরা লিখেই যাচ্ছি।
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার—
স্যারকে আমরা দেখিই না!
সেদিন তাঁর সেই পরিচিত ছায়াটাও যেন পরীক্ষার হলের কোথাও নেই।
পরীক্ষা প্রায় শেষ।
হঠাৎ—
স্যারের আবির্ভাব!
দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন,
“আর এক মিনিট।”
পুরো হল যেন মুহূর্তে জমে গেল।
“এক মিনিট পর খাতা জমা দেবে। লেখা বন্ধ।”
আমরা শেষ মুহূর্তের উত্তরগুলো লিখে ফেললাম।
এক মিনিট পর—
স্টপ।
খাতা জমা।
স্যার নিজের হাতে খাতাগুলো নিয়ে ডিপার্টমেন্টের দিকে চলে গেলেন।
আমরা তখনও জানি না, আজকের ঘটনায় আসল চমকটা কোথায়।
সর্দার ভাইও খাতাগুলো নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আমাদের কৌতূহল হলো।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“সর্দার ভাই, একটা কথা বলেন তো—স্যারকে আজকে আমরা পুরো পরীক্ষায় একবারও দেখলাম না কেন?”
সর্দার ভাই খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন,
“দেখবেন কেমনে?”
আমরা অবাক।
“কেন?”
তিনি বললেন,
“আজ তো স্যারের সিন্ডিকেট মিটিং ছিল। উনি মিটিংয়ে ছিলেন। প্রায় আধাঘণ্টা আগে ফিরেছেন। ডিপার্টমেন্টে একটু বিশ্রাম নিয়ে এক মিনিট আগে হলে ঢুকেছেন।”
একাডেমিক ভবন এবং ভিসি অফিসের মধ্যে কমপক্ষে ২০০ মিটার দূরত্ব।
আমরা যেন আকাশ থেকে পড়লাম।
মানে—
পুরো চার ঘণ্টার পরীক্ষায় স্যার ছিলেনই না!
আজকের পুরো পরীক্ষার সময় আমাদের সামনে কোনো শিক্ষক ছিল না।
কেউ নজরদারি করছিল না।
কেউ ডানে-বামে তাকাচ্ছে কি না—দেখার কেউ ছিল না।
কেউ চাইলে বই খুলে দেখতে পারত।
কেউ চাইলে পাশের খাতায় তাকাতে পারত।
কেউ চাইলে একজন আরেকজনকে উত্তর বলে দিতে পারত।
কিন্তু—
কেউ কিছুই করল না।
একবারের জন্যও না।
আমরা সবাই যে যার খাতা লিখলাম।
চার ঘণ্টা।
নির্মলভাবে।
নিঃশব্দে।
তারপর খাতা জমা দিয়ে বের হয়ে এলাম।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় আরও একটা ছিল।
আমাদের কারও মধ্যে কোনো আফসোস ছিল না।
কেউ বলেনি,
“ইশ! স্যার ছিলেন না, একটু দেখে লিখতে পারতাম!”
বরং আমরা সবাই একটা অদ্ভুত বিস্ময় নিয়ে ভাবছিলাম—
“এটা কীভাবে সম্ভব?”
ছোটবেলা থেকে কত পরীক্ষা দিয়েছি।
হরেক রকম ছাত্র দেখেছি।
হরেক রকম চরিত্রের মানুষ।
কিন্তু এমন একটা পরীক্ষার হল—যেখানে চার ঘণ্টা শিক্ষক নেই, কোনো পাহারা নেই, অথচ একটা ছাত্রও অন্যদিকে তাকায়নি—
এমন অভিজ্ঞতা আমার জীবনে আর কখনো হয়নি।
তখন হয়তো আমরা এটাকে স্যারের ভয় বলে মনে করেছিলাম।
আজ এত বছর পর মনে হয়—
না। এটা শুধু ভয় ছিল না।
ভয় মানুষকে কিছু সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
কারণ সেখানে নিয়মের পাহারায় কোনো শিক্ষক ছিলেন না—
পাহারায় ছিলেন স্যারের চরিত্র।
তাঁর প্রতি আমাদের যে শ্রদ্ধা তৈরি হয়েছিল, যে বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, যে ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল—তার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল এক ধরনের অদৃশ্য আনুগত্য।
Loyalty.
স্যার কখনো আমাদের কাছে Loyalty দাবি করেননি।
তিনি শুধু নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়েছিলেন—নীতি-নৈতিকতা কাকে বলে।
তিনি দেখিয়েছিলেন, একজন শিক্ষক কীভাবে নিজের আচরণ দিয়ে ছাত্রদের শেখাতে পারেন।
ঈদের দিনেও গবেষণাগারে বসে থাকা মানুষটি যেমন নিজের কাজের প্রতি সৎ ছিলেন, তেমনি পরীক্ষার হলে তিনি আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখে বাইরে চলে যেতে পেরেছিলেন।
আর আমরা তাঁর সেই বিশ্বাসের মর্যাদা দিয়েছিলাম—নিজেদের অজান্তেই।
সেদিন পরীক্ষার হলে কোনো ক্যামেরা ছিল না।
কোনো CCTV ছিল না।
কোনো পাহারাদার ছিল না।
শুধু ছিল—
একজন শিক্ষকের চরিত্র।
আর সেই চরিত্রের প্রতি একদল ছাত্রের অদৃশ্য আনুগত্য।
আজ বুঝি, Loyalty এক রকমের নয়।
মানুষ ভয় থেকে Loyal হয়।
স্বার্থ থেকে Loyal হয়।
সম্পর্কের কারণে Loyal হয়।
কৃতজ্ঞতা থেকে Loyal হয়।
ভালোবাসা থেকেও Loyal হয়।
কিন্তু কিছু Loyalty আছে—
যার কোনো চুক্তি নেই, কোনো প্রতিদান নেই, কোনো ভয় নেই।
শুধু আছে গভীর শ্রদ্ধা।
স্যারের প্রতি আমাদের Loyalty ছিল ঠিক তেমনই এক আনুগত্য।
আর জীবনে কিছু মানুষ চলে যান অনেক দূরে,
কিন্তু তাঁদের চরিত্রের একটা অংশ আমাদের ভেতরে থেকে যায়।
ড. খলিলুর রহমান স্যারও আমাদের জীবনে তেমনই একজন মানুষ।
* আমিনুল ইসলাম শামীম: শিক্ষার্থী, প্রথম ম্যাচ, সাস্ট।