রবিবার | ৩০ নভেম্বর, ২০২৫ | ১৫ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২

লালপুরে আঞ্চলিক মহাসড়কের আতঙ্ক ট্রাক: ঝুঁকিতে বসতবাড়ি – দোকানপাট

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ :
নাটোরের লালপুর উপজেলায় গত ১১ মাসে কমপক্ষে ৩৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭২ জন আহত ও ১৯ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৭টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে উপজেলার ঈশ্বরদী -লালপুর- বানেশ্বর আঞ্চলিক মহাসড়কে। উপজেলা ফায়ার স্টেশন, হাসপাতাল, থানা ও পত্রিকার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই ৩৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫টিতে ট্রাক, ৭টিতে মোটরসাইকেল ও ৫টিতে প্রাইভেটকার ও পিকআপের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় ২৫টি ট্রাক দুর্ঘটনার ২০ টি ঘটেছে ঈশ্বরদী – লালপুর – বানেশ্বর আঞ্চলিক মহাসড়কে। এ সময় থানায় সড়ক পরিবহন আইনে মামলা হয়েছে মাত্র ৩টি। তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়,  উপজেলার এই সড়কে গভীর রাত থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অন্তত ১১টি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে দোকান ও বসতবাড়ির আঙিনায় নেমে গেছে। ৩টি ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে। বাকি ৬টি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিজেই সড়কের উপর কিংবা আশেপাশে উল্টে পড়েছে। তন্মধ্যে সর্বোচ্চ ৪ বার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে উপজেলার উধনপাড়া গ্রামে (পাইকপাড়া ব্রিজের পূর্বপাশে)। গত ২৪ জুন, ২০২৫ ফজরের নামাজ শেষে সেখানে রাস্তার পাশে বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা উধনপাড়া গ্রামের মৃত সুলতান মন্ডলের বড় ছেলে মুন্তাজ আলীর (৭৮) প্রাণ কেড়ে নেয় তন্দ্রাচ্ছন্ন চালকের বেপরোয়া গতির একটি ট্রাক। এসব দুর্ঘটনায় প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে আহত ও নিহত মানুষের সংখ্যা। দীর্ঘক্ষণ একটানা ড্রাইভিং, অপর্যাপ্ত বিশ্রাম, অতিরিক্ত গতি ও তন্দ্রাভাবের কারণে অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। এতে সড়ক ঘেঁষে থাকা বসতবাড়ি ও দোকানপাট মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা ফায়ার স্টেশন কর্মকর্তা একেএম লতিফুল বারী। বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) সরজমিনে ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা  যায়, ৫ বছর আগে রাস্তার পাশের ঘর-বাড়িগুলো নিরাপদ দূতত্বে ছিল। তবে সম্প্রতি রাস্তাটি প্রসারিত হয়ে  দুই লেনে উন্নীত হয়েছে। এতে প্রায় ১০২টি বসতবাড়ি এবং পাইকপাড়া, লালপুর ও গৌরিপুর সহ প্রায় ১৫টি বাজারের দোকানপাট রাস্তা ঘেঁষে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে অবস্থান করছে। অপরদিকে সড়কে বেড়েছে দূরপাল্লার দ্রুতগামী যানবাহনের চাপ। এমন অবস্থায় অদক্ষ কিংবা দক্ষ কোন চালক যদি ঘুম ঘুম চোখে কোন বাড়ি বা দোকানে গাড়ি চালিয়ে দেন, তাহলে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা। এদিক থেকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে উপজেলার মাধবপুর মোড়ের দুটি বাঁকে অবস্থানকারী বসতবাড়ি ও দোকানপাটের লোকজন। এ বাঁক দুটি ৯০ ডিগ্রি কোণে অবস্থান করায় ও সড়ক বিভাজক না থাকায় প্রায় ঘটে সড়ক দুর্ঘটনা। এছাড়া উপজেলায় মহাসড়কটির ১৮ কি.মি রাস্তায় সাদিপুর ও তিনখুঁটি এলাকায় প্রায় ১০০ ডিগ্রি কোণে আরও ৩টি বাঁক আছে। মাধবপুর মোড়ের বাসিন্দা ও মুদি দোকানদার তনয় কুন্ড (৪০) বলেন, গভীর রাতে দূরপাল্লার ট্রাকের চাপ থাকে বেশি। অনেক সময় চালকেরা বাঁক বুঝতে না পেরে সোজা দোকানের মধ্যে ঢুকে পড়ে বা উল্টে যায়। এতে আমরা চরম ঝুঁকির মধ্যে থাকি। উধনপাড়া গ্রামের তোফাজ্জল হোসেন বলেন, কিছুদিন আগে ঘুমন্ত চালকের একটি ট্রাক আমার ভাইয়ের পোল্ট্রি মুরগির দোকানে ঢুকে গেছে। এতে প্রায় ১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। কয়েকদিন আগে এখান থেকে আধা কি.মি পশ্চিমে একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাড়ির আঙিনায় আমার নানার ওপর উঠে গেলে তার মৃত্যু হয়। রহিমপুর গ্রামের আফজাল হোসেন বলেন, রাস্তা প্রসস্ত হওয়ায় আমার বাড়িটি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এ নিয়ে খুব দুঃশ্চিন্তায় আছি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) নাটোর সার্কেলের ভারপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) মো. আলতাব হোসেন বলেন, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বিষয়টি জেলা আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি) সভায় উত্থাপন করা হবে।  রাস্তা ঘেঁষে থাকা বাড়িগুলোর বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এর সাথে যোগাযোগ করা হবে। বিপদজনক বাঁক  ও দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করে দুর্ঘটনা হ্রাসে কাজ করবেন তারা।
এ ব্যাপারে নাটোর জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামরুল হাসান সরকার বলেন, বিষয়টি জটিল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারে করণীয় ঠিক করতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে পদক্ষেপ নিবেন তারা। এ বিষয়ে লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, গত ১১ মাসে সড়ক পরিবহন আইনে থানায় ৩টি মামলা হয়েছে। এ সকল দুর্ঘটনার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে দুর্ঘটনা শূণ্যের কোটায় নামিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৩)
Developed by- .::SHUMANBD::.