
-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
মাত্র আড়াই বছর আগে রাশিয়া ইউক্রেনে শিশুদের একটি স্কুলে বোমা ছুঁড়ে ৩২ শিশু মেরেছিল। এবার আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র একই কায়দায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ইরানের মিনাব শহরের একটি মেয়ে শিশুদের স্কুলে বোমা ছুঁড়েছে এবং হত্যা করেছে ৮৬ জন নিরপরাধ শিশুসহ তিনশতের অধিক মানুষকে ! কোথায় যুদ্ধবাজদের নোবেল পাবার অভিপ্সা আর কোথায় বিলাসী বিশ্ব নেতাদের মানব কল্যাণ সাধন করার পেছনে পাশবিক চিন্তাভাবনা, আর কোথায় মিলেয়ে গেছে মানুষের মানবিকতা!
প্রতিটি যুদ্ধের পরিসংখ্যানের পেছনে থাকে একটি করুণ মুখ, একটি আতঙ্কগ্রস্থ পরিবার ও একটি নড়বড়ে ভবিষ্যৎ। যখন শিরোনামে ভেসে ওঠে ৩২ শিশু নিহত অথবা ৮৬ জন শিশু মারা গেছে তখন তা কেবল সংখ্যা বা কষ্টের কথাই বলে না। ইতিহাসে লিখে রাখে মানব সভ্যতার সেসব ব্যর্থতার দলিল।
সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোকে ঘিরে প্রশ্ন উঠছে: রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনে শিশু নিহতের দায় যেমন মস্কোর, তেমনি ইরানে মার্কিন হামলায় শিশু মৃত্যুর দায় কি ওয়াশিংটনের নাকি সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট নীতির?
প্রথমে আসি ইউক্রেন প্রসঙ্গ নিয়ে। ২০২২ সালে রাশিয়া পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসন শুরু করার পর ইউক্রেন-জুড়ে অসংখ্য বেসামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগ উঠেছিল। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নথিতে স্কুল, হাসপাতাল ও আবাসিক ভবনে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য রয়েছে। নার্সারী স্কুলে বোমা হামলায় ৩২ শিশু নিহত হওয়ার ঘটনাও নথিবদ্ধ হয়েছে বিভিন্ন সময়। বলা হচ্ছিল, যুদ্ধের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করা জেনেভা কনভেনশনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। যুদ্ধবাজ বিশ্বনেতারা সেটা আমলে নেয়নি।
এবার আসি বর্তমান ইরান প্রসঙ্গে। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কে আবদ্ধ। ট্রাম্প প্রশাসন পরমাণু চুক্তি থেকে সরে এসে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিও অব্যাহত ছিল। নানা উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে মাত্র দু’দিন আগে ইরানের মিনাব শহরের একটি মেয়ে শিশুদের স্কুলে বোমা ছুঁড়েছে এবং হত্যা করেছে ১৮৬ জন নিষ্পাপ শিশুকে। যা টিভি- ভিডিওতে অবলোকন করে সারা বিশ্ব হতভম্ব হয়ে পড়েছে।
এতগুলো শিশু হত্যার দায়ভার কি নেবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প বা মার্কিন প্রশাসন?এখানেও তারা ফাস্ট হয়েছেন কোটি কোটি মানুষের চরম ধিক্কারের মধ্যে দিয়ে। তাহলে আমেরিকা ফার্স্ট কথাটির মর্মার্থ আসলে কী? ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শনে এই নীতি ছিল জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। বহুপাক্ষিক চুক্তির বদলে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা, আন্তর্জাতিক সংগঠনের ওপর নির্ভরতা কমানো, এবং সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে
প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা। সমর্থকদের মতে, এই নীতির লক্ষ্য ছিল আমেরিকান জনগণের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা। কিন্তু বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, যখন একটি পরাশক্তি তার স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখে, তখন কি বৈশ্বিক মানবিক দায়বদ্ধতা পিছিয়ে পড়ে না?
ট্রাম্পের সমর্থকদের মতে, এই নীতি আমেরিকাকে অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত রাখতে চেয়েছে এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সমালোচকেরা বলেন, এই নীতি বহুপাক্ষিক কূটনীতিকে দুর্বল করেছে এবং আন্তর্জাতিক জবাবদিহির কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত
করেছে।
আমেরিকা ফার্স্ট নীতির সমালোচনায় বলা হয়, এটি বৈশ্বিক সহযোগিতার বদলে একক শক্তি প্রদর্শনের ওপর জোর দেয়। কিন্তু একটি পরাশক্তির সিদ্ধান্তের প্রভাব কেবল তার সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা বিশ্বজুড়ে প্রতিধ্বনি তোলে। তাই যে কোনো সামরিক বা কূটনৈতিক পদক্ষেপে
মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। শিশুদের জীবন কোনো কৌশলগত সমীকরণের অংশ হতে পারে না।
যুদ্ধের আরেকটি কঠিন বাস্তবতা হলো, অনেক সময় সশস্ত্র গোষ্ঠী বেসামরিক অবকাঠামো ব্যবহার করে। যদি কোনো স্কুল ভবন সামরিক ঘাঁটি বা অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক আইনের সুরক্ষা হারাতে পারে যদিও তখনও হামলার ক্ষেত্রে অনুপাত ও সতর্কতা নীতি মানা
বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ, সামরিক সুবিধার তুলনায় বেসামরিক ক্ষতি অতিরিক্ত হলে তা বেআইনি বলে গণ্য হতে পারে। এই জটিলতা বোঝা ছাড়া কেবল শিরোনামের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করলে সত্য আড়াল হতে পারে।
তবু নৈতিক প্রশ্ন এড়ানো যায় না। একজন রাষ্ট্রনেতা সরাসরি বোমা ফেলেন না, কিন্তু সামরিক কৌশল, লক্ষ্য নির্ধারণের নীতিমালা ও অভিযান অনুমোদনের কাঠামো তাঁর প্রশাসনের অধীনে থাকে। যদি কোনো অভিযানে শিশু নিহত হয় এবং তদন্তে প্রমাণিত হয় যে অবহেলা বা আইন লঙ্ঘন ঘটেছে, তবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় স্বীকার করা উচিত। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বচ্ছ তদন্ত, প্রতিবেদন প্রকাশ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া এসবই জবাবদিহির অংশ।
এখানে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতার কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শিশুদের মৃত্যু প্রায়ই প্রচারণার অস্ত্র হয়ে ওঠে। একটি পক্ষ প্রতিপক্ষকে নৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে সংখ্যা ও ছবি ব্যবহার করে; কখনো তা সত্য, কখনো আংশিক সত্য, কখনো বিভ্রান্তিকর।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হলো যাচাই করা, প্রশ্ন তোলা, কিন্তু একই সঙ্গে আবেগের বশে একতরফা রায় না দেওয়া।
আমাদের সবার মনে রাখতে হবে, শিশুদের জীবন কোনো ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হতে পারে না। রাশিয়া হোক বা যুক্তরাষ্ট্র, ইরান হোক বা ইউক্রেন যে-ই হোক না কেন, স্কুলে বোমা হামলা সভ্যতার বিরুদ্ধে অপরাধ। আমেরিকা ফার্স্ট, জাতীয় নিরাপত্তা কিংবা কৌশলগত স্বার্থ, কোনো স্লোগানই একটি শিশুর প্রাণের চেয়ে বড় নয়।
যুগ যুগ ধরে যুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায়গুলো রচিত হয়েছে তখনই, যখন নিরীহ শিশুদের রক্ত রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হয়ে উঠেছে। কোনো স্কুলে বোমা হামলা, শ্রেণিকক্ষে ছিন্নভিন্ন বই-খাতা আর রক্তমাখা ব্যাগ, এই চিত্র মানবসভ্যতার জন্য চরম লজ্জার। প্রশ্ন উঠতেই পারে,
এমন কোনো নৃশংস ঘটনার দায় কি কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের একজন পাইলটের, নাকি সেই সিদ্ধান্তের উৎসে থাকা রাষ্ট্রনেতারও? যদি কোনো সামরিক অভিযানের ফলে শিশুদের প্রাণহানি ঘটে, তবে সেই দায় কি রাজনৈতিক নেতৃত্ব এড়াতে পারে?
চুপ করে থাকা রাষ্ট্রনেতাদের দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সামরিক সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে থাকে। প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বোমা ফেলেন না, কিন্তু সামরিক নীতিমালা, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের নীতি ও অনুমোদনের কাঠামো তাঁর প্রশাসনের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। ফলে কোনো অভিযানে যদি বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে, তবে তার নৈতিক ও রাজনৈতিক দায় এড়ানো কঠিন। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে ইরাক যুদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে মার্কিন প্রশাসনকে কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে।
অন্যদিকে, সমর্থকদের যুক্তি ভিন্ন। তারা বলেন, সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই স্কুল, মসজিদ বা হাসপাতালকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। অস্ত্র মজুদ বা কমান্ড সেন্টার স্থাপন করা হয় বেসামরিক স্থাপনায়, যাতে প্রতিপক্ষ হামলা করতে সংকোচ বোধ করে। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনী কঠিন দ্বিধায় পড়ে, হামলা না করলে শত্রু শক্তিশালী হবে, হামলা করলে বেসামরিক প্রাণহানির ঝুঁকি। এই জটিল বাস্তবতায় সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়। তাই যে কোনো অভিযানের বিচার করতে হলে পুরো প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিতে হবে।
তবু একটি মৌলিক নীতি অটুট থাকা উচিত: শিশুদের জীবন কোনো কৌশলগত সমীকরণের অংশ হতে পারে না। আধুনিক প্রযুক্তি, সুনির্দিষ্ট অস্ত্র এবং উন্নত গোয়েন্দা সক্ষমতার যুগে বেসামরিক প্রাণহানি কমিয়ে আনার দাবি আরও জোরালো। যদি কোথাও ভুল হয়ে থাকে, তবে সেটি স্বীকার করা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং ভবিষ্যতে এমন ভুল এড়াতে নীতিমালা সংস্কার করা, এসবই দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয়।
রাজনৈতিক বাস্তবতায় কি নেতারা সেই দায় স্বীকার করেন? অনেক সময় দেখা যায়, সরকার প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করে, পরে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়লে তদন্তের ঘোষণা দেয়। আবার কখনো অভ্যন্তরীণ তদন্তের ফল জনসমক্ষে আনা হয় না। এতে সন্দেহ ও অবিশ্বাস বাড়ে। একটি
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি তার স্বচ্ছতায়; ভুল হলে তা স্বীকার করার সাহসেই নেতৃত্বের মর্যাদা। এই প্রসঙ্গে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকাও অনস্বীকার্য।
শেষ পর্যন্ত, যুদ্ধের অন্ধকারে সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হওয়া উচিত মানবিকতা। রাজনৈতিক মতাদর্শ, কৌশলগত স্বার্থ কিংবা সামরিক সাফল্যের চেয়ে একটি শিশুর জীবন অনেক বেশি মূল্যবান। যে কোনো রাষ্ট্রনেতার জন্য এই সত্যটি স্মরণ রাখা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়,
ইতিহাসের কাছেও জবাবদিহির অঙ্গীকার। কারণ, এসব হঠকারী যুদ্ধের ঘটনায় শেষ পর্যন্ত ইতিহাস শক্তির পক্ষে না থেকে সবসময় ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষেই রায় দেয়। আর পেশীর জোর দেখিয়ে অপরের সম্পদ হরণ বা তেলক্ষেত্র দখলের লোভে ভয়ংকর মারণাস্ত্র উচিয়ে যুদ্ধ করে শিশুহত্যার মতো ঘৃণিত ঘটনার ক্ষেত্রে প্রথম স্থান অবলম্বন করাটাকে গোটা বিশ্বের বিবেকবান মানুষেরা সবসময় চরম ঘৃণার চোখে দেখে।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন।
E-mail: [email protected]