
ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি:
পাবনার ঈশ্বরদী পদ্মা নদীর তীরঘেঁষা সবুজ প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যেন দীর্ঘদিন ধরেই নীরবে প্রস্তুতি নিচ্ছিল বাংলাদেশের নতুন এক যুগের সূচনার জন্য। গত ২৮ এপ্রিল রিঅ্যাক্টরের কোরে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশের মধ্য দিয়ে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে। আর ১২ মে সফলভাবে ইউরেনিয়াম লোডিং সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে দেশের বহুল প্রতীক্ষিত প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রবেশ করেছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত প্রস্তুতির পর্যায়ে।
এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে উন্মোচিত হয়েছে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, পরিকল্পনা ও বহু স্বপ্নের বাস্তব প্রতিফলন হয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন শুধু একটি অবকাঠামো নয়; এটি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের প্রতীক।
এই মেগা প্রকল্পের শুরু থেকে বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন ড. জাহেদুল হাসান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)। রূপপুর প্রকল্পের নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক মান, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তাঁর সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো—
উত্তর: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত VVER-1200 হলো অত্যাধুনিক Generation III+ রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি, যা রাশিয়ার Rosatom কর্তৃক ডিজাইন করা। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা International Atomic Energy Agency-এর সুপারিশ অনুযায়ী “Defence-in-Depth” নীতির ভিত্তিতে এখানে বহুস্তরভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
এই প্রযুক্তিতে রয়েছে উন্নত Active Safety System, যেমন—স্বয়ংক্রিয় শাটডাউন, Emergency Core Cooling System এবং Passive Safety System, যা বিদ্যুৎ বা মানবীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই দীর্ঘ সময় রিঅ্যাক্টরকে নিরাপদ রাখতে সক্ষম। এছাড়া Double Containment Structure, Core Catcher, Hydrogen Recombiner এবং একাধিক Redundant Safety System সংযোজন করা হয়েছে, যা পুরোনো প্রযুক্তির তুলনায় এটিকে অনেক বেশি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য করেছে।
বিশেষভাবে, ২০১১ সালের Fukushima Daiichi nuclear disaster থেকে শিক্ষা নিয়ে ডিজাইনে অতিরিক্ত নিরাপত্তা সংযোজন করা হয়েছে। ফলে সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা বা Station Blackout হলেও রিঅ্যাক্টর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঠান্ডা রাখা, হাইড্রোজেন বিস্ফোরণ প্রতিরোধ এবং দীর্ঘ সময় নিরাপদ অবস্থায় রাখার সক্ষমতা রয়েছে।
উত্তর: পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মূলত IAEA-এর Safety Standards অনুসরণ করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো Defence-in-Depth, যেখানে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পর্যায়ক্রমে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হয়।
এছাড়া তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ন্ত্রণ, ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতা, সাইবার ও ফিজিক্যাল সিকিউরিটি নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা শর্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রূপপুর প্রকল্পে সাইট নির্বাচন থেকে শুরু করে ডিজাইন, নির্মাণ, ইনস্টলেশন, কমিশনিং এবং প্রি-অপারেশনাল প্রতিটি ধাপে আন্তর্জাতিক মান কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে IAEA-এর Site Review, Safety Review এবং Operational Readiness Review-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক মিশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
তবে পারমাণবিক নিরাপত্তা একটি চলমান প্রক্রিয়া। অপারেশন শুরু হওয়ার পরও নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পরিদর্শন, প্রযুক্তি আপডেট এবং Safety Culture উন্নয়নের কাজ অব্যাহত থাকবে।
উত্তর: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি অত্যন্ত আধুনিক, স্বয়ংক্রিয় ও বহুস্তরভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এই প্লান্টে ৭ হাজারেরও বেশি Interlock এবং বিভিন্ন Safety Function সংযুক্ত রয়েছে, যা কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করবে।
এমনকি চরম পরিস্থিতিতে প্লান্টে কোনো অপারেটর উপস্থিত না থাকলেও সিস্টেম নিজেই রিঅ্যাক্টর নিরাপদভাবে Shutdown করে নিরাপদ অবস্থায় রাখতে সক্ষম।
প্লান্টের সব গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার Main Control Room থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি Bangladesh Atomic Energy Regulatory Authority (বায়েরা) নিয়মিতভাবে পুরো কার্যক্রম তদারকি করবে।
এছাড়া IAEA-এর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিশন, বিশেষ করে pre-OSART Mission ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের মূল্যায়ন অব্যাহত থাকবে।
উত্তর: বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ চুক্তির মাধ্যমে অর্থায়নের বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে।
নির্মাণ পর্যায়ে বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ছিল Soil Stabilization। উন্নত প্রকৌশল কৌশল ব্যবহার করে মাটিকে Semi-Rock অবস্থায় রূপান্তর করা হয়েছে, যাতে এটি উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল হয়।
এছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে যন্ত্রপাতি উৎপাদন ও পরিবহন প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরি হয়েছিল। বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে তা মোকাবিলা করা হয়েছে।
অন্যদিকে COVID-19 pandemic-এর সময়ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত কর্মী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাওয়া হয়।
উত্তর: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে জাতীয় গ্রিডের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সাধারণত বেসলোড বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, তাই গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি ও লোড ব্যালান্স ঠিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ জন্য Power Grid Company of Bangladesh, Bangladesh Power Development Board এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একসঙ্গে কাজ করছে। জাতীয় গ্রিড শক্তিশালী করতে নতুন ট্রান্সমিশন লাইন, সাবস্টেশন ও আধুনিক Grid Management System বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এছাড়া দক্ষ মানবসম্পদ ধরে রাখা, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ এবং শক্তিশালী Safety Culture বজায় রাখাও ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ।
উত্তর: ইউনিট-১ পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা হয়েছে। ইতোমধ্যে এক হাজারের বেশি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে, যা রাশিয়ার উন্নত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং Novovoronezh Nuclear Power Plant-এ পরিচালিত হয়েছে।
প্রশিক্ষণের মধ্যে ছিল ক্লাসরুম লেকচার, সিমুলেটর ট্রেনিং এবং অন-দ্য-জব ট্রেনিং। প্রশিক্ষণ শেষে পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের Independent Work Permit (IWP) প্রদান করা হয়েছে।
বর্তমানে ৫১ জন কর্মকর্তা বায়েরার লাইসেন্স অর্জন করেছেন। এছাড়া ১,৫০০-এর বেশি কর্মী বিভিন্ন অপারেশনাল ও সহায়ক দায়িত্বে কাজ করছেন।
উত্তর: ধাপে ধাপে দেশীয় দক্ষ জনবল সম্পূর্ণভাবে সম্পৃক্ত হলে পরিচালন ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য Cost Efficiency অর্জন করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অনুযায়ী নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে লোকাল সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপারেশনাল ব্যয় ধীরে ধীরে কমে আসে।
বর্তমানে বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ওপর নির্ভরতা থাকায় ব্যয় তুলনামূলক বেশি। তবে দেশীয় জনবল পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করলে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
উত্তর: রূপপুর প্রকল্পের জন্য রাশিয়ার পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান TVEL-এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি Framework Agreement স্বাক্ষর করা হয়েছে।
এই চুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা বা সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই।
উত্তর: তাত্ত্বিকভাবে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির সুযোগ রয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা, ডিজাইন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং বায়েরার লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
এছাড়া IAEA-এর নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। এসব অতিরিক্ত প্রক্রিয়ার কারণে জ্বালানির খরচ কিছুটা বাড়তে পারে।
উত্তর: জ্বালানি লোডিংয়ের প্রায় এক বছর পর ব্যবহৃত জ্বালানি বা Spent Fuel রিঅ্যাক্টর থেকে বের করা হবে। এরপর তা বিশেষভাবে ডিজাইন করা Spent Fuel Pool-এ সংরক্ষণ করা হবে, যেখানে পানি দ্বারা কুলিং ও Radiation Shielding নিশ্চিত থাকবে।
এই পুলে প্রায় ১০ বছর পর্যন্ত নিরাপদে বর্জ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে- যে রাশিয়া বর্জ্য ফেরত নিয়ে যাবে।
উত্তর: রূপপুর প্রকল্পে ইতোমধ্যে উন্নত প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও দক্ষ জনবল প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে বাস্তব অপারেশনাল অভিজ্ঞতা, Maintenance Optimization এবং Safety Culture আরও শক্তিশালী হওয়ার মাধ্যমে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই রূপপুর পূর্ণাঙ্গ ও টেকসই সক্ষমতা অর্জন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।