বুধবার | ৩ জুন, ২০২৬ | ২০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

শিরোনাম
ডিগ্রি, পদমর্যাদা আর সাফল্যের আড়ালে এক মায়ের নিঃসঙ্গ মৃত্যু মিরপুরে প্রবীণ শিক্ষিকা মায়ের করুণ মৃত্যু, তদন্তে পুলিশ নাটোরে অবৈধ পুকুর খননের বিরুদ্ধে মধ্যরাতের অভিযান, এক ব্যক্তির কারাদণ্ড লালপুরে সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি গ্রেফতার লালপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে নবাগত ইউএনও’র মতবিনিময় লালপুরে চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির হিড়িক, আতঙ্কে সাধারণ মানুষ গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বিএনপির বিকল্প নাই —— হুইপ দুলু গণতন্ত্র রক্ষায় সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান দুলুর জীবিত জিয়ার চেয়ে শহীদ জিয়া আজ বেশি শক্তিশালী – দুলু লালপুরে জুট মিলে চার ঘণ্টার তাণ্ডব, ৮৩ লাখ টাকার মালামাল লুটের অভিযোগ

ডিগ্রি, পদমর্যাদা আর সাফল্যের আড়ালে এক মায়ের নিঃসঙ্গ মৃত্যু

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ :

একজন মা। যিনি সারাজীবন সন্তানদের মানুষ করতে নিজের স্বপ্ন, আরাম-আয়েশ ও ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াকে বিসর্জন দিয়েছেন। সন্তানদের শিক্ষিত করেছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন সমাজের উচ্চ আসনে। হয়তো ভেবেছিলেন, বার্ধক্যের দুর্বল দিনগুলোতে সেই সন্তানদের ভালোবাসা ও যত্নই হবে তাঁর সবচেয়ে বড় আশ্রয়। কিন্তু বাস্তবতা যেন নির্মমভাবে ভিন্ন এক গল্প লিখে দিল।
রাজধানীর মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা নূর জাহান বেগমের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ঘটনা নয়, এটি যেন পুরো সমাজের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে—আমরা কি ক্রমেই আমাদের মানবিকতা হারিয়ে ফেলছি?
গত ৩১ মে মিরপুরের একটি ফ্ল্যাট থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাটি আলোচনায় আসে যখন জানা যায়, যে কক্ষে তিনি থাকতেন সেটি ছিল অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন। মরদেহে পচন ধরেছিল, শরীরের কিছু অংশে পোকাও দেখা গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মৃত্যুর কয়েক দিন পর বিষয়টি সামনে আসে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে নূর জাহান বেগমের পারিবারিক পরিচয়। তাঁর সন্তানরা সবাই উচ্চশিক্ষিত ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত। একজন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, একজন দেশের শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং একজন স্কুলশিক্ষক। অথচ সেই মায়ের শেষ জীবন কেটেছে এমন এক পরিবেশে, যা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলছেন প্রতিবেশী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। কয়েকদিন আগে মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আযহা পালিত হয়েছে। এত বড় একটি আনন্দ উৎসবের দিনেও হয়তো সন্তানেরা মায়ের খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। কতদিন ধরে সন্তানদের সঙ্গে এই দুঃখিনী মায়ের কোন কথা হয়নি তা হয়তো অজানায থেকে যাবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বৃদ্ধা দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছিলেন। অনেকে তাঁকে খুব কমই বাইরে দেখতে পেতেন। মৃত্যুর পর যে কক্ষ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই কক্ষের অবস্থা দেখে বিস্মিত হয়েছেন এলাকাবাসীও।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিও ও ছবি জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অসংখ্য মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন – প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কি সত্যিই মানুষকে মানবিক করে তুলছে? নাকি আমরা কেবল পেশাগত সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে পারিবারিক দায়িত্ববোধ হারিয়ে ফেলছি?
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। নগরজীবনের ব্যস্ততা, ব্যক্তি-কেন্দ্রিক জীবনধারা এবং পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা প্রবীণদের ক্রমেই একা করে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই বাবা-মা জীবনের শেষ সময়ে শারীরিকভাবে বেঁচে থাকলেও মানসিকভাবে হয়ে পড়েন পরিত্যক্ত।
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোয় মা-বাবার প্রতি দায়িত্ববোধ সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবীণদের অবহেলা, একাকিত্ব এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে সামনে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক মর্যাদা যতই বাড়ুক, পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা না থাকলে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এ বিষয়ে প্রবীণ সাংবাদিক আলাউদ্দিন জালাল বলেন, একটি রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোর মৌলিক একক হল পরিবার। বিখ্যাত মহীয়সী নারী মাদার তেরেসা বৃদ্ধ, অসহায় ও দুস্থ মানুষদের জন্য গড়ে তুলেছিলেন নির্মল হৃদয় নামের এক মাতৃ আশ্রয়স্থল। সে সময় তিনি বলেছিলেন, আমরা হয়তো সমাজের খুব কম মানুষকেই সেবা শুশ্রূষা দিতে পারছি। কিন্তু এটা নিঃসঙ্গ অসহায় মানুষদের ভবিষ্যৎ নয়। এ দায়িত্ব পরিবারকেই নিতে হবে। তাছাড়া সমাধান আসবে না।
তিনি আরো বলেন, পরিবারে নৈতিকতা ও ধর্মীয় শিক্ষার চর্চা করতে হবে। মানবিক মানুষ না হয়ে উঠলে এমন ঘটনা হয়তো ভবিষ্যতে আরও দেখা যাবে যা মোটেই কাম্য নয়।
নূর জাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় আইনগত তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে। কিন্তু আইনি তদন্ত যাই বলুক না কেন, এই মৃত্যু ইতোমধ্যেই সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছে।
কারণ, এটি কেবল একজন বৃদ্ধার মৃত্যু নয়। এটি সেই প্রশ্নের প্রতিধ্বনি, যার উত্তর খুঁজছে পুরো সমাজ। একজন মা তাঁর সন্তানদের জন্য জীবন উৎসর্গ করার পর, শেষ বয়সে তিনি আসলে কী পাওয়ার অধিকার রাখেন?
সম্ভবত উত্তরটি খুব জটিল নয়। একজন মা নিশ্চয়ই খুব বেশি অর্থ, সম্পদ কিংবা সামাজিক মর্যাদা প্রত্যাশা করেন না। তিনি চান একটু খোঁজ, একটু যত্ন, আর ভালোবাসার একটি হাত।
নূর জাহান বেগমের করুণ পরিণতি সেই সহজ সত্যটিকেই আবারও সামনে এনে দিয়েছে।

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.