
-আমিনুল ইসলাম শামীম।।
Cost of Loyalty — ষষ্ঠ পর্ব
বাবার ড্রয়ারের দশ টাকা।
আমরা চার ভাই, দুই বোন। ছয় ভাইবোনের সংসারে আমি চতুর্থ, ভাইদের মধ্যে দ্বিতীয়। বাবা মরহুম জনাব আব্দুল মালেক, মা মরহুমা খালেদা খানম চৌধুরী। আমাদের বেড়ে ওঠা ছিল একটি সচ্ছল, সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে—যেখানে প্রাচুর্য ছিল না, কিন্তু অভাবও ছিল না।
বড় হতে হতে বাবা-মায়ের ভালোবাসার দুই রকম ভাষা বুঝতে শিখেছিলাম।
মা ছিলেন কোমল হৃদয়ের মানুষ। আজও মনে পড়ে না, কোনোদিন আমাদের গায়ে হাত তুলেছেন। বকাঝকা করলেও তার মধ্যে ছিল মায়া। মায়ের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা, দুষ্টুমি—সবই চলত অবলীলায়। তিনি ছিলেন আমাদের সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
বাবা ছিলেন ঠিক তার উল্টো। গম্ভীর, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, নীরব একজন মানুষ। ছোটবেলায় বাবাকে হেসে গল্প করতে দেখেছি—এমন স্মৃতি খুব একটা নেই। শুধু আমরা নয়, আমাদের পাড়ার বড় ভাইরা, এমনকি অনেক চাচারাও বাবাকে সমীহ করতেন। কিন্তু সেই কঠোর মুখের আড়ালে ছিল অসাধারণ মানবিকতা। পাড়ায় কারও বিপদ হলে সবার আগে এগিয়ে যেতেন। সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন—বেতনে সংসার চলবে না বলে। এরপর একের পর এক ব্যবসা করেছেন। কোনো ব্যবসায় খুব ব্যর্থ হননি, কিন্তু একটি ব্যবসাকে বড় করার আগেই আরেকটি নতুন উদ্যোগে ঝুঁকে পড়তেন।
আমাদের ছোটবেলার একটা দৃশ্য আজও চোখে ভাসে।
প্রতিদিন ফজরের নামাজ পড়ে বাবা নাস্তা খেয়ে একটু বিশ্রাম নিতেন। আমরা গোসল করে স্কুলের পোশাক পরে প্রস্তুত হতাম। বের হওয়ার আগে বাবাকে ডাকতাম—
আব্বা, স্কুলে যাব। টাকা দেন।
স্কুলের টিফিনের জন্য বরাদ্দ ছিল দশ টাকা।
কখনো বাবা আধো ঘুমের মধ্যে বালিশের নিচ থেকে দশ টাকার নোট বের করে দিতেন। আবার কখনো হাতে একটা চাবি দিয়ে বলতেন,
আলমারির ড্রয়ার খুলে দশ টাকা নিয়ে নাও।
ওই আলমারিটা ছিল যেন আমাদের শৈশবের এক বিস্ময়। পুরোনো কারুকাজ করা কাঠ, বেলজিয়ামের কাঁচ বসানো দরজা। অনেকগুলো ড্রয়ার ছিল, কিন্তু একটা ড্রয়ারের নামই ছিল—“আব্বার ড্রয়ার।”
ড্রয়ার খুলে দেখতাম—একশ টাকার নোট, দশ টাকা, বিশ টাকা, পাঁচ টাকা, কিছু খুচরা পয়সা, আর বাবার ব্যক্তিগত কাগজপত্র। আমি সেখান থেকে শুধু দশ টাকা নিয়ে ড্রয়ার বন্ধ করে তালা লাগিয়ে চাবি বাবার হাতে দিয়ে স্কুলে চলে যেতাম।
এভাবেই কেটে গেল অনেক বছর।
স্কুল শেষ হলো, বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হলো, চাকরি, বিয়ে, সংসার—জীবন অনেক দূর এগিয়ে গেল।
এক ঈদের ছুটিতে বাড়ি গেছি। বাবা তখন আশির কোঠায়, অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। বড় ভাই বিদেশ থেকে বাবার সব প্রয়োজনের খেয়াল রাখতেন। আমরা কখনো টেরই পাইনি যে বাবা-মায়ের জন্য আলাদা কিছু করা দরকার। তারা কখনো আমাদের কাছে কিছু চানওনি।
সেদিন বাবা বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে ছিলেন। আমি পাশে বসে বাবার পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম।
বাবা বললেন,
কিরে শামীম, কেমন আছিস? ঢাকায় কোনো সমস্যা নেই তো? আল্লাহর ওপর ভরসা রাখিস। কর্মজীবনে সততা ধরে রাখবি।
কথার মাঝখানে হঠাৎ বহু বছরের পুরোনো একটা প্রশ্ন মনে এলো।
আমি বললাম,
আব্বা, একটা কথা কোনোদিন জিজ্ঞেস করা হয়নি। ছোটবেলায় যখন আপনি ড্রয়ারের চাবি দিয়ে বলতেন, “দশ টাকা নিয়ে নাও”—আপনার কি কখনো সন্দেহ হয়নি, আমি দশ টাকার বেশি নিয়েছি কিনা?
বাবা ধীরে ধীরে উঠে বসলেন। গভীর চোখে আমার দিকে তাকালেন। তখন আমার নিজেরও দুই সন্তান।
তারপর তিনি এমন একটা উত্তর দিলেন, যা আজও আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
বাবা বললেন,
সন্তান মানুষ করা খুব সহজ কাজ নয়। যেদিন তোকে চাবি দিতাম, তার আগের রাতে আমি ড্রয়ারের সব টাকা গুনে হিসাব করে রাখতাম। একেক দিন একেক ছেলেকে চাবি দিতাম। তোরা স্কুলে চলে গেলে আমি আবার ড্রয়ার খুলে মিলিয়ে দেখতাম—দশ টাকা নিয়েছিস, না তার বেশি।
আমি নিঃশব্দ হয়ে গেলাম।
ধীরে জিজ্ঞেস করলাম,
আব্বা… কোনোদিন কি আমাকে বেশি টাকা নিতে দেখেছেন?
বাবা হালকা হাসলেন।
না। তোকে কোনোদিনও দশ টাকার বেশি নিতে পাইনি।
আমি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম। শৈশবের অসংখ্য সকাল চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। মনে করার চেষ্টা করলাম—কোনোদিন কি লোভে পড়েছিলাম? মনে পড়ল না।
জীবনে বাবার অনেক কথা শুনিনি। অনেক অবাধ্য হয়েছি। অনেক সিদ্ধান্তে তাঁর সঙ্গে একমত হইনি। কিন্তু আজ মনে হলো—জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটিতে আমি ফেল করিনি।
আজ বুঝি, লয়ালটি শুধু বড় বড় ত্যাগের নাম নয়। কখনো কখনো লয়ালটি মানে—কেউ না দেখলেও নিজের প্রাপ্যের বাইরে একটি টাকাও না নেওয়া।
বাবার সেই ড্রয়ার ছিল টাকার ড্রয়ার নয়; ছিল সততা আর বিশ্বাসের পরীক্ষার হল।
সেদিন বাবা আমাকে শুধু দশ টাকা দেননি—একটি উত্তরাধিকার দিয়েছিলেন। সেই উত্তরাধিকার হলো ইন্টেগ্রিটি।
এই লয়ালটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ুক—এটাই আমার প্রার্থনা। বাবার বিশ্বাস যেন আমার ভেতরে আজও অক্ষুণ্ণ থাকে, আর বাকি জীবনও থাকে।
* আমিনুল ইসলাম শামীম: শাবি, প্রথম ব্যাচ।