| |

মিথ্যা যখন দেখতে সত্যের মতো হবে

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
একসময় মানুষ বলত, চোখে দেখা জিনিসই আসল বিশ্বাস। ছবিকে ধরা হতো ঘটনার সাক্ষী হিসেবে, কণ্ঠস্বরকে ব্যক্তির পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবে, ভিডিওকে বাস্তবতার দৃশ্যমান দলিল হিসেবে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ সেই পুরোনো নিশ্চয়তাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। এখন চোখের সামনে দেখা ছবি সত্য নাও হতে পারে, কানে শোনা কণ্ঠস্বর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাও হতে পারে, ভিডিওতে দেখা ঘটনাও বাস্তবে ঘটেনি, এমনকি কোনো মানুষের মুখ ও কণ্ঠ ব্যবহার করে এমন বক্তব্যও তৈরি করা সম্ভব, যা তিনি কখনো বলেননি। তাহলে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের বাণী কি ফলতে শুরু করেছে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত উত্থান এবং ২০৩০ সালকে ঘিরে ‘জ্যাকব’-এর নামে প্রচারিত মহাপ্রলয়ের আশঙ্কা অনেকের মনে একটি ধর্মীয় প্রশ্নও জাগাচ্ছে। তা হলো, বর্ণিত কিয়ামত ও মানবজাতির বিপর্যয়ের সতর্কবাণী কি তবে বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে? পবিত্র কোরআনে সরাসরি এধরনের আয়াত নেই। তবে মিথ্যা, সত্যকে আড়াল করা এবং সত্য-মিথ্যার বিভ্রান্তি সম্পর্কে কোরআনে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবাণী রয়েছে। যেমন, সূরা আল-বাকারা, ২:৪২: “তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশিয়ে দিও না এবং জেনে-শুনে সত্য গোপন করো না।” সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৩০: “মিথ্যা কথা থেকে বেঁচে থাকো।” সূরা আন-নাহল, ১৬:১০৫: যারা আল্লাহর আয়াত বিশ্বাস করে না, তারাই মিথ্যা রচনা করে।
এখানেই এআই যুগের সবচেয়ে গভীর সামাজিক সংশয় সামনে এসে গেছে। মিথ্যা যখন সত্যের মতো দেখতে মনে হচ্ছে, তখন মানুষ কাকে বিশ্বাস করবে? এআই কি তবে অবিশ্বাসের যুগ শুরু করে দিয়েছে? উত্তরটি সরল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নয়। এআই নিজে অবিশ্বাসের যুগের জন্য দায়ী নয়। বরং এআই এমন একটি প্রযুক্তিগত ক্ষমতা তৈরি করেছে, যার অপব্যবহার মানুষের বহু পুরোনো মিথ্যা, প্রতারণা ও প্রচারণাকে আগের তুলনায় বহুগুণ শক্তিশালী করে তুলতে পারে। ফলে সংকটটি প্রযুক্তির চেয়ে বেশি বিশ্বাসের সংকট।
আজকাল ছবির ওপরও মানুষের বিশ্বাস ভেঙে যাচ্ছে। একটি ছবি দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবতার শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কোনো দুর্ঘটনা, যুদ্ধ, রাজনৈতিক সমাবেশ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি, ছবির মাধ্যমে আমরা তার দৃশ্যমান প্রমাণ পেতাম। এআই-উৎপাদিত ছবি, ভিডিও সেই ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। আলো-ছায়া, মুখাবয়ব, পোশাক, পরিবেশ—সবকিছু এমনভাবে সাজানো যায় যে সাধারণ দর্শকের পক্ষে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে, ছবিটি বাস্তব নাকি কৃত্রিম।
এর ফলে একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। আগে সমস্যা ছিল মিথ্যাকে সত্য বলে বিশ্বাস করা। এখন নতুন সমস্যা হচ্ছে, সত্যকেও মিথ্যা বলে অস্বীকার করা। এটি আরও ভয়ংকর। কারণ কোনো ভুয়া ছবি ছড়িয়ে একজন নিরপরাধ মানুষকে অভিযুক্ত করা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি কোনো সত্যিকারের ছবি দেখিয়ে বলা, ‘এটিও তো এআই দিয়ে বানানো’, এমন প্রবণতাও সমাজের সত্য যাচাইয়ের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।
নকল ভিডিও আছে, কিন্তু ঘটনাটি ঘটেনি। ভিডিওকে একসময় ছবির চেয়েও শক্তিশালী প্রমাণ মনে করা হতো। কারণ ভিডিওতে ঘটনা চলমান অবস্থায় দেখা যায়। কিন্তু জেনারেটিভ এআই সেই নিশ্চয়তাকেও চ্যালেঞ্জ করেছে।
একজন রাজনৈতিক নেতা এমন কথা বলেছেন, এমন ভিডিও তৈরি করা সম্ভব, যা তিনি কখনো বলেননি। কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তার কণ্ঠস্বর নকল করে বক্তব্য তৈরি করা সম্ভব। কোনো পরিচিত ব্যক্তিকে এমন পরিস্থিতিতে দেখানো সম্ভব, যেখানে তিনি কখনো ছিলেনই না।
এ ধরনের কনটেন্টকে সাধারণভাবে ডিপফেক বা সিনথেটিক মিডিয়ার বিস্তৃত পরিসরের মধ্যে দেখা হয়। এখানে বিপদের মাত্রা বোঝার জন্য একটি সাধারণ উদাহরণ যথেষ্ট।
ধরা যাক, নির্বাচনের আগের রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল। সেখানে একজন প্রার্থীকে একটি আপত্তিকর বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে। ভিডিওটি লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে গেল। পরে প্রমাণ হলো ভিডিওটি কৃত্রিম। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি হয়ে গেছে।
এআইয়ের সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র হলো অবিশ্বাস তৈরী। মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রচলিত ধারণা ছিল, মিথ্যা শনাক্ত করে মানুষকে সত্য জানানো। কিন্তু এআই-যুগে আরেকটি বিপজ্জনক কৌশল দেখা দিতে পারে—সত্য-মিথ্যা উভয়কেই সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেওয়া। একজন রাজনীতিকের বিরুদ্ধে সত্যিকারের কোনো ভিডিও প্রকাশিত হলো। তিনি দাবি করলেন, ‘এটি এআই দিয়ে তৈরি।’
কোনো কর্মকর্তার দুর্নীতির প্রকৃত অডিও প্রকাশিত হলো। বলা হলো, ‘কণ্ঠস্বর নকল করা হয়েছে।’ কোনো নির্যাতনের সত্যিকারের ছবি প্রকাশিত হলো। পাল্টা বলা হলো, ‘এটি এআই- জেনারেটেড।’ অর্থাৎ ভবিষ্যতের প্রতারককে সবসময় নিখুঁত মিথ্যা বানাতেও হবে না। কখনো কখনো শুধু সত্যকে সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেওয়াই যথেষ্ট। এ কারণেই এআইয়ের যুগে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়তো তথ্য নয়, তা হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতা।
এতে নির্বাচন ও গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকি রয়েছে। গণতান্ত্রিক সমাজে ভোটারের সিদ্ধান্ত তথ্যের ওপর নির্ভর করে। সেই তথ্য যদি পরিকল্পিতভাবে বিকৃত করা যায়, তাহলে নির্বাচনের পরিবেশও প্রভাবিত হতে পারে। একজন প্রার্থীকে নিয়ে মিথ্যা বক্তব্য, ভুয়া ভিডিও, নকল ছবি, কৃত্রিম অডিও কিংবা সমন্বিত গুজব, এসব ভোটারের ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশেষ করে নির্বাচনের ঠিক আগে কোনো ভুয়া কনটেন্ট ভাইরাল হলে সত্য সংশোধনের সময় খুব কম থাকে। ফলে এআই-যুগের নির্বাচনী নিরাপত্তা শুধু ব্যালট বাক্স বা ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; তথ্যপরিবেশের নিরাপত্তাও গণতন্ত্রের নিরাপত্তার অংশ।
আজকাল ব্যক্তিমানুষের সম্মান কোথায়? এআইয়ের আরেকটি ভয়ংকর দিক ব্যক্তিগত মর্যাদা ও গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত। কারও মুখ ব্যবহার করে ভুয়া ছবি তৈরি করা, কারও কণ্ঠস্বর নকল করা, কাউকে এমন বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করা যা তিনি দেননি। এসব একজন মানুষের সামাজিক পরিচয়, কর্মজীবন ও সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বিশেষ করে নারী, শিশু, শিক্ষার্থী এবং জনপরিচিত ব্যক্তিরা এর ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। একটি মিথ্যা ছবি কয়েক ঘণ্টায় লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু সেটি মুছে ফেলার পরও মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা যায় না। এখানে তাই প্রশ্নটি শুধু প্রযুক্তিগত নয়, এটা মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন।
এজন্য বাংলাদেশ কি প্রস্তুত? বাংলাদেশেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার ব্যাপক। ফলে এআই-উৎপাদিত ভুয়া ছবি, ভিডিও, অডিও ও গুজবের সম্ভাব্য প্রভাবকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের প্রয়োজন প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি ব্যাপক ডিজিটাল ও মিডিয়া লিটারেসি। বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে— কীভাবে ভুয়া ছবি শনাক্ত করতে হয়, কীভাবে তথ্যের উৎস যাচাই করতে হয়, কীভাবে ভাইরাল ভিডিওর পুরোনো বা ভিন্ন প্রেক্ষাপট শনাক্ত করতে হয়, কখন কোনো তথ্য শেয়ার করা উচিত নয়, এবং এআই-উৎপাদিত কনটেন্ট সম্পর্কে কীভাবে সতর্ক থাকতে হয়।
তাহলে কি আমরা অবিশ্বাসের যুগে ঢুকে পড়েছি? আংশিকভাবে, হ্যাঁ—তবে এটি অবশ্যম্ভাবী নয়। এআই আমাদের বিশ্বাসের পুরোনো ভিত্তিগুলোকে দুর্বল করেছে, কিন্তু নতুন ভিত্তি তৈরি করার সুযোগও দিয়েছে। ইতোমধ্যে এআই ও জ্যাকবের ২০৩০ সালের মহাপ্রলয়ের আশঙ্কা নিয়ে কথা শুরু হয়েছে। ২০৩০ সালকে ঘিরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে মানুষের কৌতূহল যেমন বাড়ছে, তেমনি তৈরি হচ্ছে ভয়ও। যেখানে দাবি করা হয়, প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ, জলবায়ু বিপর্যয়, যুদ্ধ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার মানবসভ্যতাকে ভয়াবহ সংকটে ফেলতে পারে। তবে এসব ভবিষ্যদ্বাণীকে বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই।
বাস্তব আশঙ্কা অবশ্য অন্য জায়গায়। এআই ইতিমধ্যে তথ্য, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, সামরিক প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা ও মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিকে বদলে দিচ্ছে। ভুল তথ্য ও ডিপফেক যদি সত্যের মতো বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে, তাহলে সমাজে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।
স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, ব্যাপক নজরদারি কিংবা পক্ষপাতদুষ্ট অ্যালগরিদমও মানবাধিকারের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
অতএব ২০৩০-এর ‘মহাপ্রলয়’ আসবে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন নয়। আসল প্রশ্ন হলো—মানুষ কি এআইকে দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করতে পারবে? প্রযুক্তি নিজে ধ্বংসের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না; মানুষের নীতি, নিয়ন্ত্রণ, নৈতিকতা ও ব্যবহারের ওপরই অনেকটাই নির্ভর করে ভবিষ্যৎ।
কোরআনে কিয়ামতের সময় নির্ধারণ করে কোনো সাল ঘোষণা করা হয়নি। বরং বলা হয়েছে, “কিয়ামতের জ্ঞান তো কেবল আল্লাহর কাছেই।” (সূরা লুকমান, ৩১:৩৪)। ফলে ২০৩০ সালেই মহাপ্রলয় ঘটবে, এমন দাবি ইসলামী আকিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মানুষের তৈরি কোনো ভবিষ্যদ্বাণীকে কোরআনের বাণীর সমতুল্য করাও সঠিক নয়।
তবে কোরআনের সতর্কবাণীগুলোর আলোকে বর্তমান পৃথিবীর দিকে তাকালে উদ্বেগের কারণ অবশ্যই আছে। যুদ্ধ, পরিবেশ ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন, সম্পদের বৈষম্য, মিথ্যা তথ্য এবং মানুষের হাতে প্রযুক্তির বিপজ্জনক ব্যবহার সভ্যতার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। এআই সেই ঝুঁকিকে আরও তীব্র করতে পারে। বিশেষত যখন মানুষ নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ বিসর্জন দিয়ে প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
এআইকে নিষিদ্ধ করে এই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং এআইয়ের ভালো ব্যবহারকে উৎসাহিত করে এবং অপব্যবহার মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়িয়ে এগোতে হবে। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো মানুষের সচেতনতা। মানবসভ্যতার সামনে তাই নতুন নৈতিক দায়িত্ব তৈরি হয়েছে। আর কোনো সভ্যতার জন্য এর চেয়ে বড় সংকট খুব কমই আছে। মিথ্যা যখন সত্যের মতো দেখতে হয়, তখন সত্যকে রক্ষা করার শেষ দুর্গটি প্রযুক্তি নয়, মানুষের বিচারবোধ।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.