
-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
হিমালয়ের কোলে শান্ত, স্নিগ্ধ, নৈসর্গিক এক দেশ নেপাল। তুষারঢাকা শৃঙ্গ, বৌদ্ধ স্তূপ, পাহাড়ি নদী, সবুজ উপত্যকা আর সরল মানুষের জীবনযাপন, নেপালের এই চিরচেনা ছবিই দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের মনে গেঁথে আছে। অথচ সেই নেপাল আজ গভীর শোকে স্তব্ধ। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা বরফ, শিলা, কাদা ও পানির ভয়াবহ স্রোত মুহূর্তে জনপদ, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে বিপর্যস্ত করেছে। হাজার হাজার পরিবার এখনো প্রিয়জনের অপেক্ষায়। এতদিন পরও কেউ জানেন না নিখোঁজ মানুষটি কোথায়, নদীর স্রোতে, ধ্বংসস্তূপের নিচে, নাকি কোনো অন্ধকার সুড়ঙ্গে।
গত ২৬ আগস্ট ২০২৬ নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ/বরফ-শিলা ধসের পর সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। বরফ, পাথর, কাদা ও পানির প্রবল প্রবাহ নদীর গতিপথের বিস্তীর্ণ এলাকায় আঘাত হানে। সীমান্তবর্তী জনপদ থেকে শুরু করে ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী এলাকা পর্যন্ত বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়। এটি কেবল একটি বন্যা, অন্যদিকে একযোগে মানবিক, অবকাঠামোগত ও পরিবেশগত সংকট তৈরী করেছে।
গত ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে নেপালে মৃতের সংখ্যা ১,৪০০-এর বেশি এবং নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় ৫,০০০ বলে জানা গেছে। একটি প্রতিবেদনে নেপালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী ১,২৯৪ জনের মরদেহ উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে; অন্য একটি সর্বশেষ প্রতিবেদনে মৃতের সংখ্যা ১,৩৪৪-এ পৌঁছানোর কথা জানানো হয়েছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় সংখ্যাগুলো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আর নিখোঁজের তালিকায় শুধু নেপালিরাই নেই। তিব্বতেও প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। ফলে এই দুর্যোগের মানবিক পরিসর সীমান্ত ছাড়িয়ে গেছে।
ত্রিশূলীর তাণ্ডব এবং ভেঙে পড়া অবকাঠামো এখন কালের স্ক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ত্রিশূলী নদী নেপালের অর্থনীতি, জনজীবন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বরফ-শিলা ও কাদার প্রবাহ সেই নদী অববাহিকাকে পরিণত করেছে ধ্বংসের করিডরে।
সড়ক বিচ্ছিন্ন হয়েছে, সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বসতি কাদামাটি ও ধ্বংসাবশেষে চাপা পড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ক্ষতির একটি ক্ষেত্র হলো জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো। ত্রিশূলী নদী ও আশপাশের এলাকায় একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এটি নিছক অবকাঠামোগত ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে যুক্ত আছে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনের প্রশ্ন।
পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিতে বড় অবকাঠামো নির্মাণের আগে ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি, সম্ভাব্য হিমবাহধস, আকস্মিক বন্যা, নদীর বহনক্ষমতা এবং সুড়ঙ্গের নিরাপত্তা, এসব বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নয়ন প্রয়োজন, জলবিদ্যুৎও প্রয়োজন। কিন্তু উন্নয়ন যদি ঝুঁকিকে অস্বীকার করে, তাহলে একদিন সেই উন্নয়নই দুর্যোগের সামনে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গগুলো। অন্ধকার সুড়ঙ্গে আটকে থাকা জীবনের অপেক্ষা বড়ই করুণ। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে প্রায় ৯০০ কর্মী ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে নিখোঁজ ছিলেন; তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন সুড়ঙ্গে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হয়। কাদা, পাথর, ধসে পড়া অবকাঠামো ও পানিতে ভরা সুড়ঙ্গের কারণে উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
কিন্তু এখানেই নেপালের অন্ধকারে আলো জ্বালিয়েছে এক অবিশ্বাস্য উদ্ধার অভিযান। গত ৪ সেপ্টেম্বর ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে সঞ্জয় সাহ ও কবির মহারাজন নামে দুই কর্মীকে নয় দিন পর জীবিত উদ্ধার করা হয়। তাঁরা কাদা ও ধ্বংসাবশেষে আটকে ছিলেন। একজনের শারীরিক অবস্থা গুরুতর হলেও দুজনকেই জীবিত বের করে আনা সম্ভব হয়েছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর আবারও আশার খবর এসেছে। ত্রিশূলী এলাকার আরেক জলবিদ্যুৎ সুড়ঙ্গ থেকে একজন চীনা নাগরিককে দশ দিন পর জীবিত উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। একই দিনে ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে থাকা একজন নেপালি নারীও জীবিত উদ্ধার হয়েছেন।
নেপালের এই বিপর্যয়কে জলবায়ু পরিবর্তনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। তবে সতর্কতা হলো, এই নির্দিষ্ট বিপর্যয়ের প্রতিটি কারণকে সরাসরি ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ বলে চিহ্নিত করাও বৈজ্ঞানিকভাবে দায়িত্বশীল নয়। তাৎক্ষণিকভাবে যে ঘটনাটি বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, সেটি হলো হিমবাহ/বরফ-শিলা ধস এবং তার ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা।
কিন্তু বৃহত্তর বাস্তবতা হলো, উষ্ণায়ন হিমালয়ের হিমবাহ ও উচ্চ পার্বত্য পরিবেশকে দ্রুত পরিবর্তন করছে। ফলে হিমবাহ, বরফ ও পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই বাস্তবতায় হিমালয় অঞ্চলে উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হলে জলবায়ু ঝুঁকি ও ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি
একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।
বাংলাদেশের জন্যও এর শিক্ষা আছে। হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর নিম্ন অববাহিকায় বসবাসকারী একটি দেশ হিসেবে আমরা পাহাড়ি অঞ্চলের পরিবর্তনের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নই। নদী ব্যবস্থাপনা, আগাম সতর্কতা, সীমান্তপারের তথ্য বিনিময় এবং আঞ্চলিক দুর্যোগ প্রস্তুতি তাই আমাদের জাতীয় নিরাপত্তারও অংশ।
প্রকৃতির দুর্যোগের পাশাপাশি নেপালকে মোকাবিলা করতে হয়েছে আরেক ধরনের বিপদ। তা হচ্ছে, দুর্যোগের মাঝেও এআইয়ের বিভীষিকা ও ডিজিটাল বিভ্রান্তি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেপালের বন্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের নামে পুরোনো, অন্য দেশের এবং এআই-সৃষ্ট ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্যাক্ট-চেকাররা এমন ভিডিও শনাক্ত করেছেন যেগুলো বাস্তব নেপাল বন্যার দৃশ্য নয়, বরং এআই দিয়ে তৈরি। এমনকি ‘আগে ও পরে’ নেপালের কোনো শহরের ছবি হিসেবেও কিছু কৃত্রিম ছবি ছড়ানো হয়েছে।
একটি ভিডিওকে বিশ্লেষণ করে ফ্যাক্ট-চেকাররা ৯৯ শতাংশের বেশি সম্ভাবনায় এআই-সৃষ্ট বলে শনাক্ত করেছেন। অর্থাৎ প্রযুক্তি যেখানে সত্যকে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে, সেখানেই একই প্রযুক্তি মিথ্যাকেও ভয়াবহ গতিতে ছড়িয়ে দিতে পারছে।
আরও উদ্বেগজনক হলো, নিখোঁজ মানুষের ছবি নিয়েও কৃত্রিম ছবি ছড়ানো হয়েছে। সিঙ্গাপুরের নিখোঁজ নাগরিকদের নিয়ে এআই-সৃষ্ট ছবি ছড়ানোর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মকে ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।
এটি শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়। এটি এই সময়ের মানবিক নিষ্ঠুরতা। একজন মা যখন সামাজিক মাধ্যমে তার নিখোঁজ সন্তানের মতো দেখতে কোনো ছবি দেখে আশায় বুক বাঁধেন, পরে যদি জানতে পারেন ছবিটি কৃত্রিম—তাহলে সেই মানসিক আঘাতের মূল্য কে দেবে?
দুর্যোগের সময় তথ্যও ত্রাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ। কোন রাস্তা চালু, কোথায় উদ্ধারদল গেছে, কে উদ্ধার হয়েছে, কে নিখোঁজ, এসব তথ্য ভুল হলে উদ্ধার অভিযানও ভুল পথে যেতে পারে। সুতরাং দুর্যোগকালীন তথ্য যাচাইয়ের জন্য সরকার, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এবং ফ্যাক্ট-চেকিং সংগঠনগুলোর সমন্বিত ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি।
নেপালের সামনে এখন শুধু উদ্ধার অভিযান নয়; আরও দীর্ঘ পুনর্গঠনের পথ। প্রথম দায়িত্ব: যতক্ষণ সম্ভাবনা আছে, ততক্ষণ নিখোঁজদের খুঁজে যাওয়া। বিশেষ করে জলবিদ্যুৎ সুড়ঙ্গে আটকে থাকা কর্মীদের উদ্ধারে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ সহযোগিতা অব্যাহত রাখা জরুরি।
দ্বিতীয় দায়িত্ব: মৃতদের মর্যাদাপূর্ণ শনাক্তকরণ ও পরিবারের কাছে হস্তান্তর। নিখোঁজ ব্যক্তিদের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় ডেটাবেস তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে ছবি, পরিচয়, শেষ অবস্থান, উদ্ধারসংক্রান্ত তথ্য এবং প্রয়োজন হলে ডিএনএ তথ্য সমন্বিত থাকবে।
তৃতীয় দায়িত্ব:পুনর্গঠনকে আগের জায়গায় ফিরে যাওয়ার সরল প্রকল্প না বানানো। যে জায়গায় বসতি বারবার আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস বা হিমবাহধসের ঝুঁকিতে, সেখানে শুধু একই ধরনের ঘর আবার নির্মাণ করলেই হবে না। ঝুঁকি মানচিত্র, ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং নিরাপদ অবকাঠামোকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রস্থলে আনতে হবে।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি সবচেয়ে ভয়াবহ সম্ভাব্য দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে। সুড়ঙ্গের বিকল্প প্রবেশপথ, জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা, কর্মীদের অবস্থান শনাক্ত করার প্রযুক্তি এবং দ্রুত উদ্ধার পরিকল্পনা
বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
নেপালের এই কষ্ট, এই কান্না আমাদেরকেও সতর্ক করুক। নেপাল আজ শোকাহত। কিন্তু শোকের মধ্যেও মানুষ লড়ছে। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন, সুড়ঙ্গে প্রবেশ করছেন, কাদা ও পানির সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। পরিবারগুলো অপেক্ষা করছে। আর কোথাও যদি জীবনের সামান্যতম চিহ্ন পাওয়া যায়, পুরো দেশ যেন আবার আশাবাদী হয়ে উঠছে।
হিমালয়কে জয় করার ভাষা বদলাতে হবে। নদীকে নিয়ন্ত্রণ করার অহংকারের বদলে নদীর আচরণ বুঝতে হবে। পাহাড়ে উন্নয়ন করতে হবে, কিন্তু পাহাড়ের ভূপ্রকৃতিকে অস্বীকার করে নয়। জলবিদ্যুৎ করতে হবে, কিন্তু শ্রমিকের নিরাপত্তাকে খরচের খাতায় রেখে নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু সত্য-মিথ্যার পার্থক্য না করে নয়।
সবচেয়ে বড় কথা, দুর্যোগকে কেবল দুর্যোগ ঘটার পর মোকাবিলা করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ঝুঁকি শনাক্ত করা, আগাম সতর্ক করা, নিরাপদ অবকাঠামো তৈরি করা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো, এগুলোই হতে হবে ভবিষ্যৎ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মূলনীতি।
স্নিগ্ধ শান্ত নেপাল আজ গভীর শোকে স্তব্ধ। তার পাহাড়ে এখনো ধ্বংসস্তূপ, নদীতে এখনো কাদার স্রোত, সুড়ঙ্গে এখনো অন্ধকার। কিন্তু সেই অন্ধকারের মধ্যেই যখন কোনো শ্রমিকের নিঃশ্বাস ফিরে আসে, তখন মানবতার কাছে একটি বার্তা পৌঁছে যায়, আশা শেষ হয়ে যায়নি।
নেপালের এই কান্না তাই শুধু নেপালের হিমালয়ের কান্না মনে করে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এই কান্না দক্ষিণ এশিয়ার সতর্কবার্তা এবং সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি নির্মম শিক্ষা। তাই প্রকৃতির সংকেত বুঝে, বিজ্ঞানকে সঙ্গে নিয়ে, মানুষের জীবনকে উন্নয়নের কেন্দ্রে রেখে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করাই হতে পারে এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় উত্তর।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]