| |

আমরা এআই-কে কীসব ইনপুট দিচ্ছি?

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
আজকাল সবাই অনুভব করছেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের তৈরি এক বিস্ময়কর প্রযুক্তি। আমরা এআই-কে ভাষা শেখাচ্ছি, ছবি চিনতে শেখাচ্ছি, মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতে শেখাচ্ছি, রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করতে শেখাচ্ছি, গবেষণা ও শিক্ষায় ব্যবহার করছি, এমনকি মানুষের সৃজনশীলতার বিকল্প হিসেবেও দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি। সে মানুষের দেয়া শেখানো জমা করা জ্ঞান ও বুলি ঝটপট খুঁজে নিয়ে সেটা ব্যবহার করে মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেয়। কিন্তু দিন দিন একটি অস্বস্তিকর প্রেক্ষিত ক্রমেই সামনে আসছে। তা হলো, আমরা এআইকে আসলে কী ইনপুট দিচ্ছি বা শেখাচ্ছি?
আমরা যদি এআইকে জ্ঞান, যুক্তি, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও মানবিকতার পাশাপাশি নকল ছবি, গুজব, গীবত, টিজিং, অপমান, বিদ্বেষ, ঈর্ষা, প্রতারণা, বিকৃত চিন্তা এবং পারস্পরিক হিংসার বিপুল উপাদান সরবরাহ করি, তাহলে সেই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ চরিত্র কেমন হবে? আজকাল এ ভাবনাটি শুধু প্রযুক্তিগত নেতিবাচক ইস্যু না হয়ে মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তোলা শুরু করেছে।
এআই মানুষের কাছ থেকে শেখে। সরাসরি হোক বা পরোক্ষভাবে, প্রশিক্ষণ-ডেটা, মানুষের তৈরি কনটেন্ট, ব্যবহারকারীর প্রতিক্রিয়া, মূল্যায়ন কিংবা অন্যান্য তথ্যপ্রবাহের মাধ্যমে। অবশ্যই প্রতিটি এআই সিস্টেমের ক্ষেত্রে ‘ব্যবহারকারীর প্রতিটি কথাই স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে এবং পরবর্তী মডেলকে শেখানো হচ্ছে’, এমন সরলীকরণ ঠিক নয়। কোন সেবা কী তথ্য রাখবে, কতদিন রাখবে এবং তা মডেল উন্নয়নে ব্যবহার করবে কি না, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি, সেটিংস ও নীতিমালার ওপর। কিন্তু বৃহত্তর সমস্যাটি অন্য জায়গায়। মানুষ প্রতিদিন যে বিপুল ডিজিটাল আবর্জনা তৈরি করছে, সেটিই ভবিষ্যৎ এআই-ভিত্তিক তথ্যপরিবেশের কাঁচামাল হয়ে উঠতে পারে।
আর সেই কাঁচামালের বড় অংশ যদি বিষাক্ত হয়, তাহলে যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা যত বাড়বে, বিপদও তত সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী হতে পারে।
একসময় ছবি ছিল কোনো ঘটনার দৃশ্যমান প্রমাণ। কিন্তু আকাল একজন মানুষের মুখ অন্যের শরীরে বসিয়ে দেওয়া, কোনো ব্যক্তিকে এমন স্থানে দেখানো যেখানে তিনি কখনো যাননি, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নারী, শিশু কিংবা সাধারণ নাগরিককে নিয়ে আপত্তিকর ছবি বানানো সবই এখন তুলনামূলক সহজ।
কেউ আজ একজনের নকল ছবি বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কাল সেই নকল ছবির ওপর ভিত্তি করে এআই আরও কনটেন্ট তৈরি করে ফেলছে। পরশু সেই কনটেন্ট অন্য কেউ সত্য ধরে নিয়ে আবার ছড়িয়ে দিচ্ছে। যেখানে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
গুজব মানবসমাজে নতুন নয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এআই গুজবকে দিয়েছে অভূতপূর্ব গতি এবং ব্যাপ্তি। কিন্তু গুজবের ডেটা, গুজবের অ্যালগরিদম এখন মানুষের জন্য বড় সমস্যা।
একটি মিথ্যা তথ্য কয়েক মিনিটে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। এআই সেটিকে আরও আকর্ষণীয় ভাষায় লিখতে পারে, বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করতে পারে, ছবির সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, ভিডিওর স্ক্রিপ্ট বানাতে পারে এবং একই মিথ্যা বার্তাকে অসংখ্য ভিন্ন রূপে ছড়িয়ে দিতে পারে।
অর্থাৎ আগে গুজব ছড়াতে যতটা মানবশ্রম প্রয়োজন হতো, এখন প্রযুক্তি সেই কাজের বড় অংশকে স্বয়ংক্রিয় করে দিতে পারে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, একটি মিথ্যা বার্তা যত বেশি পুনরাবৃত্ত হচ্ছে, ডিজিটাল পরিবেশে তার উপস্থিতিও তত বাড়ছে। এভাবে মানুষের তৈরি মিথ্যা যদি এআই-নির্ভর সিস্টেমের তথ্যপরিবেশে ক্রমাগত ঢুকতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থাকে সত্য-মিথ্যা আলাদা করতে আরও কঠিনতর হবে।
গীবতও যখন ডেটা, তখন আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী লিখছি, কে কী করল, কার ব্যক্তিগত সম্পর্ক কেমন, কোন শিক্ষক কেমন, কোন সহকর্মী কতটা খারাপ, কোন প্রতিবেশীর ব্যক্তিগত জীবন কেমন, এসব নিয়ে অসংখ্য মন্তব্য, পোস্ট ও আলোচনা করছি।
অনেক ক্ষেত্রেই তথ্যের নামে এসব গীবত অনুমান, অপবাদ কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ করে ফেলছে।
কারও সম্মতি ছাড়া তার ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, সম্পর্ক, দুর্বলতা বা অপমানজনক ঘটনা অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া কেবল সামাজিক অনৈতিকতা এবং অনেক ক্ষেত্রে তা আইনগত সমস্যাও তৈরি করে চলেছে। এআই যুগে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার দায়িত্ব তাই আগের চেয়ে অনেক বেশি।
এছাড়া ঈর্ষা ও হিংসার অ্যালগরিদমিক বিস্তার ভয়ংকর রকমের থাবা বিস্তার করছে। মানুষের ঈর্ষা পুরোনো। কিন্তু ডিজিটাল যুগে তার প্রকাশের ধরন বদলেছে। কারও সাফল্য দেখলে অভিনন্দন জানানোর বদলে তাকে ছোট করার চেষ্টা, কারও ভালো ছবি দেখে কুৎসা রটানো, কারও চাকরি বা পদোন্নতি নিয়ে সন্দেহ তৈরি করা, কারও গবেষণা বা পুরস্কারকে অবজ্ঞা করা, এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে।
এআই যখন এই বিপুল মানব-উৎপাদিত কনটেন্টের সঙ্গে কাজ করছে, তখন মনে হচ্ছে আমরা কি প্রযুক্তিকে মানবিক উৎকর্ষের প্রতিফলন দেখাচ্ছি, নাকি মানুষের হীনম্মন্যতা ও প্রতিহিংসারও আয়না বানাচ্ছি? আমরা এআই-কে এসব কী শেখাচ্ছি?
প্রযুক্তি নিজে ঈর্ষান্বিত নয়, বিদ্বেষী নয়, গীবতকারীও নয়। কিন্তু মানুষ যদি সেই প্রযুক্তিকে এসব আচরণের উপাদানে পরিপূর্ণ করে, তাহলে প্রযুক্তি সেই আচরণকে বৃহত্তর পরিসরে পুনরুৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
আজকাল নেতিবাচক মেশিন লার্নিং এক নতুন বিপদের নাম। মেশিন লার্নিং মূলত তথ্য থেকে প্যাটার্ন শেখার প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া। কিন্তু এখানে একটি সামাজিক শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—ডেটার মান যত খারাপ, ফলাফলের ঝুঁকিও তত বেশি।
যদি কোনো সিস্টেমের তথ্যপরিবেশে পক্ষপাত, ভুল তথ্য, বিদ্বেষ, কুসংস্কার, বৈষম্যমূলক ভাষা কিংবা প্রতারণামূলক কনটেন্ট অতিরিক্ত পরিমাণে থাকে, তাহলে সেগুলো শনাক্ত, ছাঁটাই ও ভারসাম্যপূর্ণ করার ব্যবস্থা না থাকলে এআই ব্যবস্থার ফলাফলেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। একে রূপক অর্থে আমরা বলতে পারি, নেতিবাচক মেশিন লার্নিং।
মানুষ যদি ক্রমাগত নেতিবাচক আচরণকে ডিজিটাল ডেটায় রূপান্তর করে, তাহলে আমরা এমন একটি তথ্যপরিবেশ তৈরি করছি, যেখানে মেশিনকে সত্য, নৈতিকতা ও মানবিকতার পাশাপাশি মিথ্যা, ঘৃণা ও প্রতারণার মধ্যেও কাজ করতে হবে। সবচেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে, মিথ্যা যখন দেখতে সত্যের মতো লাগে। তাই এআইয়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক বিপদ সম্ভবত শুধু ভুল তথ্য না থেকে একটি বিশ্বাসযোগ্য ভুল তথ্য জানান দিচ্ছে।
আগে মিথ্যা ধরতে অনেক সময় ভাষা, বানান, ছবির অসংগতি বা ভিডিওর দুর্বলতা চোখে পড়ত। উন্নত এআই এসব দুর্বলতা দ্রুত কমিয়ে দিতে পারছে। ফলে ভবিষ্যতে একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে কোনো ছবি, ভিডিও, অডিও বা লিখিত বক্তব্য আসল কি না বোঝা কঠিন হয়ে গেছে। তাই এখন শুধু ব্যক্তির ক্ষতি হচ্ছে না, নির্বাচন, বিচারব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যম, শিক্ষা, প্রশাসন, ব্যবসা, সব ক্ষেত্রেই আস্থার সংকট তৈরি হয়ে যাচ্ছে।
তাহলে আমাদের করণীয় কী? আমাদের প্রযুক্তি নির্মাতাদের প্রথম দায়িত্ব হলো, এআই প্রশিক্ষণে উচ্চমানের, যাচাইকৃত ও বৈচিত্র্যময় ডেটা ব্যবহার করতে হবে। ক্ষতিকর, প্রতারণামূলক ও গোপনীয় তথ্য শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের শক্তিশালী ব্যবস্থা থাকতে হবে। ব্যবহারকারীর তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তা সহজ ভাষায় জানাতে হবে। ডেটা সংরক্ষণ ও মডেল প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয় দায়িত্ব রাষ্ট্রের। বাংলাদেশেও এআই-সংক্রান্ত নীতিমালা, ডেটা সুরক্ষা, সাইবার অপরাধ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও ডিজিটাল নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। আইন যেন শুধু অপরাধের পর শাস্তি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; প্রতিরোধ, সচেতনতা, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।
তৃতীয় দায়িত্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। শিক্ষার্থীদের শুধু এআই দিয়ে কীভাবে উত্তর লিখতে হয় তা শেখালে হবে না; এআই-যুগের নৈতিকতা শেখাতে হবে। কোন তথ্য দেওয়া উচিত, কোন তথ্য দেওয়া উচিত নয়, কার ছবি ব্যবহারের আগে অনুমতি প্রয়োজন, কীভাবে গুজব যাচাই করতে হয়, কীভাবে ডিপফেক শনাক্ত করতে হয়, এসব শিক্ষা পাঠ্যক্রমের অংশ হওয়া প্রয়োজন।
চতুর্থ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আমাদের নিজেদের। এআইকে প্রশ্ন করার আগে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে, আমি তাকে কী দিচ্ছি? আমি কি কারও ব্যক্তিগত ছবি অনুমতি ছাড়া আপলোড করছি? আমি কি কারও বিরুদ্ধে অপমানজনক তথ্য তৈরি করছি? এই প্রশ্নগুলো এখন ডিজিটাল সভ্যতার নিকট ভবিষ্যতের জরুরী চিন্তা হওয়া উচিত।
সুতরাং আজ আমরা যে প্রতিটি ছবি বানাচ্ছি, প্রতিটি পোস্ট লিখছি, প্রতিটি গুজব ছড়াচ্ছি, প্রতিটি মানুষকে অপমান করছি, প্রতিটি বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যকে ডিজিটাল করে তুলছি, সেগুলো শুধু আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। এগুলো বৃহত্তর ডিজিটাল পরিবেশের অংশ হয়ে উঠছে।
এ কারণেই অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা এআই-কে কীসব ইনপুট দিচ্ছি তার নৈতিকতার সীমারেখা সম্পর্কিত নীতিমালা ঠিক করে নেয়া। কারণ এআইয়ের ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তিবিদেরা লিখছেন না, আমরাও লিখছি, আমাদের প্রতিটি ক্লিক, প্রতিটি ছবি, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি সত্য এবং প্রতিটি মিথ্যার মাধ্যমে।
মানবজাতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়তো এআইকে নীতিহীনভাবে বুদ্ধিমান না করে ইতিবাচক বুলি শিখিয়েেআমাদের নিজেদের ভবিষ্যত তথ্যজগতকে মানবিক, সত্যনিষ্ঠ ও নৈতিক করার জরুরী প্রকল্প হাতে নেয়া। অন্যথায় আমরা মানুষেরাই শুধু উপলব্ধি করতে পারব যে, সেটা ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির কোন ব্যর্থতা হবে না, সেটা হবে আমাদের নিজেদের নৈতিক ব্যর্থতার ভয়ংকর প্রতিফলন।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.