| |

অলিগার্করা আমাদের অর্থনীতিতে বিষবৃক্ষের নতুন চারা

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।

যখন অর্থনৈতিক ক্ষমতা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে একজন ব্যক্তি বা একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বাজারের নিয়ম, রাষ্ট্রের নীতি এবং প্রতিযোগিতার পরিবেশকে নিজেদের স্বার্থে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়। তখন উদ্যোক্তা আর শুধু উদ্যোক্তা থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন অলিগার্ক। অলিগার্কি অর্থনীতির সবচেয়ে ভয়ংকর বৈশিষ্ট্য হলো, এরা বাজারে শুধু প্রতিযোগিতা করে না, অনেক সময় বাজারের নিয়মটাই নিজেদের অনুকূলে বাঁকিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে।

সেই কারণেই অলিগার্করা একটি দেশের অর্থনীতিতে বিষবৃক্ষের নতুন চারার মতো। চারা অবস্থায় তাকে ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু শিকড় যদি রাষ্ট্র, ব্যাংক, প্রশাসন, রাজনীতি ও বাজারের গভীরে ছড়িয়ে পড়ে, একসময় তার ছায়ায় প্রকৃত উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকের জন্য জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়।

একজন ধনী মানুষের সম্পদ থাকা এবং একজন অলিগার্কের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। ধনী উদ্যোক্তা বাজারের নিয়ম মেনে ব্যবসা করে সফল হতে পারেন। কিন্তু অলিগার্কের ক্ষমতা শুধু অর্থে সীমাবদ্ধ থাকে না। অর্থনৈতিক শক্তি যখন রাজনৈতিক প্রভাব, নীতিনির্ধারণে প্রবেশাধিকার, প্রশাসনিক সুবিধা এবং বিশেষ সুযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন একটি ভয়ংকর ক্ষমতার চক্র তৈরি হয়। এই চক্র সাধারণত: অর্থ থেকে রাজনৈতিক প্রভাব, রাজনৈতিক প্রভাব থেকে নীতিগত সুবিধা, নীতিগত সুবিধাথেকে আরও অর্থ, আর সেই অর্থথেকে আরও প্রভাব বলয় তৈরী করে।

এই চক্র যত শক্তিশালী হয়, সাধারণ উদ্যোক্তার জন্য প্রতিযোগিতা তত কঠিন হয়। এটি মুক্তবাজার অর্থনীতি নয়। এটি এমন একটি বাজারব্যবস্থা, যেখানে যোগ্যতার চেয়ে সংযোগের মূল্য বেশি হয়ে ওঠে।

আর এভাবে একময় প্রতিযোগিতার কবর খোঁড়ে অলিগার্কি। সুস্থ অর্থনীতির প্রাণ হলো প্রতিযোগিতা। একটি প্রতিষ্ঠান ভালো পণ্য উৎপাদন করবে, অন্যটি আরও ভালো পণ্য তৈরি করবে, কেউ কম দামে সেবা দেবে, কেউ উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। এর ফলে ভোক্তা লাভবান হয়, উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং অর্থনীতি এগোয়। অলিগার্কিক অর্থনীতিতে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।

অলিগার্কিক অর্থনীতির আরেকটি বড় ঝুঁকি ব্যাংকিং খাত। ব্যাংক যখন ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত এটিএম তখন এটা মারাত্মক ঝুঁকি মনে হয়। ব্যাংক জনগণের আমানতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সাধারণ মানুষ তার সঞ্চয় ব্যাংকে রাখে। সেই অর্থ ঋণ হিসেবে উদ্যোক্তা, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে যাওয়ার কথা। কিন্তু যদি ক্ষমতাবান ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অতিরিক্ত প্রভাব অর্জন করে, তাহলে ঋণের প্রবাহে বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে।

তখন প্রকৃত উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় অর্থ পান না, অথচ ক্ষমতাবান গোষ্ঠী বিপুল ঋণ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। ঋণ ফেরত না দিলে সমস্যা শুধু ব্যাংকের নয়; শেষ পর্যন্ত তার বোঝা বহন করতে হয় আমানতকারী, সরকার এবং বৃহত্তর অর্থনীতিকে। আর এখানেই অলিগার্কির ভয়াবহতা। একজনের অর্থনৈতিক ঝুঁকি তখন সমাজের সম্মিলিত ঝুঁকিতে পরিণত হয়।

ঋণ নিয়ে ব্যবসা করা স্বাভাবিক। ব্যবসায় ঝুঁকি থাকে, ক্ষতিও হতে পারে। কিন্তু ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি সংস্কৃতি অর্থনীতির জন্য বিষের মতো। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে তার জামানত, ব্যবসা কিংবা সামাজিক মর্যাদা ঝুঁকিতে পড়ে। অথচ বড় ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রে যদি বারবার পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন বা বিশেষ সুবিধার সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে অর্থনীতিতে একটি ভয়ংকর বার্তা যায়। তা হলো, আইন সবার জন্য সমান নয়। এই ধারণা অর্থনৈতিক অপরাধের চেয়েও ভয়ংকর। কারণ এটি মানুষের প্রতিষ্ঠানগত আস্থা নষ্ট করে।

অলিগার্কির সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি হলো রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও ব্যক্তিগত স্বার্থের সীমারেখা দুর্বল হয়ে যাওয়া। সরকারি জমি, অবকাঠামো, প্রাকৃতিক সম্পদ, সরকারি ক্রয়, বড় প্রকল্প, আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থা, এসব ক্ষেত্রে যদি প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার পরিবর্তে বিশেষ গোষ্ঠীর প্রভাব কাজ করে, তাহলে রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের কল্যাণের বদলে সীমিত গোষ্ঠীর সম্পদ বৃদ্ধির উপায় হয়ে উঠতে পারে।

অবশ্য কোনো পণ্যের দাম বাড়লেই অলিগার্কদের দায়ী করা যাবে না। আন্তর্জাতিক বাজার, উৎপাদন খরচ, বিনিময় হার, পরিবহন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আমদানি পরিস্থিতি, অনেক কারণই মূল্যকে প্রভাবিত করে। কিন্তু বাজারে প্রতিযোগিতা কমে গেলে এসব চাপ ভোক্তার ওপর আরও তীব্রভাবে পড়তে পারে। ফলে অলিগার্কির শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকেন সাধারণ ভোক্তা।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় শত্রু এরা। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি অর্থনীতিতে যদি বড় গোষ্ঠী অতিরিক্ত সুবিধা পায়, তাহলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা একাধিক অসুবিধায় পড়েন।

তাদের পুঁজি সীমিত, বাজারে প্রবেশের ক্ষমতা কম, প্রযুক্তি সীমিত এবং ব্যাংকঋণ পাওয়ার সক্ষমতাও তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে বড় গোষ্ঠী যদি সহজে পুঁজি, বাজার, নেটওয়ার্ক ও নীতিগত সুবিধা পায়, তাহলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সঙ্গে তার প্রতিযোগিতা সমান থাকে না। এতে অর্থনীতি বড় হতে পারে, কিন্তু অর্থনৈতিক সুযোগ সবার জন্য বড় হয় না। এটাই বৈষম্যের গভীরতম রূপ।

এভাবে সম্পদের বৈষম্য থেকে সামাজিক বৈষম্য তৈরী হয়ে যায়। অলিগার্কি অর্থনৈতিক বৈষম্যকে শুধু বাড়ায় না; অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্যকেও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে। একদিকে সীমিতসংখ্যক গোষ্ঠীর সম্পদ দ্রুত বাড়ে। অন্যদিকে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খায়।

যখন মানুষ দেখতে পায়, এক শ্রেণির জন্য সুযোগের দরজা সবসময় খোলা, আর অন্য শ্রেণির জন্য নিয়ম ও বাধার পাহাড়, তখন সমাজে হতাশা জন্ম নেয়। এর ফল হতে পারে সামাজিক ক্ষোভ, প্রাতিষ্ঠানিক অবিশ্বাস, মেধাপাচার এবং তরুণদের মধ্যে ‘যোগ্যতা দিয়ে কিছু হবে না’ ধরনের বিপজ্জনক মানসিকতা।

একটি রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর কী হতে পারে? মেধার বদলে যোগাযোগের অর্থনীতি তৈরী হয়। অলিগার্কিক সংস্কৃতির সবচেয়ে নীরব ক্ষতি ঘটে মানুষের মানসিকতায়।

যখন তরুণরা দেখে যে সৎ প্রতিযোগিতার চেয়ে রাজনৈতিক যোগাযোগ, প্রভাবশালী পরিচয় কিংবা ক্ষমতার নৈকট্য বেশি কার্যকর, তখন তারা নিজের দক্ষতায় বিনিয়োগ করার আগ্রহ হারাতে পারে। তখন সমাজে মেধার পরিবর্তে ‘কাকে চেনেন?’ প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নকে দুর্বল করে। কারণ একটি আধুনিক অর্থনীতি দাঁড়ায় দক্ষতা, উদ্ভাবন, গবেষণা, উদ্যোক্তা ও প্রতিযোগিতার ওপর, ব্যক্তিগত প্রভাবের ওপর নয়। গণতন্ত্রও তখন অর্থের কাছে দুর্বল হয়

অলিগার্কির প্রভাব অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। বিপুল অর্থ যখন রাজনৈতিক প্রভাব অর্জনের হাতিয়ার হয়, তখন গণতন্ত্রের সমতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী গোষ্ঠী যদি নীতিনির্ধারণে সাধারণ নাগরিকের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাহলে রাষ্ট্রের নীতি ধীরে ধীরে জনস্বার্থের বদলে বিশেষ স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

তখন চারদিক সরব ওঠে, রাষ্ট্র কার জন্য? নিত্যপণ্যের বাজার কার জন্য? ক্ষুধা কার জন্য, বিলাসী নীতি কার জন্য? ইত্যাদি। গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের স্বার্থই রাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হওয়া উচিত। কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীভবন সেই নীতিকে দুর্বল করতে পারে।

অলিগার্কি একদিনে তৈরি হয় না। এটি ধীরে ধীরে জন্ম নেয়। এরা প্রথমে একজন সফল ব্যবসায়ী। তারপর হয় ওঠে বড় সম্পদ। তারপর, রাজনৈতিক যোগাযোগ করে ও নীতিনির্ধারণে প্রবেশ করে ও বাজারে বিশেষ সুবিধা নেয় এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রভাব খাটায়।

শেষে এরা মিডিয়া বা জনমত প্রভাবিত করার ক্ষমতা দেখায়। এভাবে একসময় দেখা যায়, ব্যবসা, রাজনীতি, প্রশাসন ও অর্থের মধ্যে সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে। এই পর্যায়েই রাষ্ট্রকে সতর্ক হতে হয়। চারা যখন ছোট, তখন ছাঁটাই করা সহজ। শিকড় যখন গভীরে যায়, তখন উপড়ে ফেলা কঠিন।

অলিগার্কি মোকাবিলার অর্থ বড় ব্যবসায়ীকে শত্রু বানানো নয়। বরং বড় ব্যবসাকেও আইনের সমান কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। প্রথমত: প্রতিযোগিতা আইন কার্যকর করতে হবে। কোনো গোষ্ঠী যেন বাজারে একচেটিয়া বা অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। দ্বিতীয়ত: ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে প্রকৃত ঝুঁকি মূল্যায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বড় ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হতে হবে। তৃতীয়ত: সরকারি ক্রয় ও বড় প্রকল্পে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং স্বার্থের সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চতুর্থত: রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাত সম্পর্কে শক্তিশালী নৈতিক ও আইনি কাঠামো প্রয়োজন। পঞ্চমত: নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক চাপ থেকে যথাসম্ভব স্বাধীন করতে হবে। ষষ্ঠত: গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন নিয়ে স্বাধীনভাবে গবেষণা ও প্রতিবেদন করার সুযোগ দিতে হবে। সপ্তমত: প্রকৃত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার জন্য অর্থায়ন, প্রযুক্তি, বাজার ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। সবশেষে দরকার আইনের শাসন। কারণ অলিগার্কি যত বড়ই হোক, তার চেয়েও বড় হতে হবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।

তাই আজ প্রয়োজন কাউকে ব্যক্তিগতভাবে শত্রু ঘোষণা করা নয়; প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, যেখানে কেউ এত বড় হতে পারবেন না যে তার স্বার্থের কাছে রাষ্ট্র ছোট হয়ে যায়। অর্থনীতিতে বড় গাছের প্রয়োজন আছে। কিন্তু সেই গাছ যেন এদের মতো অন্য সব গাছের আলো কেড়ে না নেয়।

কারণ একটি অর্থনীতিতে কয়েকটি বিশাল বৃক্ষ থাকলেই বন তৈরি হয় না। বন তৈরি হয় তখনই, যখন ছোট-বড় সব গাছই আলো, পানি, মাটি ও বাতাসের ন্যায্য সুযোগ পায়। অলিগার্কি সেই ন্যায্যতার শত্রু যেটা আমাদের দেশেও ব্যাপক সামজিক বৈষম্য ও সামজিক বিশৃংখলা ও অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য চোখে পড়ার মতো কাজ করে চলেছে।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.