শুক্রবার | ৩ এপ্রিল, ২০২৬ | ২০ চৈত্র, ১৪৩২

ওরা পবিত্র রমজানেও নিজেদের প্রতিপক্ষ ছিল কেন?

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ, হামলা বা সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে সংঘাত ও সামরিক উত্তেজনা বেড়েছে। এমনকি রমজানের মতো পবিত্র সময়ে মুসলিম বিশ্বকে কেন বারবার যুদ্ধের টার্গেট করা হয়েছিল। ইরান-মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনা ও সামরিক হামলার ঘটনাও সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। চিন্তার বিষয় হচ্ছে, রমজানের মতো পবিত্র সময়েও পাকিস্তান কেন আফগানিস্তানকে টার্গেট করেছিল? রমজানের সময় এই ধরনের হামলা বা উত্তেজনা বিশেষভাবে দৃষ্টিকটু হয়ে ওঠেছে। কারণ এটি মুসলিম বিশ্বের মানুষের কাছে একটি মানবিক ও ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়। এই মাসে যখন মুসলমানরা শান্তি ও সংযমের শিক্ষা গ্রহণ করে, তখন যুদ্ধের খবর স্বাভাবিকভাবেই মানুষকে হতাশ করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতি অনেক সময় ধর্মীয় আবেগের চেয়ে নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। প্রথমত, যুদ্ধ ও ভূরাজনীতির বাস্তবতা ধর্মীয় অনুভূতির ঊর্ধ্বে চলে যায়। আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত সাধারণত ধর্মীয় সময়সূচি দেখে নেওয়া হয় না; বরং কৌশলগত স্বার্থ, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সামরিক সুবিধাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্র। তেলসম্পদ, কৌশলগত অবস্থান এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কারণে এই অঞ্চল বহুবার সংঘাতের মুখে পড়েছে। ফলে যখনই কোনো উত্তেজনা তীব্র হয়, তখন তা রমজান মাসে পড়লেও সামরিক কর্মকাণ্ড থেমে থাকে না।
দ্বিতীয়ত, রমজানকে কখনো কখনো প্রতীকী সময় হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। অনেক রাজনৈতিক বা সামরিক শক্তি জানে যে রমজান মুসলিম বিশ্বের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। এই সময়ে কোনো সংঘাত বা হামলা হলে তা বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের আবেগকে নাড়া দেয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া দ্রুত তৈরি হয়। কিছু ক্ষেত্রে তাই রমজানের সময় সংঘাতকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক কৌশলও হতে পারে, যেখানে প্রতিপক্ষের মনোবল দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়।
তৃতীয়ত, মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ বিভাজনও একটি বড় কারণ। মুসলিম বিশ্ব কোনো একক রাজনৈতিক সত্তা নয়; বরং এটি বহু রাষ্ট্র, মতাদর্শ ও জোটে বিভক্ত। মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে, কেউ কেউ আবার বৈশ্বিক শক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। এই বিভক্তি অনেক সময় সংঘাতকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে মুসলিম বিশ্বের ভেতরের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বও রমজানের সময় যুদ্ধ বা উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
চতুর্থত, গণমাধ্যম ও তথ্যযুদ্ধের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক যুগে যুদ্ধ শুধু ময়দানে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি তথ্য ও প্রচারণার ক্ষেত্রেও বিস্তৃত। রমজান মাসে সংঘাতের ঘটনা ঘটলে তা বিশ্বমাধ্যমে দ্রুত আলোচিত হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ফলে কিছু পক্ষ এই সময়টিকে তথ্যযুদ্ধের জন্যও ব্যবহার করতে পারে, যাতে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করা যায় বা প্রতিপক্ষকে
আন্তর্জাতিকভাবে চাপে ফেলা যায়।
পঞ্চমত, ইতিহাসের দিকেও নজর দেওয়া দরকার। মুসলিম ইতিহাসে রমজান মাসে সংঘটিত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের নজির রয়েছে। ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে সংঘটিত বদর যুদ্ধ রমজান মাসেই হয়েছিল, যা মুসলমানদের জন্য একটি ঐতিহাসিক ও প্রতীকী ঘটনা। আবার ১৯৭৩ সালের আরব–ইসরায়েল সংঘাত, যা ইয়ুম কিপ্পুর যুদ্ধ নামে পরিচিত, সেটিও রমজান মাসের সময় শুরু হয়েছিল। যদিও এসব যুদ্ধের পেছনে মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশল, তবু ধর্মীয় সময়ের সাথে ঘটনাগুলোর মিল মানুষকে বিশেষভাবে নাড়া দেয়।
ষষ্ঠত, মানবিক সংকটের দিকটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ যখনই ঘটে, তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় সাধারণ মানুষ। রমজান মাসে যুদ্ধ বা অবরোধের কারণে খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
অনেক পরিবার ইফতার বা সেহরির মৌলিক খাবারও জোগাড় করতে পারে না। শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের জন্য পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আরও কঠিন। ফলে রমজানে যুদ্ধ একটি গভীর মানবিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হচ্ছে।
সপ্তমত, আন্তর্জাতিক রাজনীতির দ্বৈত মানদণ্ডের প্রশ্নও এখানে উঠে আসে। অনেক সময় দেখা যায়, বিশ্বশক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী বিভিন্ন সংঘাতের প্রতি ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখায়। কোনো ক্ষেত্রে দ্রুত যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হয়, আবার অন্য ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় নীরবতা বজায় রাখা হয়। এই বৈপরীত্য মুসলিম বিশ্বের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করছে এবং তারা মনে করে যে তাদের দুর্ভোগকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
অষ্টমত, কূটনৈতিক উদ্যোগের দুর্বলতাও একটি বড় সমস্যা। যদি শক্তিশালী ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া যেত, তাহলে অনেক সংঘাত হয়তো রমজানের আগে বা চলাকালীন সময়ে কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।
তবে এই বাস্তবতার মধ্যেও আশা হারানোর কারণ নেই। রমজান মাসের মূল শিক্ষা হলো ধৈর্য, সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচার। এই মূল্যবোধ যদি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হতো, তাহলে হয়তো সংঘাত কমানো সম্ভব হতো। মুসলিম বিশ্বসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোঁজা।
রমজানে মুসলিম বিশ্বকে যুদ্ধের টার্গেট করা হয়েছে এমন ধারণা অনেকের মনে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও বাস্তবতা আরও জটিল। যুদ্ধের পেছনে ধর্মীয় সময়ের চেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে ভূরাজনীতি, ক্ষমতার লড়াই এবং কৌশলগত স্বার্থ। তবুও এই পবিত্র মাসে সংঘাতের ঘটনা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আরও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে। তাই বিশ্ব নেতাদের উচিত অন্তত এই সময়টিকে সম্মান জানিয়ে শান্তি ও মানবিকতার পক্ষে আরও শক্ত অবস্থান নেওয়া। কারণ রমজানের প্রকৃত শিক্ষা হলো সংঘাত না করে সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচারের পথে এগিয়ে যাওয়া।
ইহুদি-নাসারাদের প্রসঙ্গ বাদ দিলেও এবছর পবিত্র রমজানে পাকিস্তানও আফগানিস্তানকে হামলার টার্গেট করলো কেন? বিশ্লেষকগণের নিকট এটি বেশ জটিল ভাবনার উদ্রেক করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই জটিল। আফগানিস্তানে ক্ষমতায় থাকা
তালিবান সরকারের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক কখনো সহযোগিতামূলক, আবার কখনো উত্তেজনাপূর্ণ। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ রয়েছে।
পাকিস্তান বহুবার অভিযোগ করেছে যে আফগান ভূখণ্ডে অবস্থানরত তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) তাদের দেশে সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে আফগান তালেবান সরকার এই অভিযোগের অনেকটাই অস্বীকার করে আসছে। পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি মূলত নিরাপত্তা সংকট। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের বিভিন্ন শহর ও সীমান্ত অঞ্চলে টিটিপির হামলা বেড়েছে বলে দেশটি দাবি করছে। পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব মনে করে, এসব হামলার পরিকল্পনা আফগান সীমান্তের ভেতর থেকেই পরিচালিত হচ্ছে। তাই তারা মাঝে মাঝে সীমান্তের ওপারে অভিযান চালানোর যুক্তি দেখায়। তবে আফগানিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। কাবুলের শাসকগোষ্ঠী মনে করে, পাকিস্তানের এই ধরনের হামলা তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত। আফগান তালেবান নেতারা বারবার বলেছেন যে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অন্য দেশের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর অনুমতি দেওয়া হবে না। ফলে পাকিস্তানের সামরিক অভিযান বা সীমান্ত হামলাকে তারা উসকানিমূলক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছে। এই মতবিরোধ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তুলছে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডুরান্ড লাইন, যা আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার বিতর্কিত সীমান্তরেখা। এই সীমান্তকে কেন্দ্র করে ঐতিহাসিকভাবে দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস ও বিরোধ রয়েছে। আফগানিস্তানের অনেক রাজনৈতিক শক্তি এখনও এই সীমান্তকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে চায় না। তবে এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে কোনো পক্ষের জন্যই ভালো নয়। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান উভয় দেশই রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট ও নিরাপত্তা সমস্যার মুখোমুখি। এই অবস্থায় সংঘাত বাড়লে পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। বরং দুই দেশের উচিত কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পথ খোঁজা।
কিন্তু সেটা না করে মুসলিমবিশ্ব নিজেরাই নিজেদেরকে প্রতিপক্ষ ভাবা শুরু করেছে কেন? বাস্তবতা হলো, বিশ্বরাজনীতির কঠিন সমীকরণ অনেক সময় ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীল থাকছে না মুসলিমদের অনৈক্য ও দুর্বল ঈমানের কারণে। তবুও রমজান মাসে বদর যুদ্ধে জয়লাভ এবং ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ইহুদিরেকে পিছু হটিয়ে দেয়ার উদাহরণে কি এবারের রমজানে ইরান-মার্কিন ইসরায়েল যুদ্ধের অণুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে?তা-না হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধ বিরতি বা বন্ধ করতে চাইলেও ইরান একাই এতদিন ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার প্রেরণা খুঁজে পাচ্ছে কোন নৈতিক শক্তিতে?

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.