
-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
আজকের পৃথিবীতে মানুষ অর্থ উপার্জনের জন্য প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা করছে। উন্নত জীবন, সুন্দর বাসস্থান, সন্তানের ভালো শিক্ষা এবং সামাজিক মর্যাদার জন্য অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু সেই অর্থ যদি অসততা, প্রতারণা, ঘুষ, দুর্নীতি, চুরি, আত্মসাৎ, ওজনে কম দেওয়া, কর ফাঁকি কিংবা অন্যের অধিকার হরণ করে অর্জিত হয়, তাহলে সেই সম্পদ বাহ্যিক সুখ দিতে পারলেও প্রকৃত শান্তি দিতে পারে না। বরং তা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি করে।
আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারণা ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেটা হলো, যে বেশি অর্থবান, সেই বেশি সফল। কিন্তু খুব কম মানুষই সেই অর্থের উৎস প্রশ্ন করে না। একজন ব্যক্তি কোটি টাকার বাড়ি নির্মাণ করেছেন, বিলাসবহুল গাড়িতে চলাফেরা করছেন, বিদেশে সম্পদ গড়েছেন, এসব দেখেই আমরা তাকে সফল বলে ধরে নিই। অথচ একজন সাধারণ শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, চিকিৎসক, সরকারি কর্মচারী কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যদি সৎভাবে উপার্জন করেন, তবে নৈতিকতার বিচারে তার মর্যাদা অনেক বেশি। কারণ, সমাজের প্রকৃত সম্পদ অর্থ নয়, সততা।
মানুষের জীবনে খাদ্য একটি মৌলিক প্রয়োজন। কিন্তু খাদ্যের গুরুত্ব শুধু শরীরের পুষ্টিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের নৈতিকতা, মানসিকতা, পারিবারিক পরিবেশ এবং সামাজিক চরিত্র গঠনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। ইসলামসহ বিশ্বের প্রায় সব ধর্ম ও নৈতিক দর্শনই বৈধ উপার্জন এবং সৎ জীবিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। কারণ, যে অর্থ দিয়ে খাদ্য কেনা হয়, সেই অর্থের উৎস যদি অসৎ হয়, তবে সেই খাদ্য কেবল শরীরের ক্ষুধা মেটালেও আত্মার প্রশান্তি ও জীবনের বরকত নিশ্চিত করতে পারে না। তাই হালাল তহবিল ও হালাল খাবার কেবল একটি ধর্মীয় শিক্ষা বা উপদেশ নয়। এটা একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র এবং মানবিক সভ্যতা গঠনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আজকের বিশ্বে অর্থ উপার্জনের প্রতিযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে তীব্র। মানুষ উন্নত জীবনযাপন, সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদার জন্য নিরলস পরিশ্রম করছে। এই পরিশ্রম স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু যখন অর্থ উপার্জনের পথে অসততা, প্রতারণা, ঘুষ, দুর্নীতি, জালিয়াতি, কর ফাঁকি, ভেজাল ব্যবসা কিংবা অন্যের অধিকার হরণের মতো অনৈতিক পদ্ধতি যুক্ত হয়, তখন সেই সম্পদ ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।
আমাদের সমাজে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এখন অনেক ক্ষেত্রে মানুষ সম্পদের পরিমাণ দিয়ে একজন ব্যক্তির মর্যাদা বিচার করে, সম্পদের উৎস দিয়ে নয়। ফলে যে ব্যক্তি অসৎ পথে বিপুল সম্পদের মালিক হয়, তাকেও সমাজে সম্মান দেওয়া হয়। অন্যদিকে একজন সৎ শিক্ষক, কৃষক, চিকিৎসক, শ্রমিক, সরকারি কর্মচারী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, যিনি সীমিত আয়ে সততার সঙ্গে জীবনযাপন করেন, তাঁকে অনেক সময় যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। এই মানসিকতা একটি জাতির নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।
প্রকৃতপক্ষে হালাল তহবিল বলতে বোঝায় এমন উপার্জন, যা বৈধ, ন্যায্য, স্বচ্ছ এবং অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন না করে অর্জিত হয়েছে। একজন কৃষকের ঘামের বিনিময়ে উপার্জিত অর্থ, একজন শ্রমিকের পরিশ্রমের মজুরি, একজন চিকিৎসকের সৎ চিকিৎসাসেবা, একজন শিক্ষকের নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠদান, একজন ব্যবসায়ীর সততার সঙ্গে পরিচালিত ব্যবসা কিংবা একজন সরকারি কর্মকর্তার নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা দায়িত্ব, এসবই হালাল উপার্জনের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
অন্যদিকে ঘুষ গ্রহণ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা, মিথ্যা হিসাব, খাদ্যে ভেজাল, ওজনে কম দেওয়া, কালোবাজারি, কর ফাঁকি, ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ কোনোভাবেই নৈতিক হতে পারে না। আইন এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে, আর ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও এগুলো কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত।
খাদ্য মানুষের শরীর গঠন করে, কিন্তু উপার্জনের উৎস মানুষের চরিত্র গঠন করে। একজন শিশু যখন এমন পরিবারে বেড়ে ওঠে, যেখানে বাবা-মা সততার সঙ্গে উপার্জন করেন, তখন তার মধ্যেও নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ বিকশিত হয়। বিপরীতে যদি সন্তান দেখে যে অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করেও সমাজে সম্মান পাওয়া যায়, তাহলে তার মধ্যে শর্টকাট পথে সফল হওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তাই হালাল তহবিলের শিক্ষা আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চরিত্র গঠনেরও শিক্ষা।
বর্তমান সময়ে দুর্নীতি বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়। ঘুষ, কমিশন, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, অর্থপাচার এবং সরকারি সম্পদের অপব্যবহার শুধু রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতিই করে না; বরং জনগণের আস্থাও নষ্ট করে। একটি সড়ক নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে তৈরি হলে তা দ্রুত নষ্ট হয়। একটি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি দুর্নীতির কারণে নিম্নমানের হলে রোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণে অনিয়ম হলে শিক্ষার্থীদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। অর্থাৎ অসৎ উপার্জনের প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনেই এসে পড়ে।
একইভাবে ব্যবসায়িক নৈতিকতার প্রশ্নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যে ভেজাল, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুতদারি, অতিরিক্ত মূল্য আদায় কিংবা নিম্নমানের পণ্য বিক্রি করে সাময়িকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি সমাজের জন্য ক্ষতিকর। একজন সৎ ব্যবসায়ী শুধু নিজের লাভের কথা ভাবেন না; তিনি ক্রেতার আস্থা ও সমাজের কল্যাণকেও গুরুত্ব দেন। প্রকৃত ব্যবসায়িক সফলতা লাভের পাশাপাশি বিশ্বাস অর্জনের মধ্যেই নিহিত।
শিক্ষকদেরও এখানে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। একজন শিক্ষক যদি শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান না দিয়ে সততা, মানবিকতা ও নৈতিকতার মূল্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে পারেন, তাহলে একটি প্রজন্ম ইতিবাচকভাবে গড়ে উঠবে। একইভাবে পরিবারে বাবা-মায়ের আচরণই সন্তানের প্রথম শিক্ষা। সন্তানকে যদি বলা হয়, অল্প আয় হলেও অসৎ পথে যেও না বাছা, তবে সেই শিক্ষা সারাজীবন তার নৈতিক শক্তি হিসেবে কাজ করবে।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিলাসবহুল জীবনযাপনকে প্রায়ই সাফল্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। দামি গাড়ি, অট্টালিকা, বিদেশ ভ্রমণ কিংবা বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে অনেক তরুণ দ্রুত ধনী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়ে। কিন্তু এই সম্পদের উৎস নিয়ে আলোচনা খুব কমই হয়। সমাজে যদি সম্পদের উৎসের চেয়ে প্রদর্শনকে বেশি মূল্য দেওয়া হয়, তাহলে সততা ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাবে। তাই আমাদের সামাজিক মূল্যবোধেও পরিবর্তন আনা জরুরি।
হালাল তহবিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দায়িত্বশীলতা। একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি নির্ধারিত সময়ে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন, একজন চিকিৎসক যদি রোগীর কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেন, একজন প্রকৌশলী যদি নির্মাণকাজে মান বজায় রাখেন, একজন সাংবাদিক যদি সত্য প্রকাশে আপস না করেন এবং একজন ব্যবসায়ী যদি ন্যায্য মূল্য গ্রহণ করেন তাহলেই প্রকৃত অর্থে হালাল উপার্জনের পরিবেশ তৈরি হবে।
এটাও মনে রাখা দরকার যে, হালাল উপার্জন মানেই ধনী হওয়া নয়, আবার সীমিত আয় মানেই ব্যর্থতা নয়। বরং সৎ উপার্জনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো আত্মসম্মান, মানসিক শান্তি এবং সামাজিক বিশ্বাসযোগ্যতা। যে ব্যক্তি রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন, কারণ তিনি জানেন তাঁর উপার্জনে কারও অধিকার ক্ষুণ্ন হয়নি, তিনি প্রকৃত অর্থেই সফল।
সমাজে আজ এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা সীমিত আয়েও অসাধারণ সততার পরিচয় দিচ্ছেন। কোনো রিকশাচালক যাত্রীর হারানো অর্থ ফিরিয়ে দেন, কোনো দোকানদার ভুল করে বেশি দেওয়া টাকা ফেরত দেন, কোনো সরকারি কর্মচারী ঘুষ প্রত্যাখ্যান করেন, কোনো ব্যবসায়ী সংকটের সময়ও ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি করেন। এই মানুষগুলোই আমাদের সমাজের প্রকৃত নায়ক। তাঁদের গল্প যত বেশি প্রচারিত হবে, তত বেশি মানুষ সততার প্রতি অনুপ্রাণিত হবে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম, পরিবার এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অসৎভাবে ধনী হওয়ার চেয়ে সৎভাবে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাকে বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সন্তানদের শেখাতে হবে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন অঢেল সম্পদ নয় বরং এমন একটি চরিত্র, যার প্রতি মানুষ আস্থা রাখতে পারে।
হালাল তহবিলের মাধ্যমে ও হালাল খাবার গ্রহণ করা ন্যায়, সততা, মানবিকতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের একটি সমন্বিত জীবনদর্শন। যে ব্যক্তি সৎভাবে উপার্জন করেন, তিনি শুধু নিজের পরিবারকেই পবিত্র আহার দেন না; তিনি সমাজে নৈতিকতার ভিত্তিও শক্তিশালী করেন। আর যে সমাজে অধিকাংশ মানুষ বৈধ উপার্জনকে সম্মান করে, অন্যায়কে প্রত্যাখ্যান করে এবং সততাকে জীবনের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে, সেই সমাজই দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন, সামাজিক শান্তি এবং প্রকৃত কল্যাণ অর্জন করতে সক্ষম হয়।
তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে একটি দৃঢ় অঙ্গীকার করি যে, আমাদের উপার্জন হবে সৎ, আমাদের তহবিল হবে হালাল, আমাদের খাবার হবে পবিত্র, আমাদের আচরণ হবে নৈতিক এবং আমাদের সন্তানদের জন্য আমরা রেখে যাব এমন এক মূল্যবোধ, যেখানে সততা কখনো দুর্বলতা নয়, বরং একজন মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি। ব্যক্তিগত জীবনের এই ছোট ছোট নৈতিক সিদ্ধান্তই একদিন দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]