
-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও দেশের নানা প্রান্তে এমন বহু মানুষ আছেন, যাদের শরীরে আজও সেই আন্দোলনের রক্তাক্ত স্মৃতি বহন করে চলেছে। কেউ হারিয়েছেন একটি বা দুটি পা, কেউ হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি, কারও শরীরে এখনও রয়ে গেছে বুলেটের টুকরো, কেউ চিরদিনের জন্য হুইলচেয়ারের বন্দি। তারা বেঁচে আছেন, কিন্তু আগের জীবনে আর ফিরতে পারেননি। অনেকেই তাঁদের ‘জীবিত শহীদ’ বলে অভিহিত করেন। কারণ তাঁরা প্রাণ না হারালেও জীবনের স্বাভাবিকতা হারিয়েছেন।
জুলাই বিপ্লবের ইতিহাসে যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁরা জাতির শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত। কিন্তু আরেকটি শ্রেণি আছে, যাঁদের ত্যাগ প্রতিদিন চোখের সামনে থেকেও অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। তাঁরা সেই মানুষ, স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন বা শরীরে বুলেটের ক্ষত নিয়ে আজও বেঁচে আছেন। তাঁরা জীবিত, কিন্তু তাঁদের জীবন আর আগের মতো নেই। তাঁদের অনেকেই আজ পুনর্বাসনহীন, কর্মহীন এবং মর্যাদাহীন জীবনযাপন করছেন।
জুলাই বিপ্লবে অঙ্গহারানো জীবিত শহীদদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব নিয়ে সমালোচনা যেমন রয়েছে, তেমনি এটিও স্বীকার করতে হবে যে তাঁদের সহায়তায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। আহতদের চিকিৎসার জন্য দেশ-বিদেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা, সরকারি ব্যয়ে অস্ত্রোপচার, কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজন, পুনর্বাসন ভাতা, আর্থিক অনুদান এবং কয়েকজনের জন্য সরকারি চাকরির ব্যবস্থা,এসব পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
কিন্তু ভাবনার বিষয় হলো, এসব উদ্যোগ কি পর্যাপ্ত? বাস্তবতা বলছে, এখনো বহু আহত ব্যক্তি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের বাইরে রয়ে গেছেন। এককালীন আর্থিক সহায়তা দিয়ে একটি পরিবারকে সারাজীবন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। যিনি একটি পা হারিয়েছেন, তাঁর নিয়মিত কৃত্রিম অঙ্গ পরিবর্তন, ফিজিওথেরাপি ও চিকিৎসা প্রয়োজন। যিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, তাঁর বিশেষ শিক্ষা, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দরকার। যিনি হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন, তাঁর জন্য প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত না হলে তিনি সমাজের মূলধারায় ফিরতে পারবেন না। অর্থাৎ পুনর্বাসনকে একটি চলমান ও অধিকারভিত্তিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে।
জুলাই আন্দোলনে আহতদের অনেকেই প্রথমদিকে মানুষের সহানুভূতি ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। তাঁদের চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমের আলো যেমন অন্যদিকে সরে গেছে, তেমনি অনেক আহত মানুষও নীরবে বিস্মৃতির অন্ধকারে চলে গেছেন। কেউ চাকরি হারিয়েছেন, কেউ ব্যবসা চালাতে পারছেন না, কেউ চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। সবচেয়ে করুণ বিষয় হলো, অনেকের শরীরে এখনও বুলেটের স্প্লিন্টার রয়ে গেছে, যা নিয়মিত ব্যথা, সংক্রমণ বা শারীরিক জটিলতার কারণ হচ্ছে।
যিনি একটি পা হারিয়েছেন, তাঁর জন্য বিষয়টি জীবিকার সংকট, আত্মমর্যাদার সংকট এবং মানসিক বিপর্যয়েরও নাম। যিনি দুই চোখ হারিয়েছেন, তাঁর কাছে পৃথিবীর সমস্ত রং এক মুহূর্তে নিভে গেছে। যিনি কোমরের নিচ থেকে পঙ্গু হয়ে পড়েছেন, তাঁর প্রতিটি দিনের শুরু হয় অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভর করে। তাঁদের অনেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। আজ তাঁদের সন্তানদের পড়াশোনা, পরিবারের চিকিৎসা, দৈনন্দিন ব্যয় সবকিছুই অনিশ্চয়তার মধ্যে।
বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, আহতদের মধ্যে অনেক তরুণ এখনও উন্নত পুনর্বাসনের সুযোগ পাননি। একটি কৃত্রিম পা বা উন্নত প্রস্থেটিক অঙ্গ শুধু হাঁটার সুযোগই দেয় না; এটি একজন মানুষকে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেয়। একইভাবে চোখ হারানো ব্যক্তিদের জন্য উন্নত পুনর্বাসন, ব্রেইল শিক্ষা, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কর্মদক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা অপরিহার্য। পঙ্গু ব্যক্তিদের জন্য শুধু হুইলচেয়ার নয়, হুইলচেয়ার-উপযোগী অবকাঠামোও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় সমাজ তাঁদের দ্বিতীয়বারের মতো প্রতিবন্ধী করে তুলবে।
শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক ট্রমাও একটি বড় বাস্তবতা। অনেক আহত ব্যক্তি রাতে ঘুমাতে পারেন না, গুলির শব্দ শুনলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশায় ভোগেন। পরিবারও দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ও আর্থিক চাপ বহন করে। অথচ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো পুনর্বাসন নীতির কেন্দ্রে আসেনি। এই ঘাটতি পূরণ না হলে পুনর্বাসন কখনোই পূর্ণাঙ্গ হবে না।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আহত মানুষদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কতটা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে? তাঁদের অভিজ্ঞতা, তাঁদের কষ্ট এবং তাঁদের প্রত্যাশা শুনে পুনর্বাসন নীতি প্রণয়ন করা হলে সেটি অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। তাঁদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, কিন্তু তাঁদের কথা শোনা হবে না, এটি ন্যায়সংগত হতে পারে না।
রাষ্ট্রের নৈতিক দায় এখানেই শেষ হতে পারে না যে, আহতদের এককালীন কিছু অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। একটি কৃতজ্ঞ রাষ্ট্রের উচিত তাঁদের জন্য আজীবন চিকিৎসা, পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। উন্নত অনেক দেশে যুদ্ধাহত বা গণআন্দোলনে স্থায়ীভাবে আহত ব্যক্তিদের জন্য পৃথক পুনর্বাসন কমিশন, বিশেষ হাসপাতাল, কৃত্রিম অঙ্গ সরবরাহ, কর্মসংস্থান কোটা এবং পরিবারভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচি রয়েছে। বাংলাদেশেও এমন একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
জুলাই বিপ্লবের চেতনা যদি সত্যিই গণমানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার চেতনা হয়, তাহলে সেই মর্যাদার প্রথম দাবিদার হওয়া উচিত এই জীবিত শহীদরা। তাঁদের জীবন যেন দয়া বা করুণার বিষয় না হয়ে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হয়। কারণ তাঁরা ভিক্ষা চান না; তাঁরা চান সম্মান, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন।
আজ বাস্তবতা হলো, অনেক অঙ্গহারা মানুষ পুনর্বাসনের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। কেউ চাকরি হারিয়ে পরিবারের বোঝা হয়ে যাওয়ার কষ্টে ভুগছেন, কেউ চিকিৎসার অর্থের অভাবে অসহায়, কেউ আবার সমাজের অবহেলা ও বিস্মৃতির শিকার। একসময় যাঁদের সাহস ও আত্মত্যাগের প্রশংসায় দেশ মুখর ছিল, তাঁদের অনেকেই আজ নীরবে জীবনযুদ্ধ লড়ছেন। তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় কষ্ট হয়তো শারীরিক যন্ত্রণা নয়, বরং এই অনুভূতি যে রাষ্ট্র ও সমাজ তাঁদের দ্রুত ভুলে গেছে।
একটি পা হারানো মানুষের জন্য কৃত্রিম অঙ্গ, একটি চোখ হারানো মানুষের জন্য উন্নত পুনর্বাসন, একজন পঙ্গু মানুষের জন্য সহজপ্রাপ্য অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা এসব কোনো দয়া নয়। এগুলো রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। যাঁরা দেশের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও নাগরিক অধিকারের সংগ্রামে নিজের শরীর উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সর্বোত্তম উপায় হলো তাঁদের স্বনির্ভর ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা।
এ জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় পুনর্বাসন কর্মসূচি। আহত ব্যক্তিদের জন্য আজীবন চিকিৎসাসেবা, মানসম্মত কৃত্রিম অঙ্গ সরবরাহ, পুনর্বাসন ভাতা, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকার, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং তাঁদের সন্তানদের শিক্ষা নিশ্চিত করার মতো বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে তাঁদের সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও জরুরি।
আমাদের সমাজেরও আত্মসমালোচনা করা দরকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন পোস্ট দেওয়া সহজ, কিন্তু একজন অঙ্গহারানো মানুষের পাশে দীর্ঘদিন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন। প্রকৃত দেশপ্রেম ও মানবিকতা প্রকাশ পায় তখনই, যখন আমরা তাঁদের করুণার পাত্র নয়, অধিকারসম্পন্ন সম্মানিত নাগরিক হিসেবে দেখি।
অতএব, এখনই সময় প্রতীকী শ্রদ্ধা থেকে বাস্তব দায়িত্ব পালনের। ফুলের তোড়া, স্মরণসভা কিংবা বার্ষিক শোকানুষ্ঠান না করে জীবিত শহীদদের জন্য প্রয়োজন মর্যাদাপূর্ণ জীবন, নিরাপদ ভবিষ্যৎ এবং সম্মানজনক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন করা। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত স্মরণ রাখে না কে কত সুন্দর বক্তৃতা দিয়েছিল। ইতিহাস স্মরণ রাখে বাস্তবক্ষেত্রে কে আহত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছিল। জুলাই বিপ্লবের অঙ্গহারানো জীবিত শহীদদের প্রতি বাস্তবিকভাবে সেই মানবিক ও রাষ্ট্রিক দায়িত্ব পালন করাই হোক আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]