
নাটোর প্রতিনিধি :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে (নাটোর ও নওগাঁ) বিএনপি জোটের মনোনয়ন পেয়েছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও নাটোরের লালপুরের গৌরিপুর গ্রামের সানজিদা ইসলাম তুলি। অপর দিকে পার্বত্য অঞ্চলের সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন খ্রিষ্টান ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের নেত্রী আদিবাসী ওঁরাও সম্প্রদায়ের বড়াইগ্রামের আন্না মিনজ।
সোমবার (২০ এপ্রিল ২০২৬) দুপুরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত বিএনপির ও জোটের ৩৬ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, এবার বিএনপির মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়েছে মোট এক হাজার ২৫টি। এর মধ্যে জমা দিয়েছেন প্রায় ৯০০ জন। প্রতিটি ফরমের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে দুই হাজার টাকা এবং মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার সময় প্রার্থীদের দিতে হয় ৫০ হাজার টাকা জামানত। গত ১৭ ও ১৮ এপ্রিল প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।
সানজিদা ইসলাম তুলি :
রাজপথের ত্যাগী, নির্যাতিত, শিক্ষিত, পরীক্ষিত কর্মী, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব সানজিদা ইসলাম তুলি। তিনি ছাত্রদলের বিগত কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তাছাড়া জিয়া স্মৃতি পাঠাগারের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
একজন ক্যান্সারের রোগী হয়েও আন্দোলন সংগ্রামে কখনো পিছিয়ে ছিলেন না। এমন একজন সংগ্রামী নেত্রীকে বাংলাদেশে মানুষ সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য হিসেবে পেয়েছেন। তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও কেন্দ্রীয়ভাবে ঘোষিত প্রায় শতভাগ কর্মসূচিতে উপস্থিতি তাঁর গ্রহন যোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।
তাঁর বাবা হাজি মফিজুল ইসলাম ছিলেন নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার ২নং ঈশ্বরদী ইউনিয়ন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও লালপুর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত থেকে সাবেক প্রতিমন্ত্রী মরহুম ফজলুর রহমান পটলের সাথে কাজ করে গেছেন। বাবার আদর্শে ছোট বেলা থেকেই বিএনপির রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন তুলি। তবে ইডেন কলেজে ভর্তির পর থেকে তিনি ছাত্র রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত হন। রাজপথের রাজনীতি, বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামে যুক্ত থাকায় বহুবার হামলা-মামলা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তার পরও সবসময়ই সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের দিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে থাকার কারণে হামলায় আহত হন। ২০২১ সালের ১ মার্চ প্রেসক্লাবের সামনে পুলিশের হামলায় রক্তাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ২০২২ সালের ২৪ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বরে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের লোহার রডের আঘাতে রক্তাক্ত হন।
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনের মহাসমাবেশে পুলিশের হামলার পরও সকল হরতাল অবরোধ উপস্থিত থেকেছেন। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ভোর থেকেই প্রেসক্লাব ও মৎস্যভবনের সামনে পুলিশের সাথে লড়াই করেন।
সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, বিগত আন্দোলন সংগ্রামে যাঁরা মাঠে ছিলেন- তাদেরকে দল এবার সংরক্ষিত মহিলা আসনে স্থান দিয়েছে। আমার নামে পল্টন ও রমনা থানায় দুইটা মামলাও রয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনীত করেছেন। আমি সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করবো। নিজেকে দেশের সেবায় সর্বদা নিয়োজিত রাখবো ইনশাআল্লাহ্।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন দল ক্ষমতায় ছিল না। তাই ক্ষমতায় আসার জন্য বিভিন্ন হিসাব নিকাশের কারণে অনেক ত্যাগী নেতাকে নমিনেশন দেওয়া সম্ভব হয়নি। যা দলের নেতাকর্মীরা মেনে নিয়ে নির্বাচন করেছে। দীর্ঘদিন রাজপথের রাজনীতির সাথে জড়িত, ত্যাগী, নির্যাতিত, মামলা-হামলার শিকার হওয়ায় দল মূল্যায়ন করায় দলীয় নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
আন্না মিনজ :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন খ্রিষ্টান ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের নেত্রী আন্না মিনজ। তিনি নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার জোনাইল গ্রামের বাসিন্দা ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদক জন গমেজের সহধর্মিণী। ঠাকুরগাঁওয়ের আউলিয়াপুর গ্রামের আদিবাসী পাউলুস মিনজ এর বিদুষী কন্যা তিনি।
বড়াইগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মনোনয়নের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সর্বস্তরে, বিশেষ করে খ্রিষ্টান ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মধ্যে উচ্ছ্বাস তৈরি হয়। আন্না মিনজ ও তাঁর স্বামী ঢাকায় অবস্থান করলেও স্থানীয় লোকজন দল বেঁধে জোনাইল গ্রামে তাঁদের বাড়িতে যান। সেখানে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং তাঁদের মাধ্যমে আন্না মিনজকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান। এ সময় অনেকে মিষ্টি বিতরণ করেন।
আন্না মিনজের স্বামী বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদক আইনজীবী জন গমেজ তাঁর ফেসবুক পেজে তাঁর স্ত্রীর জন্য দোয়া ও শুভকামনা চেয়ে লেখেন, তিনি যেন সুবিধাবঞ্চিত জনগণ, খ্রিষ্টান ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের উন্নয়নে সফলভাবে ভূমিকা রাখতে পারেন।
বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের নাটোর জেলা আহ্বায়ক অমর ডি কস্তা লিখেছেন, ‘দেশের সব ধর্ম-বর্ণ-সংস্কৃতিকে বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার একটি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন মহান সংসদ গড়ার চেষ্টা করছেন এবং তাতে সফল ও প্রশংসিত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। আন্না মিনজ একজন সফল ও সুযোগ্য নারীনেত্রী। তাঁর নেতৃত্ব এই এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।’
বনপাড়া খ্রিষ্টান কোঅপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাবলু রেনেতোস কোড়াইয়া বলেন, ‘আন্না মিনজের বিএনপিতে মনোনয়ন পাওয়াটা সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিএনপির সিনিয়র কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।’
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের নাটোর জেলা সভাপতি প্রদীপ নাকরা বলেন, ‘সংসদে অধিকারবঞ্চিত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পক্ষে কথা বলার জন্য একজন প্রতিনিধি থাকা দরকার ছিল। বর্তমান বিএনপি সরকারের এই উদার, নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ভাবনাকে সম্মান জানাই।’