সোমবার | ২০ জুলাই, ২০২৬ | ৫ শ্রাবণ, ১৪৩৩

শিরোনাম
মাটি খেকোর কবলে একপায়ে দাঁড়িয়ে বৈদ্যুতিক খুঁটি ‘মোস্ট সাসটেইনেবল কোম্পানি অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার জিতেছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ মোদির গদি কি তেলাপোকায় তটস্থ? নেশার টাকার জন্য ভাগিনার বাইসাইকেল চুরি, বোনের মামলায় ভাই গ্রেপ্তার একদিনের ব্যবধানে শিশু দুই ভাইয়ের রহস্যজনক মৃত্যু সিবিইটি বৃত্তি পেলেন মাজার শরীফ কলেজের শিক্ষার্থীরা লালপুরে লাম্পিতে আক্রান্ত প্রায় ২০ হাজার গরু রূপপুরের কমিশনিং নিয়ে বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনা, প্রতিবাদ জানালো এনপিসিবিএল লালপুরে একদিনের ব্যবধানে দুই শিশুর মৃত্যু, আশঙ্কাজনক অবস্থায় বাবা বিএনপি সরকারের ৫ মাসে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর উদ্যোগে লালপুরে ১৭৯ প্রকল্প বাস্তবায়ন

মোদির গদি কি তেলাপোকায় তটস্থ?

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
সম্প্রতি ভারতে ককরোচ বা তেলাপোকা নামক নতুন একটি রাজনৈতিক দলের উন্মেষ ঘটেছে। রাজনীতিতে ঝড় তোলা এই ককরোচ পার্টি বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব তৎপর। এখন তারা রাজপথেও সোচ্চার হতে শুরু করেছে। সম্প্রতি দিল্লীর যন্তর-মন্তরে তাদের সমর্থনে জেন জি- দের নিয়ে এক বিশাল প্রতিবাদ সভা রাজপথ কাঁপিয়ে তুলেছে। সেই সুযোগে এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতিহাসের নমরুদের মশা, আবাবিল কিংবা নতুন দল তেলাপোকা প্রসঙ্গ নিয়ে নানা রাজনৈতিক আলোচনা সমালোচনা চলছে।
বিজেপি সরকার বিক্ষোভকারীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান খতিয়ে দেখছে। তাদের মতে, ‘এই আন্দোলনকারীরা কেবল জেন জি বা তরুণ প্রজন্মের একটি নির্দিষ্ট অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। ককরোচ বা সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপ এতদিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন এবং যন্তর-মন্তরের কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করতে তিনি দ্রুত দেশে ফিরেছেন, ….যন্তর-মন্তরের
বিক্ষোভে ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, চাকরিপ্রার্থী এবং বিভিন্ন বামপন্থি ও সামাজিক সংগঠনের কর্মীরা অংশ নিয়েছেন এবং তাদের বিক্ষোভে দিল্লীর রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।’ এর ফলে সত্যিই কি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তেলাপোকার উন্মেষে তার গদি নিয়ে ভীত?
কারণ, রাজনীতির ভাষা কখনো সরল নয়। রাজনীতির জগতে উপমা ও প্রতীকের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। অনেক সময় একটি উপমা, একটি রূপক কিংবা একটি লোকমুখে প্রচলিত বাক্য দীর্ঘ বিশ্লেষণের চেয়েও শক্তিশালী বার্তা বহন করে। ইতিহাস, ধর্মীয় কাহিনি এবং লোকমুখে প্রচলিত নানা গল্পের মাধ্যমে মানুষ প্রায়ই ক্ষমতা, অহংকার এবং পরিবর্তনের বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করে। নমরুদ মরেছে মশার কামড়ে, আব্রাহা আবাবিল পাখির পাথরে, মোদী গদি ছাড়বে তেলাপোকার কামড়ে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনায় শোনা যাওয়া এই উপমাটি আসলে ক্ষমতা, অহংকার এবং ক্ষুদ্র শক্তির প্রভাব সম্পর্কে একটি গভীর রাজনৈতিক সত্যকে তুলে ধরে।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে ক্ষমতাবানদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো তারা নিজেদের শক্তিকে স্থায়ী মনে করেন। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যও অনেক সময় সবচেয়ে ছোট কারণের কাছে পরাজিত হয়েছে। ইসলামী ঐতিহ্যে নমরুদের কাহিনি সেই শিক্ষাই দেয়। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, বিশাল ক্ষমতার অধিকারী নমরুদ শেষ পর্যন্ত একটি ক্ষুদ্র মশার আক্রমণে পরাজিত হয়।
ঘটনাটির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু এর প্রতীকী অর্থ অত্যন্ত শক্তিশালী। বার্তাটি হলো, ক্ষমতা যত বড়ই হোক, তার পতনের কারণ সবসময় বড় কিছু হবে এমন নয়।
একইভাবে আব্রাহার কাহিনিতে বিশাল হাতির বাহিনী নিয়ে কাবা আক্রমণের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা এক শক্তিশালী সেনাপতির পরাজয়ের গল্প মুসলিম সমাজে সুপরিচিত। সেখানে আবাবিল পাখির নিক্ষিপ্ত ক্ষুদ্র পাথর একটি মহাশক্তির অহংকারকে ভেঙে দিয়েছিল। এখানে পাখি নয়, মূল বার্তা হলো, অবহেলিত শক্তিকে কখনো তুচ্ছ ভাবা উচিত নয়।
ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নরেন্দ্র মোদি এখনও দেশটির অন্যতম জনপ্রিয় নেতা। তাঁর নেতৃত্বে বিজেপি দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি চিরন্তন সত্য হলো, কোনো জনপ্রিয়তা স্থায়ী নয়।
প্রতিটি ক্ষমতার ভেতরেই ভবিষ্যৎ সংকটের বীজ লুকিয়ে থাকে।
এই তেলাপোকার টার্গেট কী হতে পারে? কেউ বলবেন, এটি হতে পারে বেকারত্ব। কেউ বলবেন, মূল্যস্ফীতি। কেউ মনে করেন কৃষকদের অসন্তোষ, কেউ মনে করেন আঞ্চলিক বৈষম্য, আবার কেউ সামাজিক বিভাজনকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখেন। এসব ইস্যু প্রথম দিকে ছোট বলে মনে হতে পারে। কিন্তু যখন কোটি মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে যায়, তখন সেগুলোই ক্ষমতার ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয়।
বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তনের সূচনা প্রায়ই ক্ষুদ্র ঘটনা দিয়ে হয়েছে। ফ্রান্সে রুটির দাম, রাশিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষ, আরব বসন্তে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর আত্মাহুতি, এসব ঘটনাই প্রমাণ করে যে কখনো কখনো একটি সামান্য বলে মনে হওয়া বিষয় রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার সবচেয়ে বড় শত্রু বিরোধী দল নয় বরং আত্মতুষ্টি। যখন কোনো সরকার বিশ্বাস করতে শুরু করে যে জনগণ তাদের ছাড়া অন্য কাউকে কল্পনা করতে পারে না, তখনই ঝুঁকি তৈরি হয়। কারণ জনগণ সবসময় পরিবর্তনের সম্ভাবনা ধরে রাখে। তারা ধীরে ধীরে মত বদলায়, কিন্তু যখন বদলায় তখন তার প্রভাব গভীর হয়।
মোদির ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলোর দুর্বলতা প্রায়ই আলোচনায় আসে। কিন্তু রাজনৈতিক বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, কোনো সরকার কেবল বিরোধী দলের কারণে ক্ষমতা হারায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকার নিজের ভুল, নিজের সীমাবদ্ধতা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই সংকটে পড়ে। অর্থাৎ তেলাপোকা বাইরের নয়, অনেক সময় ভেতরের। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য কিংবা যুক্তরাষ্ট্র সব গণতন্ত্রেই একই চিত্র দেখা যায়। প্রথমে জনগণ কিছু অসন্তোষ প্রকাশ করে। ক্ষমতাসীনরা সেটিকে গুরুত্ব দেয় না। পরে সেই অসন্তোষ আন্দোলনে রূপ নেয়। এরপর সেটি নির্বাচনী ফলাফলে প্রতিফলিত হয়। অর্থাৎ ক্ষুদ্র সংকেতকে উপেক্ষা করার মূল্য একসময় রাজনৈতিকভাবেই দিতে হয়।
আজকের বিশ্বে ক্ষমতার কাঠামোও বদলে গেছে। আগে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র জনমত নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। এখন ডিজিটাল যুগে সাধারণ নাগরিকের হাতেও শক্তিশালী যোগাযোগমাধ্যম রয়েছে। ফলে কোনো সমস্যা গোপন রাখা কঠিন। এই বাস্তবতায় তেলাপোকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ ক্ষুদ্র অসন্তোষও দ্রুত বড় আকার নিতে পারে।
তবে কোনো রাষ্ট্রনেতা বাস্তব তেলাপোকাকে ভয় পান বলে মনে করার কারণ নেই। কিন্তু রাজনৈতিক অর্থে প্রত্যেক ক্ষমতাসীন নেতারই তেলাপোকাকে ভয় পাওয়ার কারণ আছে। কারণ সেটি এমন কোনো ছোট সমস্যা হতে পারে, যা আজ তুচ্ছ মনে হচ্ছে কিন্তু আগামীকাল জনমতের ঝড়ে পরিণত হতে পারে। অতএব, এই উপমাগুলোকে ব্যক্তি আক্রমণ হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতার প্রকৃতি সম্পর্কে একটি চিরন্তন রাজনৈতিক সত্য হিসেবে দেখা উচিত। ইতিহাসের আদালতে বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে সাম্রাজ্য, শাসক এবং রাজনৈতিক শক্তির পরিণতি নির্ধারণ করে শুধু বড় যুদ্ধ নয়; কখনো কখনো একটি মশা, একটি পাখি কিংবা প্রতীকী অর্থে একটি তেলাপোকাও।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে বিভিন্ন ইস্যুতে তরুণদের অংশগ্রহণে আন্দোলন, চাকরিপ্রার্থীদের বিক্ষোভ, শিক্ষার্থী অসন্তোষ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ এবং বিভিন্ন নাগরিক দাবিকে কেন্দ্র করে জনমতের আলোচনায় একটি প্রশ্ন বারবার উঠে আসছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কি সত্যিই এমন কোনো ক্ষুদ্র অথচ ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে ভাবছেন?
কারণ, ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশগুলোর একটি। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গল্প যতই বলা হোক, অনেক তরুণের মনে প্রশ্ন হলো, সেই প্রবৃদ্ধির সুফল কি তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে? চাকরির প্রতিযোগিতা, নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়মের অভিযোগ, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তরুণদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি করছে।
রাজনীতির ইতিহাস বলে, তরুণদের অসন্তোষকে হালকাভাবে নেওয়া বিপজ্জনক। কারণ যুবসমাজ শুধু ভোটার নয়; তারা সামাজিক প্রবণতা, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক আলোচনার দিকনির্দেশক শক্তি। যে সরকার তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বুঝতে পারে, সে দীর্ঘমেয়াদে সুবিধা পায়। আর যে সরকার তাদের উদ্বেগকে উপেক্ষা করে, সে ধীরে ধীরে জনসমর্থনের ক্ষয়ের ঝুঁকিতে পড়ে।
তবে এটাও সত্য যে ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল। মোদি এখনও একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থানে রয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শক্তির সাংগঠনিক ভিত্তি বিস্তৃত, সমর্থকগোষ্ঠী বড় এবং জাতীয় পর্যায়ে তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও উল্লেখযোগ্য। ফলে বিচ্ছিন্ন কিছু আন্দোলন বা প্রতিবাদকে সরাসরি তাঁর রাজনৈতিক পতনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা বাস্তবসম্মত নয়।
ডিজিটাল যুগে এই বাস্তবতা আরও জটিল। আগে কোনো স্থানীয় ঘটনা স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকত। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে একটি ছোট ঘটনা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জাতীয় বিতর্কে পরিণত হতে পারে। ফলে ক্ষমতাসীনদের জন্য ছোট বিষয় বলে কিছু আর অবশিষ্ট নেই।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হারবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ভারতীয় জনগণই নেবেন। কোনো উপমা, স্লোগান বা রাজনৈতিক বক্তব্য ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না। কিন্তু এসব উপমা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, ক্ষমতা কখনো স্থায়ী নয়, আর ছোট সমস্যাকে ছোট ভেবে অবহেলা করা বিপজ্জনক।
বলা যায়, যে কোনো গণতান্ত্রিক দেশের যে কোনো ক্ষমতাসীন নেতারই সেই রাজনৈতিক দলের নাম তেলাপোকা বা ইতিহাসের উদাহরণ প্রতীকী তেলাপোকা সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত। কারণ ইতিহাসের শিক্ষা হলো, বড় সাম্রাজ্যের পতন অনেক সময় বড় আঘাতে ঘটে না। বরং ছোট, অবহেলিত এবং উপেক্ষিত সংকেত থেকেই তার পতন শুরু হয়। তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
কোনো আন্দোলন বা জনঅসন্তোষকে দেখেই ক্ষমতার অবসান ঘটবে বলে ধরে নেওয়া যেমন ভুল, তেমনি জনগণের ক্ষুদ্র অসন্তোষকে একেবারে উপেক্ষা করাও ভুল। গণতন্ত্রে ক্ষমতার শক্তি ও দুর্বলতা দুটোর উৎসই জনগণ।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.