
-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
বাংলাদেশ পুলিশে বিসিএস ক্যাডারের নারী কর্মকর্তারা অপরাধ দমন, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, শান্তিরক্ষা মিশন, ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, সাইবার ক্রাইম, মব কালচার প্রতিরোধ, মানব পাচার রোধ, দাঙ্গা দমন, সব ধরনের অপরাধে নিয়ন্ত্রণে টহল ডিউটি, নারী ও শিশু সুরক্ষা এবং কমিউনিটি পুলিশিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। এমন বাস্তবতায় হঠাৎ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত যদি পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা, যুক্তি ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া ছাড়া গ্রহণ করা হয়, তবে তা শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ক্ষতিই নয় বরং নারী নেতৃত্বের প্রতি একটি নেতিবাচক বার্তা বহন করে।
অবশ্যই এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সেটা হলো, সরকার আইন অনুযায়ী জনস্বার্থে নির্দিষ্ট বিধানের আওতায় সরকারি কর্মচারীকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ক্ষমতা রাখে। এই ক্ষমতার অস্তিত্ব প্রশাসনিক ব্যবস্থার অংশ। কিন্তু ক্ষমতার বৈধতা এবং ক্ষমতার ন্যায়সংগত প্রয়োগ এক বিষয় নয়। যে সিদ্ধান্ত আইনি হতে পারে, সেটি সব সময় ন্যায্য, স্বচ্ছ বা গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। তাই বাধ্যতামূলক অবসরপ্রদানের ক্ষেত্রে আইনের পাশাপাশি প্রশাসনিক ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং পেশাগত মর্যাদাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সংবিধান নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা ও সমান সুযোগের নিশ্চয়তা দিয়েছে। রাষ্ট্র যখন নারীদের উচ্চশিক্ষা, বিসিএস, পুলিশ একাডেমি, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন এবং নেতৃত্বের পর্যায়ে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করে, তখন একই রাষ্ট্রের প্রশাসনিক আচরণেও সেই সম্মান প্রতিফলিত হওয়া উচিত। কোনো নারী কর্মকর্তা যদি দীর্ঘ কর্মজীবনে সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে থাকেন, তবে তার কর্মজীবনের শেষ অধ্যায় যেন সম্মানজনক হয়, এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
বাধ্যতামূলক অবসর নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো স্বচ্ছতা। অনেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সাধারণ জনগণ জানতে পারেন না, কোন মানদণ্ডে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে নানা ধরনের গুঞ্জন, অনিশ্চয়তা এবং অবিশ্বাসের জন্ম নেয়। একটি পেশাদার পুলিশ বাহিনীতে এই ধরনের অনিশ্চয়তা কর্মপরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কর্মকর্তারা যদি মনে করেন যে তাঁদের ভবিষ্যৎ কর্মদক্ষতার চেয়ে অস্বচ্ছ সিদ্ধান্তের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাহলে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের মানসিকতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
নারী কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। বাংলাদেশে নারীদের অনেকেই পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধা অতিক্রম করে পুলিশে যোগ দেন। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন, ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং পারিবারিক দায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষা করে তাঁরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন। এমন বাস্তবতায় পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা ছাড়া বাধ্যতামূলক অবসর তাঁদের ব্যক্তিগত মর্যাদার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নারী প্রজন্মের মধ্যেও অনিশ্চয়তার বার্তা পাঠাতে পারে।
রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তের একটি প্রতীকী গুরুত্বও থাকে। যখন একজন দক্ষ কর্মকর্তা সম্মানজনকভাবে অবসরে যান, তখন প্রতিষ্ঠান সম্মানিত হয়। আবার কোনো সিদ্ধান্ত যদি অস্বচ্ছ বা বিতর্কিত হিসেবে জনমনে প্রতিভাত হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানও প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই বাধ্যতামূলক অবসরকে কেবল প্রশাসনিক ফাইলের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক সংস্কৃতি এবং সুশাসনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
এ ক্ষেত্রে সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে জনআস্থা বজায় রাখা। যদি কোনো কর্মকর্তা সত্যিই জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন, তবে আইন অনুযায়ী তদন্ত, বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু যদি বাধ্যতামূলক অবসর কেবল একটি প্রশাসনিক বিবেচনার বিষয় হয়, তবে সেই বিবেচনার ন্যূনতম যৌক্তিকতা ও প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এতে সরকারের সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে।
পদোন্নতি একটি কর্মকর্তার দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, প্রশিক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন, কর্মদক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে একজন কর্মকর্তা উচ্চপদে উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। সেই পর্যায়ে পৌঁছে পদোন্নতির পরিবর্তে
বাধ্যতামূলক অবসরের মুখোমুখি হওয়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য যেমন মানসিকভাবে কষ্টদায়ক, তেমনি সহকর্মীদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে আস্থা ও মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
নারী পুলিশ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টির একটি অতিরিক্ত মাত্রা রয়েছে। বাংলাদেশে নারীরা দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পুলিশ বাহিনীতে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন। তাঁরা থানার দায়িত্ব থেকে শুরু করে মহানগর পুলিশ, বিশেষায়িত ইউনিট, গোয়েন্দা সংস্থা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁদের এই অগ্রযাত্রা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের নারী ক্ষমতায়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
এই বিষয়টি নারী কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা দাবি করার নয় বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। এজন্য তাদেরকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।
তাদের অনেকের সামনে বহু আকাঙ্খিত পদন্নোতি অপেক্ষা করছে। তারা সেইসব উচ্চপদ অলংকৃত করার জন্য বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে চয়েস দিয়েছিল। তাদের সেই আশা ভরসা বাধ্যতামূলক অবসরের যাঁতাকলে পিষে অঙ্কুরে বিনাশ হবে কেন?
গত ২২ জুলাই এক প্রজ্ঞাপণে ডিএমপিতে কর্মরত থাকাবস্থায় বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্ত একজন নারী যুগ্ম পুলিশ কর্মকর্তা বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য আমি আন্তর্জাতিক নারী পুলিশ সংস্থা (আই, ডব্লিই.পি.এ)-র আলাস্কা এওয়ার্ড প্রাপ্ত।
বিপিএম ও আইজিপি এক্সামপ্লি ব্যাজ পেয়েছি খুনের দায়ে পলাতক ও মাদকাসক্তদের গ্রেপ্তারর জন্য। এছাড়া আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রেসিডেন্ট রোভার স্কাউট (পিআরএস) পদকপ্রাপ্ত।
আমি সবসময় অতি সতর্কতা ও যত্নের সাথে আমার দায়িত্ব পালন করেছি। আমি তো কোন অপরাধ করিনি। আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কেন বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে তা বোধগম্য নয়। আজ আমার সাথে তারা (আরো ছয়জন একই ব্যাচের ২০ তম বিসিএস, নারী পুলিশ কর্মকর্তা) আজ দু:খ-শোকে কাঁদতে থাকলে আগামীতে দেশের মেয়েরা পুলিশের জবে আসতে চাইবে না।
তখন রাষ্ট্রীয়ভাবে সার্বিক নারীকল্যাণ নীতির ধারণা কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে? বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ঊর্ধ্বতন নারী কর্মকর্তাসহ সব সরকারি কর্মকর্তার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক অবসরপ্রদান যেন সুস্পষ্ট নীতিমালা, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার ভিত্তিতে হয় এটাই সময়ের দাবি। রাষ্ট্রের মর্যাদা তখনই বৃদ্ধি পাবে, যখন রাষ্ট্র তার কর্মচারীদের কেবল কর্মক্ষমতার সময় নয়, কর্মজীবনের শেষ অধ্যায়েও সম্মান দেবে। একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্য এই নীতিই হওয়া উচিত প্রশাসনিক সংস্কারের অন্যতম ভিত্তি।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]