সোমবার | ২৭ জুলাই, ২০২৬ | ১২ শ্রাবণ, ১৪৩৩

বেকারত্বের বোমা নিষ্ক্রিয়করণে এআই সঞ্জাত স্টার্টআপ

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
বাংলাদেশে বেকারত্ব আজ শুধু একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়। আমাদের জন্য এটি একটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও উন্নয়নগত চ্যালেঞ্জ। একদিকে জনসংখ্যার বিশাল অংশ তরুণ, অন্যদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান থেকে বের হলেও সবার জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। সরকারি চাকরির সীমিত সুযোগ, বেসরকারি খাতের অনিশ্চয়তা এবং প্রচলিত শিল্পের ধীরগতির কারণে বেকারত্ব যেন একটি নীরব সামাজিক বোমায় পরিণত হয়েছে। এই বোমা কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়। এটি সামাজিক অস্থিরতা, হতাশা, মেধাপাচার, অপরাধ প্রবণতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। এই বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ভিত্তিক স্টার্টআপ হতে পারে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার।
বিশ্বজুড়ে এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব পেরিয়ে পঞ্চম শিল্পবিপ্লব সূচিত করেছে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। অর্থনীতির এই ক্রান্তিকালে আমাদের উত্তরণের শক্তিশালী উপায় হতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সঞ্জাত স্টার্টআপ। কারণ, প্রযুক্তির সহায়তায় প্রচলিত রীতিনীতি অতিক্রম করে নতুন কিছু করাই স্টার্টআপের বৈশিষ্ট্য।  স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, শিক্ষা, ব্যাংকিং, পরিবহন, উৎপাদন শিল্প থেকে শুরু করে বিনোদন, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এআই নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে। অনেকেই আশঙ্কা করেন, এআই মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কিছু প্রচলিত কাজের ধরন বদলালেও এআই নির্ভর নতুন পেশা ও উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ আরও দ্রুত বাড়ছে।
বাংলাদেশে তরুণদের একটি বড় অংশ প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সহজলভ্যতা তাদের বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। এই তরুণদের যদি এআই- ভিত্তিক স্টার্টআপ গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও নীতিগত সহায়তা দেওয়া যায়, তবে তারা শুধু নিজেদের কর্মসংস্থানই নয়, অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে।
এআই ভিত্তিক স্টার্টআপ বলতে এমন ব্যবসাকে বোঝায়, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার, বাংলা ভাষাভিত্তিক চ্যাটবট, কৃষকদের জন্য রোগ শনাক্তকারী অ্যাপ, হাসপাতালের রোগ নির্ণয় সহায়ক সফটওয়্যার, শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার প্ল্যাটফর্ম, আইনি পরামর্শ
প্রদানকারী ভার্চুয়াল সহকারী, ক্ষুদ্র ব্যবসার হিসাব ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার কিংবা ই-কমার্সের স্মার্ট সুপারিশ ব্যবস্থা। এসব উদ্যোগ তুলনামূলক কম মূলধনে শুরু করা সম্ভব এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতা করতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষি খাতে এআই স্টার্টআপের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। কৃষকরা এখনও আবহাওয়া, রোগবালাই, বাজারদর ও উৎপাদন পরিকল্পনা নিয়ে নানা সমস্যায় পড়েন। এআই ব্যবহার করে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে জমির ছবি বিশ্লেষণ করে রোগ শনাক্ত, সারের পরিমাণ নির্ধারণ, সেচের সময় নির্ধারণ এবং বাজারমূল্যের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব।
স্বাস্থ্য খাতেও এআই বিপ্লব ঘটাতে পারে। গ্রামাঞ্চলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট দীর্ঘদিনের। এআই -ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা প্ল্যাটফর্ম রোগের প্রাথমিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ, এক্স-রে বা স্ক্যান রিপোর্টের প্রাথমিক মূল্যায়ন, রোগী ব্যবস্থাপনা এবং টেলিমেডিসিন সেবা উন্নত করতে পারে। এসব সেবা ঘিরে নতুন স্টার্টআপ, সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান ও কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
শিক্ষা খাতে এআই -এর ব্যবহার আরও ব্যাপক হতে পারে। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের শেখার গতি ও চাহিদা এক নয়। এআই চালিত শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম প্রত্যেক শিক্ষার্থীর দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে আলাদা শেখার পরিকল্পনা দিতে পারে। বাংলা ভাষাভিত্তিক শিক্ষা সহকারী, পরীক্ষা মূল্যায়ন ব্যবস্থা, গবেষণা সহায়ক সফটওয়্যার এবং ভার্চুয়াল শিক্ষক তৈরির মাধ্যমে অসংখ্য উদ্যোক্তা নতুন বাজার সৃষ্টি করতে পারবেন।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও এআই নির্ভর সমাধান থেকে উপকৃত হতে পারেন। দোকানের বিক্রির পূর্বাভাস, গ্রাহকের আচরণ বিশ্লেষণ, স্বয়ংক্রিয় হিসাবরক্ষণ, বিপণন পরিকল্পনা এবং অনলাইন গ্রাহকসেবা এআই দিয়ে সহজ করা সম্ভব। এসব সেবা প্রদানকারী
স্টার্টআপ দ্রুত জনপ্রিয় হতে পারে।
বিশ্বব্যাপী ফ্রিল্যান্সিং ও রিমোট ওয়ার্কের বাজার দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। এআই টুল ব্যবহারে দক্ষ তরুণরা কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ডেটা বিশ্লেষণ, ডিজিটাল মার্কেটিং, ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং এবং ভাষান্তরের মতো কাজে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারছেন। অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে কাজ শুরু করে পরে স্টার্টআপে রূপান্তর করছেন।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রথমত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনও এআই, ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং এবং উদ্ভাবনভিত্তিক শিক্ষা পর্যাপ্ত নয়। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাস্তবমুখী গবেষণা ও শিল্পের সঙ্গে সংযোগ সীমিত। দ্বিতীয়ত, স্টার্টআপের জন্য
প্রাথমিক বিনিয়োগ পাওয়া কঠিন। তৃতীয়ত, গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় এখনও খুবই কম। চতুর্থত, বাংলা ভাষাভিত্তিক উচ্চমানের ডেটাসেট ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। পঞ্চমত, অনেক তরুণের ভালো ধারণা থাকলেও ব্যবসা পরিচালনা, বিপণন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের অভিজ্ঞতা নেই।
এই সমস্যাগুলো সমাধানে সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকারকে এআই কেন্দ্রিক জাতীয় স্টার্টআপ তহবিল গঠন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এআই ইনোভেশন ল্যাব, ইনকিউবেশন সেন্টার এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি করতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, কর-সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, চাকরিদাতা তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমে এআই, উদ্যোক্তা শিক্ষা, ডিজিটাল ব্যবসা, ডিজাইন থিংকিং, সমস্যা সমাধান এবং প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। শিল্পপ্রতিষ্ঠান,
বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা গড়ে উঠলে গবেষণার ফল দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এআই স্টার্টআপ বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। ঘরে বসেই সফটওয়্যার উন্নয়ন, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, কনটেন্ট তৈরি এবং ই-কমার্সভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনা সম্ভব। ফলে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নও ত্বরান্বিত হবে।
একই সঙ্গে নৈতিক এআই ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, অ্যালগরিদমিক বৈষম্য, কপিরাইট সুরক্ষা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে এআই এর ইতিবাচক সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি শক্তিশালী নীতিমালা ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাও জরুরি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের তরুণদের মধ্যে উদ্ভাবনী চিন্তা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস বাড়ানো। চাকরির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা না করে স্থানীয় সমস্যার প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান তৈরি করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
বিশ্বের অনেক বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান একসময় ছোট স্টার্টআপ হিসেবেই যাত্রা শুরু করেছিল।
আজকের বাংলাদেশেও অসংখ্য তরুণ সীমিত সম্পদ নিয়ে উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ করছেন। যথাযথ নীতিগত সহায়তা, বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে আগামী দশকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম এআই স্টার্টআপ হাবে পরিণত হতে পারে।
বেকারত্বের বোমা মোকাবেলায় শুধু সরকারি চাকরি বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। সরকারি নিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি কখনোই দেশের সব কর্মক্ষম মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের একমাত্র উৎস হতে পারে না।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রতি বছর যে সংখ্যক নতুন কর্মপ্রার্থী যোগ হন, তার তুলনায় সরকারি চাকরির সংখ্যা খুবই কম। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ হলেও তা মোট বেকারের সামান্য অংশকে কর্মসংস্থান দিতে পারে। ফলে লাখ লাখ তরুণ বছরের পর বছর সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিতে গিয়ে তাদের কর্মজীবনের মূল্যবান সময় হারিয়ে ফেলেন। এই প্রবণতা অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর, কারণ দক্ষ মানবসম্পদ উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হতে দেরি করে।
বর্তমান বিশ্বে কর্মসংস্থানের ধরণ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। অটোমেশন, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং গিগ অর্থনীতির বিকাশ নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। আজ একজন দক্ষ তরুণ একটি প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ, অনলাইন ব্যবসা, সফটওয়্যার সেবা, ডিজিটাল মার্কেটিং, ফ্রিল্যান্সিং বা উদ্ভাবনী উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু নিজের কর্মসংস্থানই নয়, আরও অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন। এজন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মসংস্থানমুখী করা জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা চাকরি খোঁজার পাশাপাশি চাকরি সৃষ্টির সক্ষমতাও অর্জন করেন।
আমাদের দেশে প্রতিবছর ২০ লক্ষ তরুণ বিভিন্ন চাকুরীর জন্য লড়াই করতে শামিল হচ্ছে।, তার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা বিভাগের ডিগ্রীধারী উচ্চশিক্ষিতরাই সিংহভাগ। বেকারত্বের এই মানব বোমা বোমা নিষ্ক্রিয় করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উদ্যোক্তা উদ্যোগ।
তাই এখনই সময়, চাকরি খোঁজা থেকে চাকরি সৃষ্টি, এই মানসিক পরিবর্তন ঘটানোর। রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত, বিনিয়োগকারী এবং তরুণ সমাজ যদি একযোগে এআই সঞ্জাত স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারে, তবে বেকারত্ব আর বোঝা হয়ে থাকবে না বরং বাংলাদেশের তরুণ শক্তিই হবে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সম্পদ।
এজন্য আমাদের রাষ্ট্রকে এমন একটি অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে একজন তরুণ চাকরির জন্য শুধু আবেদন করবেন না করে নিজেই নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে।
তখনই বেকারত্বের বোমা সত্যিকার অর্থে নিষ্ক্রিয় হতে থাকবে এবং বাংলাদেশের জনশক্তি জাতীয় উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হতে থাকবে বলে মনে হয়।
*প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.