বুধবার | ২৯ জুলাই, ২০২৬ | ১৪ শ্রাবণ, ১৪৩৩

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস: ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট ফারিহা মনি

নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশজুড়ে সাড়া জাগানো ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৫-২৬’ এর প্রথম আসরে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হয়েছে নাটোরের লালপুরের জান্নাতুল ফেরদৌস ফারিহা ওরফে ফারিহা মনি। তার জাদুকরী ফুটবল পারফরম্যান্স নজর কেড়েছে।
জাতীয় পর্যায়ের অনূর্ধ্ব-১৪ মেয়েদের ফুটবলে রাজশাহী অঞ্চল ফাইনালে পরাজিত করে রংপুর বিভাগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এর আগে বরিশাল অঞ্চলকে ৫-০ গোলে ও খুলনাকে ২-০ গোলে পরাজিত করে ফাইনালে পৌঁছায়। দলের এই বিশাল জয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ দুই ম্যাচের ৭টি গোলের মধ্যে ৫টি কিশোরী ফারিহার জাদুকরী পা থেকেই এসেছে।
সোমবার (২৭ জুলাই ২০২৬) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে নিজে উপস্থিত থেকে ফারিহার হাতে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট পুরস্কার তুলে দেন। এ সময় মাথায় হাত বুলিয়ে আশির্বাদ করেন।


উদীয়মান নারী ফুটবল তারকা জান্নাতুল ফেরদৌস ফারিহা ওরফে ফারিহা মনির জন্ম নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার ওয়ালিয়া ইউনিয়নের নান্দরায়পুর গ্রামে। অভাব-অনটনে ঘেরা তার পারিবারিক জীবন। স্থানীয় নান্দরায়পুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এই ফরোয়ার্ডের ফুটবলের আঙিনায় উঠে আসার গল্পটা একটু অন্যরকম।
পারিবারিক প্রতিকূলতাকে জয় করে আজ ফারিহা মনি এই অবস্থানে এসেছে। তার বাবা মুকুল মন্ডল একজন বাকপ্রতিবন্ধী। তেমন কোনো কাজকর্ম করতে পারেন না। মা আজেলা বেগম স্থানীয় এলজিইডির রাস্তায় দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান। এক বোন ও এক ভাইসহ পাঁচ জনের সংসারের টানাপোড়েনের মধ্যেও ফুটবলের স্বপ্নকে বুকে আগলে রেখে ফারিহা মনির সাফল্য সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।
প্রতিবন্ধী বাবা ও ভাইয়ের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নিজেদের সামান্য জমিতে কাদায় ধান রোপণ কিংবা পচা পানিতে নেমে পাট ধোয়ার মতো কঠিন কায়িক পরিশ্রমও করতে হয়। ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর এই অদম্য নারী প্রতিদিনের ক্লান্তি উপেক্ষা করে বাড়ি থেকে দীর্ঘ ৮ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে উপজেলার গোপালপুর পৌরসভার নর্থ বেঙ্গল ফুটবল একাডেমিতে গিয়ে নিয়মিত কঠোর অনুশীলন করেছে।
আর্থিক অসচ্ছলতা থাকলেও পরিবারের সমর্থন ফারিহা মনির ফুটবলার হওয়ার পথে অন্তরায় হতে পারেনি। মেয়ের ফুটবল খেলার প্রতি বাবা-মায়ের সমর্থন থাকলেও সমাজের রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিনিয়ত কটূক্তি, লোকলজ্জা আর সমাজের বাঁকা চোখকে উপেক্ষা করে ফারিহা মনি তার লক্ষ্য স্থির রেখে এগিয়ে চলেছে।
ফারিহা মনি জানায়, এই লড়াইয়ে তার পাশে ঢাল হয়ে সব সময় দাঁড়িয়েছিলেন তার কোচ মোহাম্মদ জুয়েল। অনুশীলনে যাওয়ার মতো যাতায়াত ভাড়া কিংবা ভালো বুট কেনার টাকা পরিবারের ছিল না। কোচ জুয়েল নিজের সন্তানের মতো সব ব্যবস্থা করেছেন। এমন কি দরকারি হাত খরচও দিয়েছেন।
তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসার এই জার্নিটা ফারিহা মনির জন্য যেমন ছিল কষ্টের, তেমনি আনন্দের। তৃতীয় শ্রেণি থেকে ফুটবলের আঙিনায় পা রাখা ফারিহা উপজেলা পর্যায়ে ইনজুরির কারণে খেলতে না পারলেও, চোট সারিয়ে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করে জাতীয় আসরে নিজের যোগ্যতার জানান দিয়েছে।
প্রিয় ফুটবলার জাতীয় দলের তারকা ফরোয়ার্ড ঋতুপর্ণা চাকমার প্রতি ভালোবাসা থেকেই ফারিহা মনি নিজের জার্সির নম্বরও বেছে নিয়েছে ১৭। বরিশাল বিভাগের বিরুদ্ধে রাজশাহী বিভাগের করা পাঁচটি গোলের মধ্যে চারটি এবং সেমিফাইনালে খুলনা বিভাগের বিরুদ্ধে করা দুটি গোলের মধ্যে একটি সর্বাধিক ৫টি গোল করে ‘ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট’ হলেও দলের অন্য সহখেলোয়াড়দের দারুণ পাসের কারণেই সম্ভব হয়েছে বলে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে সে।


নর্থ বেঙ্গল ফুটবল একাডেমির কোচ মোহাম্মদ জুয়েল বলেন, কোনো ক্লান্তি, অভাব কিংবা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা যাকে থামাতে পারেনি। গ্রামের মেঠো পথ থেকে শুরু হওয়া ফারিহার সাইকেলযাত্রা একদিন আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে পৌঁছে যাবে। আমাদের প্রত্যাশা দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনবে জীবন সংগ্রামী এই কিশোরী ফারিহা মনি।
ওয়ালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুস সাত্তার বলেন, গ্রামের ধুলিমাখা মাটির সাথে মিশে থাকা ফারিহা মনির কৃতীত্ব আমাদের গর্বিত করেছে। তার পরিচয়ে আমাদের এই বিদ্যালয় পরিচিত হবে। সে একদিন দেশের মুখ উজ্জল করবে ইনশাআল্লাহ।
নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমীন পুতুল নিজের ফেসবুক পেজে তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে লিখেছেন, ‘বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে এমন ফারিহার জন্ম হোক এটাই প্রত্যাশা।’

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.