
-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিচ্ছন্নতা এখন প্রায় দুর্লভ এক অলংকার। ক্ষমতার রাজনীতিতে যখন পদ-পদবি, অর্থ, প্রভাব, আনুগত্য ও প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার সক্ষমতাই অনেক সময় যোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি হয়ে ওঠে, তখন দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে একজন সজ্জন, ভদ্র, সংযত ও অভিজ্ঞ রাজনীতিকের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হওয়া নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। সেই অর্থে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মহামান্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া কেবল একটি রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীর বিজয় নয়; এটি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের এক ইতিবাচক পরিণতিও বটে।
গেল ২০ আগস্ট ২০২৬ জাতীয় সংসদের ভোটে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। ১৯৯১ সালের পর এটিই ছিল বাংলাদেশের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
এই লেখার শিরোনামটি শুধু আমার প্রশংসামূলক অভিব্যক্তি বা সাধারণ বাক্য নয়। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। রাজনীতিতে অনেকেই খুব দ্রুত ওপরে ওঠেন, আবার দ্রুতই হারিয়েও যান। কেউ ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়ে ক্ষমতাবান হন, কেউ ক্ষমতা হারিয়ে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েন। কিন্তু কেউ কেউ দীর্ঘ সময় ধরে ধৈর্য, ভদ্রতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাংগঠনিক নিষ্ঠার মাধ্যমে নিজের একটি আলাদা অবস্থান তৈরি করেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেই বিরল ধরনের রাজনীতিকদের একজন এবং এমন মূল্যায়ন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আলোচনায় বারবার এসেছে।
তিনি একদিনে রাষ্ট্রপতি হননি। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা এই রাজনীতিক ধাপে ধাপে রাজনীতির মাঠে উঠে এসেছেন। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘদিন দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০১৬ সাল থেকে তিনি দলটির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পান। রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি দলীয় মহাসচিব ও মন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান।
এই পদত্যাগের ঘটনাটিও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্রপতির পদে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিচয় তিনি বিএনপির মহাসচিব ছিলেন যা পেছনে রেখে যেতে হয়েছে। এখন তাঁর সামনে নতুন পরিচয় তিনি পুরো বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। দলীয় রাজনীতির নেতা থেকে রাষ্ট্রের অভিভাবক, এই রূপান্তরই হবে তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
মহামান্য রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো দীর্ঘ প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর টিকে থাকা। বিরোধী রাজনীতির কঠিন সময়ে তিনি কারাবরণ করেছেন, মামলা মোকাবিলা করেছেন, রাজনৈতিক চাপ সহ্য করেছেন। অথচ তাঁর প্রকাশ্য রাজনৈতিক আচরণে সাধারণত যে বিষয়টি চোখে পড়ে তা হলো সংযত ভাষা ও পরিমিত বক্তব্য। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচনা করেছেন, কিন্তু ব্যক্তিগত কটূক্তি বা অশালীন বাক্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁকে বাংলাদেশের অনেক রাজনীতিকের তুলনায় আলাদা করে দেখা হয়।
এ কারণেই সজ্জন শব্দটি তাঁর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অভিধানে বিশেষ অর্থ বহন করে। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁকে কেবল সজ্জন হলেই চলবে না। তাঁকে হতে হবে সাংবিধানিকভাবে দৃঢ়, রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ এবং নৈতিকভাবে আরো বিশ্বাসযোগ্য।
মহামান্য রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপতির পদ বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রধানত সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক হলেও এ পদটির মর্যাদা ও গুরুত্ব অনেক বেশি। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। রাজনৈতিক সংকটের সময় রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসও আমাদের সেই শিক্ষা দিয়েছে।
সুতরাং বঙ্গভবনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে মির্জা ফখরুলকে একটি কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। তিনি এতদিন যে দলের মহাসচিব ছিলেন, সেই দলই এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়।
প্রধানমন্ত্রীও একই রাজনৈতিক পরিবারের শীর্ষ নেতা। ফলে তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দলীয় আনুগত্যের অতীতকে অতিক্রম করে সাংবিধানিক নিরপেক্ষতার বর্তমানকে প্রতিষ্ঠা করা। এটি যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়।
মহামান্য রাষ্ট্রপতির পদে বসে যদি তিনি কেবল সরকারের সিদ্ধান্তে আনুষ্ঠানিক সিলমোহর দেওয়ার ভূমিকায় সীমাবদ্ধ থাকেন, তাহলে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পূর্ণ মূল্যায়ন হবে না। বরং তাঁর কাছ থেকে প্রত্যাশা থাকবে, প্রয়োজনে সরকারের কাছেও সংবিধান, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা নিয়ে নৈতিক পরামর্শ দেবেন। কারণ রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর প্রশাসনিক ক্ষমতায় নয়; তাঁর নৈতিক মর্যাদায়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই নৈতিক মর্যাদার ঘাটতি দীর্ঘদিনের। ক্ষমতায় থাকা দল বিরোধীদের প্রতি কঠোর হয়েছে, বিরোধীরা ক্ষমতায় গিয়ে অনেক সময় একই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি করেছে। মামলা, পাল্টা মামলা, গ্রেপ্তার, হয়রানি, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, এসবের চক্রে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাধারণ মানুষও রাজনীতিকে সেবার বদলে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।
মহামান্য রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল নিজে এই রাজনৈতিক বাস্তবতার ভুক্তভোগী ছিলেন। তাই তাঁর সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ আছে। তিনি চাইলে রাষ্ট্রপতির নৈতিক অবস্থান থেকে প্রতিহিংসার রাজনীতির বিপরীতে সহনশীলতার রাজনীতির পক্ষে একটি শক্তিশালী বার্তা দিতে পারেন।
এখানে তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাই তাঁর সম্পদ। একজন মানুষ যখন বিরোধী দলে থাকেন, তখন রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহার কেমন লাগে, তা তিনি জানেন। আবার ক্ষমতাসীন দলের নেতা হওয়ার অভিজ্ঞতাও তাঁর হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের দুই দিকই দেখার সুযোগ তাঁর হয়েছে। এই দ্বৈত অভিজ্ঞতা তাঁকে অন্য অনেকের তুলনায় একটি বিশেষ সুবিধা দিয়েছে।
মহামান্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি যদি এই অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞায় রূপান্তর করতে পারেন, তাহলে তাঁর রাষ্ট্রপতিত্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রে বিরোধী দল মানেই
রাষ্ট্রবিরোধী দল নয়। সরকার সমালোচিত হলেই রাষ্ট্র দুর্বল হয় না; বরং সমালোচনা গ্রহণ করার সক্ষমতা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে। একইভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা গণতন্ত্রের অংশ, কিন্তু তাকে নিশ্চিহ্ন করা গণতন্ত্রের অংশ নয়। একজন প্রবীণ রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল এই মৌলিক সত্যটি আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাঁর ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের রাজনীতিতে উচ্চস্বরে কথা বলা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য এবং প্রতিপক্ষকে হেয় করার প্রবণতা কম নয়। এর বিপরীতে ফখরুলের অপেক্ষাকৃত শান্ত, মার্জিত ও যুক্তিনির্ভর বক্তব্যের ধরন বহু মানুষের দৃষ্টি
আকর্ষণ করেছে। রাষ্ট্রপতির মতো পদে এই ব্যক্তিত্ব নিঃসন্দেহে একটি সম্পদ।
এখানেই রিষ্কার মানুষ পরিচয়ের প্রকৃত পরীক্ষা। পরিষ্কার মানুষ হওয়া মানে শুধু দুর্নীতির অভিযোগ না থাকা নয়। পরিষ্কার রাজনীতি মানে ক্ষমতার অপব্যবহার না করা, প্রতিপক্ষের অধিকারকে সম্মান করা, নিজের দলের ভুলের ক্ষেত্রেও নৈতিক অবস্থান নিতে পারা এবং রাষ্ট্রকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখা। মহামান্য রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের সামনে এখন এই সংজ্ঞাটিকে বাস্তবে প্রমাণ করার সুযোগ এসেছে।
তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়া বিএনপির জন্যও একটি রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। দীর্ঘদিনের মহাসচিবকে রাষ্ট্রপতি পদে পাঠানোর মাধ্যমে দলটি একদিকে একজন প্রবীণ নেতাকে সম্মান জানিয়েছে, অন্যদিকে তাঁকে দলীয় রাজনীতির বাইরে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে প্রতিষ্ঠিত করেছে। দলটির জন্যও এখন গুরুত্বপূর্ণ হবে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক স্বাধীনতা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা।
আরও একটি বিষয় স্মরণীয়। এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে। মির্জা ফখরুল ২৫৫ ভোট পেয়েছেন, অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নতুন রাজনৈতিক তাৎপর্য এনেছে। ভবিষ্যতে এই নির্বাচন আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অর্থবহ হবে কি না, সেটিও নির্ভর করবে দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক পরিবেশের ওপর। তবে আজকের সবচেয়ে বড় কথা হলো, একজন প্রবীণ রাজনৈতিক কর্মীর দীর্ঘ পথচলার পরিণতি রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে ঠেকেছে।
রাজনীতিতে কেউ কেউ ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠেন; কেউ ওঠেন মানুষের আস্থার সিঁড়ি বেয়ে।
প্রথমটির স্থায়িত্ব অনিশ্চিত, দ্বিতীয়টির মূল্য ইতিহাসে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়ন করতে গেলে তাঁর পদ-পদবি যেমন দেখতে হবে, তেমনি দেখতে হবে তাঁর আচরণ, ভাষা, ধৈর্য, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও দীর্ঘ প্রতিকূলতার মধ্যেও অবস্থান ধরে রাখার সক্ষমতা।
একজন রাষ্ট্রপতির জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন হবে, তাঁর মেয়াদ শেষে মানুষ যেন বলতে পারে, তিনি দলীয় রাজনীতির মানুষ ছিলেন ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে এসে তিনি রাষ্ট্রকেই বড় করে দেখেছেন।
মহামান্য রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে এখন সেই সুযোগ। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের শেষে তিনি যে পুরস্কার পেয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে বিরাট যেটি বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতির পদ। কিন্তু এই পুরস্কারের চেয়েও বড় পুরস্কার হতে পারে জনগণের শ্রদ্ধা। আর সেই শ্রদ্ধা অর্জনের পথ তাঁর সামনে এখনো খোলা।
মহামান্য রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে জাতির প্রত্যাশা, তিনি যেন দলীয় রাজনীতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে রাষ্ট্রীয় রাজনীতির সর্বোচ্চ নৈতিক উচ্চতায় উঠতে পারেন। তিনি যেন প্রমাণ করতে পারেন, পরিচ্ছন্নতা রাজনীতিতে দুর্বলতা নয়; বরং দীর্ঘ পথের শেষে সেটিই সবচেয়ে বড় শক্তি। আর ইতিহাস যদি শেষ পর্যন্ত মানুষকে তাঁর পদ দিয়ে নয়, তাঁর আচরণ দিয়ে বিচার করে তাহলে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় যেন হয়, তিনি ছিলেন একজন সজ্জন রাজনীতিক, যিনি রাষ্ট্রপতি হয়ে রাষ্ট্রকেই সবার ওপরে রেখেছিলেন।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]