
-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
হিমালয়ের বুক থেকে নেমে আসা একটি নদী হঠাৎ যেন মৃত্যুর দূত হয়ে উঠেছিল। গত ২৬ আগস্ট নেপালের রাসুয়া জেলার ভোটেকোশি নদীতে যে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ধস নেমে এসেছে, তা এখন আর কেবল নেপালের দুর্যোগ ছাড়িয়ে পরিণত হয়েছে একটি আন্তর্জাতিক মানবিক ট্র্যাজেডিতে।
প্রায় তিনডজন দেশের পর্যটক, তীর্থযাত্রী, স্থানীয় বাসিন্দা, শ্রমিক ও নিরাপত্তাকর্মী, কেউ রেহাই পাননি। নদীর স্রোতে ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং মানুষের স্বপ্ন।
৩০ আগস্ট মধ্যরাত পর্যন্ত নেপালে অন্তত ৭৬৫ জনের মৃত্যু এবং ২,৩০০-এর বেশি মানুষের নিখোঁজ থাকার কথা জানা গেছে। নিখোঁজদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক দেশি-বিদেশি পর্যটক ও কৈলাস-মানস সরোবরগামী তীর্থযাত্রী রয়েছেন। নেপালের পর্যটন কর্মকর্তাদের হিসাবে ৬৬৭ পর্যটক নিখোঁজ, যার মধ্যে ৫৪০ জন ৩২টি দেশের বিদেশি নাগরিক। ভারতীয় নাগরিকই সবচেয়ে বেশি ছিল। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ৬৫, মালয়েশিয়ার ৫৫, ইউক্রেনের ৫৩, যুক্তরাজ্যের ৩৩ এবং অস্ট্রেলিয়া ও কানাডারও বহু পর্যটক নিখোঁজ।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, বহু দেশের নাগরিক এখনো নিখোঁজ। ফলে ভোটেকোশির তীরে আজ শুধু স্বজন হারানোর কান্নায় বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, পরিবার ও রাষ্ট্রের উৎকণ্ঠাও একাকার হয়ে গেছে।
গত ২৬ আগস্টের প্রথম দিকের হিসাবে নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছিল, ভোটেকোশি বন্যায় ৩৮৪ পর্যটক ও ভ্রমণকারী নিখোঁজ হয়েছেন; তাঁদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি এবং ৯৩ জন নেপালি।
বিদেশিদের মধ্যে ভারতীয়, ব্রিটিশ, মার্কিন, অস্ট্রেলীয়, মালয়েশীয়, দক্ষিণ আফ্রিকান ও ডাচ নাগরিক থাকার তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় নিখোঁজ ও মৃতের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। একই সঙ্গে তিব্বতের অংশে আরও প্রাণহানি ও নিখোঁজের খবর এসেছে।
অর্থাৎ, এই মুহূর্তে সংখ্যার হিসাব স্থির নয়, আরো বাড়তে পারে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন, অনেক রাস্তা ও সেতু ধ্বংস, কোথাও নদীর স্রোত তীব্র, কোথাও ধসের কারণে উদ্ধারকাজ বাধাগ্রস্ত। ফলে সরকারি তালিকায় থাকা ‘নিখোঁজ’ মানেই সবাই মৃত, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন ঠিক হবে না, তেমনি উদ্ধারকাজ শেষ হওয়ার আগে বিপদের মাত্রা কম করে দেখারও সুযোগ নেই।
ভোটেকোশি নদী নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্বত্য করিডরের অংশ। এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে তিব্বতের দিকে যাতায়াত করেন পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরা। বিশেষ করে কৈলাস-মানস সরোবরের তীর্থযাত্রার সঙ্গে এই রুটের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে দুর্ঘটনার সময় নদীতীরবর্তী সড়ক ও আবাসিক এলাকায় থাকা মানুষদের মধ্যে স্থানীয় জনগণের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীও ছিলেন।
ভারতীয় নাগরিকদের নিখোঁজ হওয়ার খবর বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ৬৫০ ভারতীয় পর্যটক এবং ৩৭ জন ভারতীয় বংশোদ্ভূত/এনআরআই নাগরিক নিখোঁজ থাকার কথা বলা হয়েছে। তাঁদের একটি অংশ কৈলাস-মানস সরোবর তীর্থযাত্রার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু এই ট্র্যাজেডির আন্তর্জাতিক চরিত্র শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকের সন্ধান মিলছে না। ফলে কাঠমান্ডুর উদ্ধারকেন্দ্রগুলোতে যেমন স্বজনদের উৎকণ্ঠা, তেমনি দিল্লি, লন্ডন, ওয়াশিংটন, ক্যানবেরা ও অন্যান্য রাজধানীতেও কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু হয়েছে।
প্রথমদিকে প্রবল বৃষ্টি, ভূমিধস কিংবা ভূমিকম্প, বিভিন্ন সম্ভাবনার কথা সামনে এলেও পরবর্তী বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে বরফ-পাথরের বিশাল ধস বা ‘আইস-রক অ্যাভালাঞ্চ’কে অন্যতম সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক অনুসন্ধান বলছে, উচ্চ পার্বত্য এলাকায় হিমবাহের বরফ ও পাথরের একটি বড় অংশ লেন্দে নদীতে পড়ে সেটির প্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে দিতে পারে। পরে সেই বাধা ভেঙে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, কাদা ও পাথর একসঙ্গে নিচের দিকে ধেয়ে আসে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। ঘটনাটিকে এখনই নিছক ‘হিমবাহ গলে যাওয়া’ বলে চূড়ান্তভাবে বর্ণনা করা বৈজ্ঞানিকভাবে যথার্থ হবে না। হিমবাহের পতন, বরফ-পাথরের ধস এবং সম্ভাব্য হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণ, এসবের সম্মিলিত ভূমিকা তদন্তাধীন। নেপালের জলবায়ু ও হিমবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, ঘটনাটির প্রকৃত কারণ নির্ধারণে আরও কয়েক দিন বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, হিমালয় আর আগের মতো স্থির নেই।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর উচ্চ পর্বতাঞ্চলে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমবাহের বরফ দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে, নতুন নতুন হিমবাহ-হ্রদ তৈরি হচ্ছে এবং পুরোনো হ্রদগুলোর আকার বাড়ছে। কোনো হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ দুর্বল হয়ে গেলে মুহূর্তেই বিপুল পানি নিচের দিকে ধেয়ে যেতে পারে। একে বলা হয় ‘গ্লেসিয়ার লেক আউটবাস্ট ফ্লাড’ বা গল্ফ।
ভোটেকোশি অঞ্চলে এর নজির নতুন নয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়েও একই এলাকায় আকস্মিক বন্যা হয়েছিল এবং তখন হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। একই অঞ্চলে আবারও এত ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা হওয়া বিশেষজ্ঞদের জন্য বড় সতর্কবার্তা।
অতএব, এটি কেবল ‘প্রকৃতির রুদ্ররূপ’ বলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা নয়। প্রকৃতির পরিবর্তনশীল আচরণের সঙ্গে মানুষের অবকাঠামো, পর্যটনব্যবস্থা, নদীতীরবর্তী বসতি এবং দুর্যোগ-প্রস্তুতির দুর্বলতা মিলেই বিপর্যয়কে বহুগুণ ভয়াবহ করে তোলে।
মৃতদেহ পাওয়া গেলে অন্তত একটি পরিবারের অপেক্ষার অবসান হয়। কিন্তু নিখোঁজ মানুষের পরিবারগুলোর কষ্ট অন্যরকম। ফোন বন্ধ, কোনো বার্তা নেই, কোথায় আছেন জানা নেই—আশা ও আশঙ্কার মাঝখানে তারা দিন কাটায়। ভোটেকোশির তীরে আজ এমন শত শত পরিবার অপেক্ষা করছে।
একজন ভারতীয় তীর্থযাত্রীর পরিবার যেমন অপেক্ষা করছে, তেমনি ব্রিটিশ পর্যটকের পরিবারও অপেক্ষা করছে। আমেরিকান পর্যটকের স্বজনের উদ্বেগ যেমন সত্য, নেপালি স্থানীয় বাসিন্দার পরিবারের কান্নাও তেমনই সত্য। জাতীয়তার পার্থক্য এখানে অর্থহীন। নদীর স্রোত পাসপোর্ট দেখে কাউকে ছাড়েনি। এই কারণেই ভোটেকোশির দুর্যোগ একটি বৈশ্বিক কান্না। একটি নদী একই সঙ্গে বহু দেশের মানুষের হৃদয়ে আঘাত করেছে।
নেপালের অর্থনীতিতে পর্যটনের গুরুত্ব অপরিসীম। ২০২৫ সালে দেশটি ১১ লাখের বেশি আন্তর্জাতিক পর্যটক পেয়েছে। পাহাড়, তীর্থস্থান, ট্রেকিং ও অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনের ওপর বহু মানুষের জীবিকা নির্ভর করে। তাই দুর্যোগের পর পর্যটন বন্ধ করে দেওয়াই সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন নিরাপদ পর্যটন।
পর্যটন রুটের পাশে স্বয়ংক্রিয় পানি-স্তর মাপার যন্ত্র, স্যাটেলাইটভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, সাইরেন, মোবাইল সতর্কবার্তা, নির্ধারিত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র এবং বাধ্যতামূলক জরুরি প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। বিদেশি পর্যটকদের জন্য বহু ভাষায় সতর্কতা ও জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তীর্থযাত্রীদের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ঝুঁকিপূর্ণ নদীতীর ও হিমবাহ-হ্রদের আশপাশে নতুন স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ। দুর্যোগ-ঝুঁকি বিবেচনায় না নিয়ে রাস্তা, হোটেল, সেতু বা অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করলে প্রকৃতি একদিন তার মূল্য আদায় করবেই।
নেপালের ভোটেকোশি নদীতীরে বৈশ্বিক এই কান্না বাংলাদেশের জন্যও বড় সতর্কবার্তা। কারণ,বাংলাদেশ হিমালয়ের পাদদেশের দেশ। নেপাল থেকে নেমে আসা বহু নদীর পানি শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার সঙ্গে যুক্ত। ফলে হিমালয়ে বড় ধরনের বরফধস, হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণ বা আকস্মিক বন্যা শুধু নেপাল বা ভারতের সমস্যা নয়; এর দূরবর্তী প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে।
এ কারণে ভোটেকোশির ঘটনাকে ঢাকায় বসে কেবল ‘নেপালের দুর্যোগ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের পানি, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোরও হিমালয়-উৎস নদীগুলোর পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। স্যাটেলাইট তথ্য, আবহাওয়া পূর্বাভাস, নদীর পানি প্রবাহ ও হিমবাহ-হ্রদের পরিবর্তন নিয়ে আঞ্চলিক তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা দরকার।
ভোটেকোশির স্রোত ইতিমধ্যে বহু জীবন কেড়ে নিয়েছে। বহু পরিবার এখনো জানে না তাদের প্রিয়জন বেঁচে আছেন, নাকি হিমালয়ের কোনো অচেনা খাদে কিংবা নদীর দূরবর্তী তীরে হারিয়ে গেছেন। তাই ভোটেকোশির তীরে আজ যে কান্না শোনা যাচ্ছে, সেটিকে শুধু শোকের শব্দ হিসেবে শুনলে চলবে না। এটি জলবায়ু সতর্কতার ঘণ্টাধ্বনি। এটি পাহাড়ি নদীর তীরে অপরিকল্পিত বসতি ও পর্যটনের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা। এটি দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতির ব্যর্থতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন। আর একই সঙ্গে এটি নেপাল, ভারত, বাংলাদেশসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক কঠিন শিক্ষা।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতির নিয়ম ভেঙ্গে হিমবাহ গলছে, পাহাড় ভাঙছে, নদী বদলাচ্ছে। মানুষ যদি পুরোনো হিসাবেই জীবন ও উন্নয়নের পরিকল্পনা করে, তাহলে আগামী দিনের ভোটেকোশি আরও বহু নদীর নাম হয়ে উঠতে পারে। ভোটেকোশির আকস্মিক ঢল তাই আমাদের সময়ের জলবায়ু-সতর্কতার অশ্রু। সেই অশ্রু যেন আরেকটি বিপর্যয়ের পূর্বাভাস না হয়ে ওঠে, তার দায়িত্ব এখন শুধু নেপালের নয়, সমগ্র বিশ্বের।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]