| |

শিরোনাম

আন্তঃজেলা সার সিন্ডিকেটে বিপাকে লালপুরের কৃষক

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ :

আমন মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার পেতে গিয়ে নাটোরের লালপুরের কৃষকদের একাংশকে ছুটতে হচ্ছে ডিলার থেকে সাব-ডিলার, সেখান থেকে অনুমোদনহীন খুচরা বিক্রেতার কাছে। অভিযোগ উঠেছে, বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলারদের বরাদ্দ করা সার প্রথমে একটি আন্তঃজেলা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধ মজুতকারীদের কাছে চলে যাচ্ছে। পরে হাতবদল হয়ে সেই সারই আবার ফিরছে উপজেলার বিভিন্ন সাব-ডিলার ও অনুমোদনহীন খুচরা সার ব্যবসায়ীর কাছে। এতে সরকারি দামে পর্যাপ্ত সার না পেয়ে কৃষকদের বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেওয়া হচ্ছে না কোনো ভাউচারও।

সম্প্রতি অনুসন্ধানে কৃষক, মৎস্য চাষী, ভ্যানচালক ও সার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের ভাষ্য, চাহিদা অনুযায়ী ডিলারের কাছ থেকে সার না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে খোলাবাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আর সেই সুযোগে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রতি বস্তায় কয়েক শ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।

বড়বড়িয়া গ্রামের কৃষক আসলাম উদ্দিন বলেন, আমন ধান চাষের জন্য ডিলারের কাছে চাহিদা অনুযায়ী টিএসপি, ইউরিয়া ও এমওপি সার পাননি। পরে বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে প্রতি বস্তায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনতে হয়েছে।

অমৃতপাড়া গ্রামের কৃষক মো. জিল্লুর রহমানের অভিযোগ, তিনি সাব-ডিলারের কাছ থেকে বাকিতে সার নেন। তাঁর ভাষ্য, এই সুযোগে কখনো কখনো নির্ধারিত মূল্যের দ্বিগুণ দাম নেওয়া হয়। ‘‘আমাদের কিছুই করার নেই’’—বলেন তিনি।

শুধু কৃষিই নয়, সারসংকটের প্রভাব পড়ছে মৎস্য চাষেও। মোমিনপুর গ্রামের মৎস্য চাষী হাফিজুল ইসলাম জানান, তাঁর ২০টি পুকুরে প্রতি মাসে প্রায় ১৭ বস্তা সার প্রয়োজন। কিন্তু ডিলারের কাছে পর্যাপ্ত সার পাওয়া যায় না। তবে বেশি দাম দিতে রাজি থাকলে বাইরে থেকে সার পেতে সমস্যা হয় না।

এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় যাচ্ছে সার

অনুসন্ধানে সার পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের বক্তব্যেও আন্তঃজেলা সরবরাহের একটি চিত্র উঠে এসেছে। উপজেলার আমিরুল ইসলাম (৪২) নামের এক ভ্যানচালক জানান, স্থানীয় সার ডিলার ছাড়াও রাজশাহীর বাঘা উপজেলার সার ব্যবসায়ী বাচ্চু, গোলাম, রুবেল ও গোলাপের কাছ থেকে তিনি প্রায়ই সার নিয়ে আসেন। পরে মহাজনের নির্দেশে সেই সার রাজশাহীর দুর্গাপুর ও পাবনার ঈশ্বরদীসহ বিভিন্ন এলাকার নির্ধারিত সার ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে দেন।

আমিরুলের দাবি, সার পরিবহনের সময় যাতে বাইরে থেকে বোঝা না যায়, সে জন্য বস্তাগুলো কালো, লাল, নীল ও ছাই রঙের অস্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।

একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন আরেক ভ্যানচালক হাবিল উদ্দিন (৪০)। তিনি বাঘা উপজেলা থেকে সার এনে নাটোরের বড়াইগ্রাম ও পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করার কথা জানান।

সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই অনুমোদনহীন সার ব্যবসায়ীও বাঘা থেকে সার এনে অন্য জেলার ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহের কথা স্বীকার করেছেন।

উপজেলার ফুরকান আলী নামের এক কীটনাশক বিক্রেতাও অনুমোদন না থাকার কথা স্বীকার করে জানান, তিনি পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার আরামবাড়িয়া থেকে সার এনে এলাকায় বিক্রি করেন। তাঁর ভাষ্য, বেশি দামে কিনতে হয় বলে বেশি দামেই বিক্রি করতে হয়। উপজেলার বিভিন্ন বাজারে এ ধরনের সার বিক্রেতা রয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

৫০ বস্তা সার বিক্রির প্রস্তাব

অনুসন্ধানের সময় পরিচয় গোপন রেখে আরামবাড়িয়া বাজারের সাব-ডিলার আ. কাদেরের কাছে সার কিনতে চাইলে তিনি প্রতিবেদকের কাছে একসঙ্গে ৫০ বস্তা পর্যন্ত সার বিক্রির জন্য রাজি হন। একপর্যায়ে তিনি চট্টগ্রাম থেকে ট্রাকে করে সার এনে এলাকায় বিক্রির কথাও জানান।

তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ভেজাল সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে বলে কয়েকজন ব্যবসায়ী দাবি করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আ. কাদেরের বক্তব্য প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি।

চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহের দাবি কৃষি বিভাগের

লালপুর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে উপজেলায় ইউরিয়া ৬৮০ মেট্রিক টন, টিএসপি ২৩৭ মেট্রিক টন, ডিএপি ২০০ মেট্রিক টন এবং এমওপি ২৮০ মেট্রিক টন সারের চাহিদা রয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রীতম কুমার হোড় বলেন, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—উভয় মাসেই চাহিদা অনুযায়ী ডিলারদের কাছে সার সরবরাহ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, উপজেলায় সারসংকটের কোনো কারণ নেই। তবে অনেক সময় কৃষকেরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার প্রয়োগ করায় কিছুটা সমস্যা হতে পারে। কৃষকদের এ বিষয়ে সচেতন করতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে।

সার পাচার, অতিরিক্ত দামে বিক্রি এবং স্থানীয় ডিলার, সাব-ডিলার ও অনুমোদনহীন ব্যবসায়ীদের জড়িত থাকার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সার পাচার রোধ ও সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসনের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। নিয়মিত অভিযানও চলছে। নির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে বাঘা উপজেলা থেকে সার অন্যত্র সরবরাহের অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছেন বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তকী ফয়সাল তালুকদার। একইভাবে অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মমিন।

সরকারি হিসাবে উপজেলায় চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ থাকার দাবি থাকলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকদের বেশি দামে সার কেনার অভিযোগ এবং এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় সার সরবরাহের তথ্যের মধ্যে যে অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

[উপসম্পাদক /প্রাপ্তি প্রসঙ্গ/২১-০১]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.