
নিজস্ব প্রতিবেদক :
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহারের যুগে প্রবেশ করল। ‘রূপপুর থেকে রূপান্তর’ স্লোগানকে সামনে রেখে পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এর প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে ইউরেনিয়াম জ্বালানি প্রবেশ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গত মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল, ২০২৬) বিকেলে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, চুল্লিতে জ্বালানি সংযোজনের পর পূর্ণাঙ্গভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে প্রায় সাড়ে তিন মাস সময় লাগতে পারে। এরপর শুরু হবে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী আগস্টের শেষ দিকে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সব ধরনের প্রযুক্তিগত পরীক্ষা শেষে আগামী বছরের মার্চ বা এপ্রিল নাগাদ বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে পারে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি বলেন, পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহারে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেই সব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, জ্বালানি লোডিংয়ের এ সূচনা বাংলাদেশ ও রাশিয়ার সহযোগিতার এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এ প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট। প্রকল্প এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার দেশি-বিদেশি কর্মী কাজ করছেন, যাদের মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার বিদেশি নাগরিক।
অনুষ্ঠানে বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, কারিগরি বিশেষজ্ঞসহ চার শতাধিক অতিথি অংশ নেন। উদ্বোধনের সময় প্রযুক্তিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাসহ অতিথিরা প্রতীকী বোতাম চাপলে পর্দায় চুল্লির ভেতরে ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি প্রবেশের দৃশ্য প্রদর্শিত হয়। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় ৩৩তম দেশ হিসেবে যুক্ত হলো বাংলাদেশ।
প্রকল্প এলাকায় দিনভর উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যায়। দেশি-বিদেশি কর্মীরা দলীয় ছবি তোলেন এবং বিভিন্ন পর্যায়ের বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সনদ দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, রূপপুর প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নয়; এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দেশীয় দক্ষতার প্রতিফলন। তিনি বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি, অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রকল্পটিকে শক্ত ভিত দিয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা-এর সহায়তা নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করেছে।
অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পারমাণবিক কর্মসূচির শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা সহযোগিতা করে আসছে এবং নিরাপদ বাস্তবায়নে ভবিষ্যতেও সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম-এর মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ বলেন, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান বজায় রেখেই কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়েছে। আগামী বছর দ্বিতীয় ইউনিটেও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য রয়েছে বলে তিনি জানান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, পরিকল্পনা, নির্মাণ ও পরীক্ষণের মতো বহু জটিল ধাপ অতিক্রম করেই আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে রূপপুর প্রকল্প। তাঁর মতে, এ প্রকল্প দেশের প্রযুক্তিগত রূপান্তরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
রূপপুর এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও এ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। অনুষ্ঠান শুরুর আগে বিবিসি বাজার এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মাহফুজ আনাম বলেন, বহু বছর ধরে প্রকল্পটির কথা শুনলেও বাস্তবে কাজ এগোতে দেখে এখন মানুষ আশাবাদী হয়ে উঠেছে। দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মেয়াদ প্রথমে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। পরে সরকার সেটি বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করেছে। যদিও চুক্তি অনুযায়ী মেয়াদ বাড়লেও প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ নেই, তবে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় যুক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পটির সম্ভাব্য মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।
সম্পাদনা : রাশিদুল ইসলাম রাশেদ/ উপসম্পাদক /প্রাপ্তি প্রসঙ্গ/০১-০৩