শনিবার | ২০ জুলাই, ২০২৪ | ৫ শ্রাবণ, ১৪৩১

যুবলীগ নেতা খাইরুল হত্যা মামলায় ১৩ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

নাটোর প্রতিনিধি :
দীর্ঘ ১০ বছর পর নাটোরের লালপুরে সাঈদীর রায় ঘিরে তাণ্ডবে যুবলীগ নেতা খাইরুল ইসলামকে (৩৭) হত্যা মামলার রায়ে ১৩ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড আর বাকি আসামিদেরকে খালাস প্রদান করেছেন আদালত।
মঙ্গলবার (১৯ ডিসেম্বর ২০২৩) রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহা. মহিদুজ্জামান এ রায় ঘোষণা করেন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় রায়ে আদালত ৫৪ জনকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন। আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এন্তাজুল হক বাবু এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
দণ্ডিত আসামিরা হলেন, লালপুর উপজেলার পুকুরপাড়া চিলান গ্রামের কুদ্দুস প্রামানিকের ছেলে সানা প্রামানিক, সেকেন্দারের ছেলে করিম ও খলিল, মো. বানুর ছেলে মতি সরদার, তৈয়ব আলীর ছেলে মকলেছ সরদার, মকলেছের ছেলে মহসিন, রুস্তম আলী প্রামানিকের ছেলে রানা, ফরজের ছেলে আনিসুর, লুৎফর প্রামানিকের ছেলে রাজ্জাক, শাহজাহানের ছেলে জার্জিস, কদিমচিলান গ্রামের মিজানুর রহমানের ছেলে আবুল কালাম আজাদ প্রিন্স, আন্দারুর ছেলে মো. কালাম ও মাজদারের ছেলে মিজানুর রহমান। তারা সবাই জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী বলে জানা গেছে।
নিহত খাইরুল উপজেলার কদিমচিলান ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পেশায় নিরাপত্তাপ্রহরী পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির ছেলে জুবায়ের সপ্তম শ্রেণিতে ও মেয়ে খাদিজাতুল কুবরা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। তাঁর স্ত্রী লিপি খাতুন তিন মাসের সন্তানসম্ভবা ছিলেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘিরে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে তাণ্ডবে বাড়িতে হামলা করে তাঁকে হত্যা করা হয়।
আইনজীবী এন্তাজুল হক বাবু বলেন, আদালত ১৩ আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেছেন। জরিমানার অর্থ অনাদায়ে আরও তিনমাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মামলার ৬৭ আসামির মধ্যে তিনজন মারা গেছেন। একজন বিদেশে পালিয়ে গেছেন। সাজাপ্রাপ্ত ১৩ আসামি পলাতক রয়েছেন। তবে খালাসপ্রাপ্তরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায় ঘোষণার সময় যুবলীগ নেতা খাইরুলের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।


মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়। এই রায়ের পর আসামিরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কদিমচিলান বাজারের বাসস্ট্যান্ডের কাছে মিছিল বের করে। আসামিরা গুলিবর্ষণ করে এবং ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে তারা পুকুরপাড়া চিলান গ্রামে নিহত যুবলীগ নেতা খাইরুল ইসলামের চাচা আব্দুল জলিলের বাড়িতে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের আক্রমণ করে। তারা বাড়ির আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। বাড়িতে থাকা নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও মূল্যবান মালামাল লুট করে। জলিলের স্ত্রী মাজেদা বেগম বাধা দিতে গেলে আসামিরা তাকে কুপিয়ে জখম করে। পরে জলিলের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। এ সময় জলিল ও তার স্ত্রী মাজেদার চিৎকারে যুবলীগ নেতা খাইরুল ইসলাম এগিয়ে আসলে আসামিরা তাকে কুপিয়ে জখম করে। এরপর পিটিয়ে ঘটনাস্থলেই খাইরুলের মৃত্যু নিশ্চিত করে। পরে ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে।
খাইরুলের স্ত্রী লিপি খাতুন বলেন, তাঁর স্বামীর মুখে দাড়ি ছিল। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। সেদিনও জোহরের নামাজ পড়ে এসে ভাত খেতে চেয়েছিলেন। তাঁর অপরাধ ছিল তিনি নৌকায় ভোট দিতেন। ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর নামে ১০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র খুলে দেন। যার মুনাফা দিয়ে তাঁদের সংসার চলে। তাঁর ছেলে জুবায়ের হোসেন এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্র। মেয়ে খাদিজাতুল কুবরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছেন।
হত্যার ঘটনায় সেদিনই নিহত খাইরুলের ভাই শাহীনুর রহমান বাদী হয়ে লালপুর থানায় ৬০ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। পরে পুলিশ তদন্ত করে ৬৭ জন আসামির বিরুদ্ধে দেড় বছরের মাথায় অভিযোগপত্র দাখিল করে। ছয়জনের সাক্ষ্য শেষ হওয়ার পর ২০১৭ সালে আসামিপক্ষ উচ্চ আদালতে রিট করলে মামলাটি স্থগিত হয়ে যায়।
খায়রুল ইসলামের ছেলে জুবায়ের হোসেন বলেন, উচ্চ আদালতে মামলার স্থিতাবস্থা জারির পর ২০১৮ সালে নির্বাচনের পর স্থানীয় সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বকুলের মাধ্যমে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মামলার বিষয়ে খুলে বলেন। পরে জানা যায়, মামলার নথি ‘মিসিং’ হয়ে আছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও নথি পাওয়া যাচ্ছিল না। সংসদ সদস্য পরে তাঁদের নিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কাছে যান। তাঁর মাধ্যমে এক সহকারী রেজিস্ট্রারের চেষ্টায় দীর্ঘ দুই বছর পর নথি উদ্ধার হয়। পরে উচ্চ আদালত স্থিতাবস্থা তুলে নিলে রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটি আবার চালু হয়।

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৩)
Developed by- .::SHUMANBD::.